logo
মতামত

বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ

সহিদুল আলম স্বপন
সহিদুল আলম স্বপন৪ ঘণ্টা আগে
Copied!
বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি জাতির আবেগ, পরিচয় ও গর্বের প্রতীক। বাংলাদেশে ক্রিকেটের আলোচনায় প্রায়ই ঢাকা পড়ে যায় ফুটবলের কথা। অথচ এই দেশে ফুটবলের ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং একসময় এই উপমহাদেশে বাংলাদেশের ফুটবল ছিল সম্মানের আসনে। সেই গৌরবময় অতীতের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করলে হৃদয়ে বেদনার ছায়া পড়ে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮০তম, যা দেশের ফুটবলের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও কাঠামোগত দুর্বলতার এক নির্মম প্রতিফলন। তবে হতাশার মাঝেও আশার আলো জ্বলছে। হামজা চৌধুরীর মতো প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলারের জাতীয় দলে যোগদান, হাইপ্রোফাইল কোচ আনার পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কিছু সাম্প্রতিক উদ্যোগ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বর্তমান অবস্থা: একটি নিরুত্তাপ মাঠের গল্প

বাংলাদেশের ফুটবলের বর্তমান চিত্র মোটেই সুখকর নয়। জাতীয় দল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কারবেরা ২০২২ সাল থেকে দলটি পরিচালনা করছেন। তার কোচিংয়ে ৪০টি ম্যাচে মাত্র ২৫ শতাংশ জয়ের হার বলে দেয়, ফলাফলের দিক থেকে অগ্রগতি সীমিত। ২০২৩ সালের এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে গ্রুপের তলানিতে থাকা এবং ভিয়েতনামের কাছে ০-৩ গোলে পরাজয়ের মতো ঘটনা জাতীয় দলের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তবে ২০২৫ সালে ভারতকে ১-০ গোলে হারানো এবং হংকংয়ের সঙ্গে ড্র করার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে সম্ভাবনা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

ঘরোয়া ফুটবলের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ অনুষ্ঠিত হলেও দর্শকদের উপস্থিতি, সম্প্রচার মান এবং ক্লাবগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এটি অনেক পিছিয়ে। মাঠের অবকাঠামো দুর্বলতা, রেফারিংয়ের মান নিয়ে বিতর্ক প্রায়ই উঠে আসে এবং তরুণ খেলোয়াড়দের পেশাদার পথে আসার সুযোগ অত্যন্ত সংকুচিত। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শুধু জাতীয় দলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, পুরো ফুটবল ইকোসিস্টেমকে ঢেলে সাজাতে হবে।

হাইপ্রোফাইল কোচ: স্বপ্ন নাকি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা?

২০২৬ সালের এপ্রিলে বাফুফে জাতীয় দলের নতুন কোচের পদে আবেদন আহ্বান করে। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত আবেদনের সময় ছিল এবং ইতিমধ্যে ২২ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি হয়েছে। এই তালিকায় আর্জেন্টিনার দুজন কোচ এবং ব্রাজিলের অলিম্পিক জয়ী কোচ রোজেরিও মাইকেলের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাফুফে হামজা চৌধুরীর মতামত নিয়ে কোচ নির্বাচন করতে চাইছে, যা একটি ইতিবাচক সংকেত। এই পদক্ষেপটি বলে দেয়, ফেডারেশন এখন খেলোয়াড়দের মতামতকে গুরুত্ব দিতে শিখছে।

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে শুধু একজন নামকরা কোচ আনলেই কি বাংলাদেশের ফুটবলের ভাগ্য বদলাবে? ইতিহাস বলে, না। অনেক দেশ বিখ্যাত কোচ এনেছে, কিন্তু যদি মাঠপর্যায়ের কাঠামো, খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন এবং ক্লাব ফুটবলের মান উন্নত না হয়, তাহলে হাইপ্রোফাইল কোচ একটি শোভাবর্ধনকারী উপাদান হয়েই থাকবেন। একজন সত্যিকারের হাইপ্রোফাইল কোচ শুধু মাঠে কৌশল দেন না, তিনি একটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে পরিবর্তন করেন, তরুণদের অনুপ্রাণিত করেন এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি দর্শন তৈরি করেন। তাই কোচ নির্বাচনে শুধু নাম বা পরিচিতি নয়, তার দর্শন, কাজের পদ্ধতি এবং উন্নয়নশীল ফুটবলে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাফুফের আর্থিক সীমাবদ্ধতাও এখানে একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। বিশ্বমানের কোচের বেতন কোটি টাকার ওপরে হতে পারে। ফিফার অনুদান ও করপোরেট স্পন্সরশিপের সমন্বয়ে এই অর্থের সংস্থান করতে হবে। একই সঙ্গে কোচকে শুধু জাতীয় দলের দায়িত্ব না দিয়ে গোটা ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, যাতে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দেশের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়।

দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে ভাবতে হবে

বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়, আর সেটি হলো প্রতিযোগিতার মানের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মূলত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বিরুদ্ধে খেলেই নিজেদের মান যাচাই করে আসছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের বিরুদ্ধে জয় পেলে আনন্দ হয় বটে, কিন্তু এই জয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তন করে না। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল সামগ্রিকভাবেই বিশ্বমানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দলই শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে নেই, যা এই অঞ্চলের ফুটবলের সামগ্রিক দুর্বলতাকে প্রকাশ করে।

