
শাহাবুদ্দিন শুভ

খবর কিংবা ফেসবুকের নিউজফিডে বারবার ভেসে আসা একটি সংবাদ যেন হৃদয়কে বারবার ক্ষতবিক্ষত করছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া কিছু তরুণের করুণ মৃত্যু—ভূমধ্যসাগরের অথৈ জলে। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার। এই মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়; এটি ১৮টি স্বপ্নের মৃত্যু, ১৮টি পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ার গল্প।
সুখের সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, অভাবের সংসারে স্বস্তি আনতে, হয়তো বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে কিংবা ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ জোগাতে—এই ছিল তাদের অপরাধ। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা পাড়ি জমিয়েছিলেন এক অনিশ্চিত পথে—যেখানে প্রতিটি ধাপেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু।
প্রত্যেকেই ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা করে দিয়েছেন মানবপাচারকারী চক্রকে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ বা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন। তারপরও তারা জানতেন না, তাদের যাত্রা শেষ হবে এক অচেনা সাগরের বুকে। লিবিয়ায় নিয়ে ‘গেমঘর’ নামের অমানবিক বন্দিশালায় মাসের পর মাস আটকে রেখে, সুযোগ বুঝে তাদের তুলে দেওয়া হয় ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায়।
তারপর শুরু হয় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। চারদিকে শুধু পানি—অসীম জলরাশি, কিন্তু এক ফোঁটা পানযোগ্য নয়। খাদ্য নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা। টানা কয়েক দিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ক্লান্তি, ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় একে একে নিভে যায় জীবনের প্রদীপ। অবশেষে নিথর দেহগুলোও আর সম্মান পায় না—পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়।
এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কেন একটি তরুণকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে হয়? কেন সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়া তার জন্য একমাত্র পথ? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং বিদেশে উন্নত জীবনের মোহ তাকে ঠেলে দেয় এই অন্ধকার পথে।
বাস্তবতা হলো, ইউরোপে পৌঁছালেই জীবন বদলে যায় না। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া একজন অভিবাসীর জীবন হয় আরও কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, শোষণ আর অবহেলার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। যেখানে একজন বৈধ কর্মী ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, সেখানে একজন কাগজবিহীন শ্রমিককে ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। ন্যায্য মজুরি তো দূরের কথা, মানবিক আচরণও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
তবুও কেন এই ঝুঁকি? কারণ আমরা বাস্তবতা জানি না, কিংবা জানতে চাই না। আমরা শুধু সফলতার গল্প শুনি, ব্যর্থতার আর্তনাদ আমাদের কানে পৌঁছায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝকঝকে জীবনের ছবি দেখে আমরা বিশ্বাস করি—বিদেশ মানেই সাফল্য। আর এই ভুল ধারণাকেই পুঁজি করে সক্রিয় থাকে মানবপাচারকারী চক্র।

এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। যারা মানুষের স্বপ্নকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করে, যারা নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়—তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যায় না। শুধু গ্রেপ্তার নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।
একই সঙ্গে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় মানুষকে জানাতে হবে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ভয়াবহতা। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন—সবখানে এই বার্তা পৌঁছাতে হবে: “অবৈধ পথে বিদেশ মানেই অনিশ্চিত জীবন, অনেক সময় নিশ্চিত মৃত্যু।”
সরকারি পর্যায়েও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে মানুষ দালালের ফাঁদে না পড়ে। বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণ, তথ্যসেবা এবং সহায়তা বাড়াতে হবে।
সবশেষে, এই নির্মম ঘটনাগুলো আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একটি জীবনের মূল্য কি এতটাই কম?
কত নির্মম এই বিদায়—
যেখানে শেষ আশ্রয়টুকুও মেলে না,
মাটির দেহ পায় না
মাটির স্পর্শ।
এই মৃত্যু যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
শাহাবুদ্দিন শুভ: ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
ইমেইল: [email protected]

