logo
মতামত

হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল

ইজাজ আহসান১ ঘণ্টা আগে
Copied!
হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

পৃথিবীর প্রতিটি জাতিরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। ইরানি জাতির ইতিহাস বলছে—তারা সহজে পরাজয় মেনে নেয় না, কারও পদানত হয়ে থাকতে চায় না। প্রাচীন পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী ইরান আজও সেই ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। যখন বিশ্বের বহু রাষ্ট্র আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সামনে নতজানু, তখন ইরান তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির নানা চাপ ও অবরোধের মধ্যেও দেশটি প্রতিরোধের মনোভাব ধরে রেখেছে।

অনেকের ধারণা ছিল, ইরানের পরিণতিও হয়তো ভেনেজুয়েলার মতো হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো দুর্বল করে দেওয়া। ধারণা করা হয়েছিল, শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়া এবং সীমিত সামরিক শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়েই পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব আরও শক্তিশালী করা, জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অস্ত্র ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করার স্বপ্নও ছিল তাদের।

কিন্তু বাস্তবতা প্রত্যাশার চেয়ে ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের প্রতিরোধ কেবল সামরিক শক্তির নয়, বরং কৌশলগত প্রস্তুতিরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। সামরিক শক্তির বিচারে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তুলনা চলে না। আধুনিক যুদ্ধে বিমানবাহিনী ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিজয়ের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের শীর্ষ শক্তিগুলোর একটি। দীর্ঘ অর্থনৈতিক অবরোধে থাকা ইরান যে এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তা অনেকের কাছেই ছিল অকল্পনীয়।

অনেকে ভেবেছিল, অচিরেই তেহরানের রাস্তায় আমেরিকান সেনাদের টহল দেখা যাবে। কিন্তু ঘটল উল্টো। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলার খবর পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। প্রশ্ন উঠল—কীভাবে এমন প্রতিরোধ সম্ভব হলো?

ইতিহাস বলে, অনেক সময় যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রের চেয়ে কৌশলই বড় ভূমিকা রাখে। সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বল পক্ষও সঠিক কৌশলের মাধ্যমে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বিপাকে ফেলেছে—এমন উদাহরণ ইতিহাসে অসংখ্য। ইরানের সামরিক কৌশল সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে ইসলামের ইতিহাসের খন্দকের যুদ্ধের কথা স্মরণ করা যায়। মক্কার কুরাইশ, ইহুদি ও বিভিন্ন গোত্রের প্রায় ১০ হাজার সেনার সম্মিলিত বাহিনী মদিনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। অপরদিকে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজারের মতো। এই অসম পরিস্থিতিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

তখন পারস্যের অধিবাসী হজরত সালমান ফারসি (রা.) একটি অভিনব কৌশলের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, পারস্যে শত্রুর অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে শহরের চারপাশে পরিখা খনন করা হতো। মহানবী (সা.) সেই পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং মদিনার উন্মুক্ত অংশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। আরবরা আগে এমন কৌশল দেখেনি। ফলে শত্রুপক্ষ হতবাক হয়ে যায় এবং দীর্ঘ অবরোধের পরও মদিনা দখলে ব্যর্থ হয়। ইতিহাসে এটি ‘খন্দকের যুদ্ধ’ বা ‘ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ার’-এর এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে পরিচিত।

দেড় হাজার বছর পর পারস্য সভ্যতার উত্তরসূরি ইরান যেন আবারও নতুন ধরনের যুদ্ধকৌশলের প্রয়োগ দেখাল। ইরান জানত, প্রচলিত বিমানযুদ্ধে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। তাই তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে মনোযোগ দেয়। ঝাঁকে ঝাঁকে আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলা হয়। ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এসব মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষকে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপের মুখে পড়তে হয়। এরপর আসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ধারাবাহিকতা।

শুধু তাই নয়, ভূখণ্ডজুড়ে নকল বিমান ও সামরিক সরঞ্জাম স্থাপন করেও প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে হামলার পর বোঝা যায়, লক্ষ্যবস্তু ছিল প্রতারণামূলক বা ডামি স্থাপনা। এসব কৌশল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তোলে।

আরও বড় চাপ সৃষ্টি হয় হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার মাধ্যমে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। একই সঙ্গে ইরান কূটনৈতিকভাবেও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে যে তাদের মূল লক্ষ্য বিদেশি সামরিক ঘাঁটি, প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব নয়।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তুলতে পেরেছিল, এবার সেই পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন ছিল। ফলে কূটনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—আধুনিক যুদ্ধের ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শুধু বিমানবাহী রণতরি, উন্নত যুদ্ধবিমান কিংবা বিপুল সামরিক বাজেটই বিজয়ের নিশ্চয়তা নয়। তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্রও নতুন কৌশল, প্রযুক্তি ও অসম যুদ্ধনীতির মাধ্যমে শক্তিধর প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।

ইরানের অভিজ্ঞতা তাই বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর কাছেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—সঠিক কৌশল, প্রযুক্তি ও জনগণের সমর্থন থাকলে প্রতিরোধ সম্ভব।

তবে এটিও সত্য, যুদ্ধ কখনও স্থায়ী সমাধান নয়। বিশ্ববাসী যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়। কিন্তু ইতিহাস বলছে, কখনও কখনো সংঘাতের মধ্য দিয়েই নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয় এবং শান্তির পথ খুঁজে নিতে হয়।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

ইজাজ আহসান: ইমেইল: [email protected], WhatsApp: +968-93887564

আরও দেখুন

হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল

হার না মানা বীরের যুদ্ধকৌশল

অনেকে ভেবেছিল, অচিরেই তেহরানের রাস্তায় আমেরিকান সেনাদের টহল দেখা যাবে। কিন্তু ঘটল উল্টো। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে নিজেদের রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিল। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলার খবর পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়।

১ ঘণ্টা আগে

সিনেমার নায়ক থেকে বাস্তবের চ্যালেঞ্জ: শপথের আগেই অগ্নিপরীক্ষায় থালাপতি

সিনেমার নায়ক থেকে বাস্তবের চ্যালেঞ্জ: শপথের আগেই অগ্নিপরীক্ষায় থালাপতি

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বর্তমান ক্ষমতাসীন শিবির কোনোভাবেই থালাপতি বিজয়ের দ্রুত উত্থানকে সহজভাবে নিতে পারছে না। খুব অল্প সময়ে তিনি তরুণ ভোটার, মধ্যবিত্ত এবং সিনেমাপ্রেমী সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছেন। ফলে তাকে শুরুতেই রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে।

২ দিন আগে

কবিতা: সেদিনের আকাশ

কবিতা: সেদিনের আকাশ

কী এক আবেশে ছুটে চললাম পিছু পিছু/ জোৎস্না দেখার লোভ ছাড়ল না/ এভাবেই কেটে গেল প্রহর/ পৃথিবীতে সব কিছুর অবসান হয়/ জোৎস্নাও চলে যায় আর রেখে যায় অমাবস্যা।

২ দিন আগে

কবিতা: বিশেষণ তোমার ভালোবাসা

কবিতা: বিশেষণ তোমার ভালোবাসা

তোমার ভালোবাসা নিবিড়,/ শীতের রাতে কাঁথার মতো যা শরীর ও মন দুটোকেই জড়িয়ে রাখে।

৭ দিন আগে