একটি দেশের ফুটবলারদের মান তৈরি হয় প্রতিনিয়ত উচ্চমানের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে। যখন একজন খেলোয়াড় বারবার দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলেন, তখন তার ব্যক্তিগত উন্নতি থেমে যায়। গতি, কৌশল, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এই গুণগুলো কেবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলেই অর্জন করা যায়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা অস্ট্রেলিয়া আজ এশিয়ার ফুটবলে শীর্ষে, কারণ তারা কখনো নিজেদের আঞ্চলিক গণ্ডিতে আটকে থাকেনি। তারা ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত প্রীতি ম্যাচ খেলেছে, বিদেশি লিগে খেলোয়াড় পাঠিয়েছে এবং উচ্চমানের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশকে এই শিক্ষা নিতে হবে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ অবশ্যই চলবে, কিন্তু পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি আফ্রিকার দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এএফসি কাপ বাছাই পর্বে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। ঘরোয়া লিগে বিদেশি খেলোয়াড়দের সংখ্যা ও মান বাড়ালে দেশীয় খেলোয়াড়রাও প্রতিদিনের অনুশীলন ও ম্যাচে উচ্চমানের চাপের মুখোমুখি হবে, যা তাদের দ্রুত উন্নত করবে। শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ঘুরপাক খেলে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক শক্তি হতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক ফুটবলের মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিযোগিতার পরিধি দুটোই বাড়াতে হবে।

লেখক
লেখক

ফুটবলের মান উন্নয়নে বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশের ফুটবলকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে কেবল জাতীয় দলের উন্নতিতে মনোযোগ দিলে চলবে না। একটি টেকসই ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যার ভিত্তি হবে তৃণমূল। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত ফুটবল প্রতিযোগিতা চালু করা, গ্রামীণ পর্যায়ে মাঠ নির্মাণ এবং প্রশিক্ষিত কোচ নিয়োগ করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে কোটি কোটি তরুণ রয়েছে যারা ফুটবল ভালোবাসে, কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা এগিয়ে যেতে পারে না। এই বিশাল মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য একটি জাতীয় ফুটবল একাডেমি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

ঘরোয়া লিগকে আরও পেশাদার ও আকর্ষণীয় করতে হবে। ক্লাবগুলোকে করপোরেট বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে এবং খেলোয়াড়দের ন্যায্য বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। লিগের সম্প্রচার মান উন্নত করে টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করা গেলে দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে এবং স্পন্সরশিপও আসবে।

হামজা চৌধুরীর মতো প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তি একটি বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইউরোপ ও অন্য দেশে বেড়ে ওঠা এই খেলোয়াড়রা উন্নত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন। তাদের মাধ্যমে দেশীয় খেলোয়াড়রা অনুপ্রাণিত হবে এবং দলের মানও বাড়বে। এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করতে বাফুফেকে প্রবাসী বাংলাদেশি ফুটবলারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে।

রেফারি উন্নয়ন, স্পোর্টস সায়েন্সের প্রয়োগ, মানসম্পন্ন মাঠ ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্নীতিমুক্ত ফুটবল প্রশাসন গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল ফেডারেশনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে যতই বিনিয়োগ হোক, তার সুফল মাঠ পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

স্বপ্ন দেখার সাহস কাজ করার দায়

বাংলাদেশের ফুটবল একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে হতাশাজনক র‍্যাঙ্কিং ও ফলাফল। অন্যদিকে হামজা চৌধুরীর আগমন, হাইপ্রোফাইল কোচ আনার পরিকল্পনা ও নতুন প্রজন্মের উৎসাহ। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ফুটবল একটি বড় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। দক্ষিণ এশিয়ার সীমানায় আটকে না থেকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে নিজেদের যাচাই করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, সুপরিকল্পিত কৌশল, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও সৎ নেতৃত্বের মাধ্যমেই এই দেশের ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা সম্ভব। স্বপ্ন দেখার সাহস আছে বাংলাদেশের, এখন দরকার সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সংকল্প ও কার্যকর পদক্ষেপ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ

বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ

একটি দেশের ফুটবলারদের মান তৈরি হয় প্রতিনিয়ত উচ্চমানের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে। যখন একজন খেলোয়াড় বারবার দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলেন, তখন তার ব্যক্তিগত উন্নতি থেমে যায়।

৪ ঘণ্টা আগে

ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

আমাদের সবার প্রয়াস একটিই, আগামী জুন মাসের ২০ ও ২১ তারিখে, ডালাসের চিলড্রেন্স থিয়েটার মঞ্চে, আমরা হুমায়ূন ভক্ত হিসেবে তার ভক্তদের জন্য মিসির আলীর জাদু পরিবেশন করব।

৫ ঘণ্টা আগে

মা, শুধু একবার বলতে চাই, ভালোবাসি

মা, শুধু একবার বলতে চাই, ভালোবাসি

আমি বের হয়ে নিজেই বারান্দায় চলে গেলাম। চোখ মুছে ফেলতে হবে। সারা দিনের কাজ বাকি। আমার নিজের মা, যিনি একই রকম কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন, কত হাজার মাইল দূরে তিনি। আমার আব্বু তার সাথে নেই। একটু তার হাত ধরে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে।

২ দিন আগে

হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল

হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল

অনেকে ভেবেছিল, অচিরেই তেহরানের রাস্তায় আমেরিকান সেনাদের টহল দেখা যাবে। কিন্তু ঘটল উল্টো। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলার খবর পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়।

৩ দিন আগে