খবর কিংবা ফেসবুকের নিউজফিডে বারবার ভেসে আসা একটি সংবাদ যেন হৃদয়কে বারবার ক্ষতবিক্ষত করছে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া কিছু তরুণের করুণ মৃত্যু—ভূমধ্যসাগরের অথৈ জলে। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার। এই মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়; এটি ১৮টি স্বপ্নের মৃত্যু, ১৮টি পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ার গল্প।
সুখের সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, অভাবের সংসারে স্বস্তি আনতে, হয়তো বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে কিংবা ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ জোগাতে—এই ছিল তাদের অপরাধ। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হলো দুঃস্বপ্নে। দালালদের প্রলোভনে পড়ে তারা পাড়ি জমিয়েছিলেন এক অনিশ্চিত পথে—যেখানে প্রতিটি ধাপেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু।
প্রত্যেকেই ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা করে দিয়েছেন মানবপাচারকারী চক্রকে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ বা পরিবারের শেষ সম্বলটুকু পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন। তারপরও তারা জানতেন না, তাদের যাত্রা শেষ হবে এক অচেনা সাগরের বুকে। লিবিয়ায় নিয়ে ‘গেমঘর’ নামের অমানবিক বন্দিশালায় মাসের পর মাস আটকে রেখে, সুযোগ বুঝে তাদের তুলে দেওয়া হয় ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায়।
তারপর শুরু হয় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। চারদিকে শুধু পানি—অসীম জলরাশি, কিন্তু এক ফোঁটা পানযোগ্য নয়। খাদ্য নেই, বিশুদ্ধ পানি নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা। টানা কয়েক দিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ক্লান্তি, ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় একে একে নিভে যায় জীবনের প্রদীপ। অবশেষে নিথর দেহগুলোও আর সম্মান পায় না—পাচারকারীদের নির্দেশে সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়।
এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কেন একটি তরুণকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে হয়? কেন সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়া তার জন্য একমাত্র পথ? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা দেখতে পাই—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং বিদেশে উন্নত জীবনের মোহ তাকে ঠেলে দেয় এই অন্ধকার পথে।
বাস্তবতা হলো, ইউরোপে পৌঁছালেই জীবন বদলে যায় না। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া একজন অভিবাসীর জীবন হয় আরও কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা, শোষণ আর অবহেলার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। যেখানে একজন বৈধ কর্মী ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, সেখানে একজন কাগজবিহীন শ্রমিককে ১৪-১৫ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। ন্যায্য মজুরি তো দূরের কথা, মানবিক আচরণও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
তবুও কেন এই ঝুঁকি? কারণ আমরা বাস্তবতা জানি না, কিংবা জানতে চাই না। আমরা শুধু সফলতার গল্প শুনি, ব্যর্থতার আর্তনাদ আমাদের কানে পৌঁছায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝকঝকে জীবনের ছবি দেখে আমরা বিশ্বাস করি—বিদেশ মানেই সাফল্য। আর এই ভুল ধারণাকেই পুঁজি করে সক্রিয় থাকে মানবপাচারকারী চক্র।

এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। যারা মানুষের স্বপ্নকে পণ্য বানিয়ে ব্যবসা করে, যারা নিরীহ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়—তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যায় না। শুধু গ্রেপ্তার নয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।
একই সঙ্গে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় মানুষকে জানাতে হবে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ভয়াবহতা। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন—সবখানে এই বার্তা পৌঁছাতে হবে: “অবৈধ পথে বিদেশ মানেই অনিশ্চিত জীবন, অনেক সময় নিশ্চিত মৃত্যু।”
সরকারি পর্যায়েও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে মানুষ দালালের ফাঁদে না পড়ে। বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণ, তথ্যসেবা এবং সহায়তা বাড়াতে হবে।
সবশেষে, এই নির্মম ঘটনাগুলো আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একটি জীবনের মূল্য কি এতটাই কম?
কত নির্মম এই বিদায়—
যেখানে শেষ আশ্রয়টুকুও মেলে না,
মাটির দেহ পায় না
মাটির স্পর্শ।
এই মৃত্যু যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
শাহাবুদ্দিন শুভ: ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
ইমেইল: [email protected]
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কূটনৈতিক মিশনগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এগুলোকে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে হবে।
এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কেন একটি তরুণকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে হয়? কেন সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়া তার জন্য একমাত্র পথ?
দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা মানুষের মনে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের জন্ম দিচ্ছে—যা শুধু আজ নয়, আগামী দিনগুলোতেও আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।
এইভাবেই তুমি কি/ আমার কষ্ট কিংবা সুখের/ অংশীদার হয়ে থাকবে?/ আর কিছুই চাই না তার চেয়ে বেশি।