logo
মতামত

ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

মঞ্জুর চৌধুরী১২ মে ২০২৬
Copied!
ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন স্বপ্ন কারিগর। একজন দক্ষ জাদুকর। গল্প বুননের জাদুতে মুগ্ধ করার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্নটা তার পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন।

শৈশবে হুমায়ূন পড়ার দশা এই হলো যে, একটা সময়ে নিজেকেও সৃষ্টিশীল ভাবতে শুরু করলাম। লেখালেখি, অভিনয়, নাটক—কিছু না কিছুর সাথে যুক্ত না থাকতে পারলে কেমন দম বন্ধ দম বন্ধ বোধহয়। নেশাগ্রস্ত মানুষ যেমন নেশাদ্রব্য না পেলে অস্থির থাকে, আমারও একই হাল হলো।

সেই তাড়না থেকেই সৃষ্টি হলো রঙ্গমঞ্চের। আমাদের নিজস্ব থিয়েটার। আমাদের মতো করে দেখা স্বপ্নগুলো দর্শকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস।

1 on stage in Dallas

এর আগেও আমরা মঞ্চনাটক করতাম। বড় বড় নাট্যকারের লেখা স্ক্রিপ্টে বড় বড় নির্দেশকের দেওয়া নির্দেশনায় কাগজে লেখা চরিত্রগুলোকে প্রাণ দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেগুলো ছিল অন্যের স্বপ্ন, অন্যের পরিকল্পনা। এবার থাকবে আমাদের একান্ত স্বাধীনতা।

রঙ্গমঞ্চের প্রথম পরিবেশনা কী হতে পারে?

মন থেকে আওয়াজ এলো হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট কিছুই হওয়া উচিত।

যে ব্যক্তিটি আমাদের স্বপ্ন দেখার কৌশল শিখিয়েছেন, তাকে গুরু দক্ষিণা প্রদান। গুরুকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েই হোক আমাদের যাত্রা শুরু। এরপরে যাকে নিয়ে যা খুশি করি করা যাবে, কিন্তু শুরুটা হোক হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই।

2 on stage in Dallas

তারপরে প্রশ্ন এলো, তার কোন সৃষ্টিকে নিয়ে নাড়াচাড়া করব? শ খানেক টিভি নাটক আছে, দুই শর ওপরে গল্প–উপন্যাস আছে, তার নিজের লেখা একাধিক মঞ্চ নাটকও আছে। একটি নাটকতো আমরাই করেছিলাম, ‘১৯৭১’- দারুণ দর্শক সমাদৃত হয়েছিল। নাটক শেষে পুরো দর্শকসারি উঠে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়েছিল। হাততালি আর চোখের পানি থামছিল না। সেটাই কি আবার মঞ্চে আনা হবে? আবারও একই জাদু তৈরি করা সম্ভব হবে?

এক রাতে হঠাৎই মাথায় এলো, জ্বিন কফিলকেই নাট্যরূপ দেওয়া যাক।

ব্যক্তিগতভাবে হুমায়ূন সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলী আমার সবচেয়ে প্রিয়তম চরিত্র। বাচ্চাদের সুপারহিরো হয় ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, আয়রনম্যান—আমার সুপারহিরো ছিলেন এবং আছেন মিসির আলী। তা ছাড়া, তাকে নিয়ে তেমন কাজ হয়নি কোথাও। আমরাই না হয় শুরুটা করি।

জ্বিন কফিল গল্পটাকে বেছে নিলাম। কেন নিলাম, সেই গল্প অন্যদিন বলা যাবে।

3 on stage in Dallas

রাত দশটায় নাট্যরূপ দিতে বসলাম। রাত বাড়ে, আমার হাতের গতিও বাড়ে। চোখের সামনে চরিত্রগুলো দেখতে পারছি, ওরা হারিয়ে যাওয়ার আগেই লেখা শেষ করতে হবে। না হলে হয়তো আর কোনোদিনই শেষ হবে না।

এক রাতেই স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হলো।

ডালাসপ্রবাসী নাট্য পরিচালক ও রঙ্গমঞ্চ থিয়েটারের প্রধান ব্যক্তি ফরহাদ হোসেন ভাইকে ফাইল পাঠিয়ে বললাম, “কেমন হবে?”

তিনি অভিজ্ঞ মানুষ। বললেন, মঞ্চে এই নাটক করা টেকনিক্যালি অনেক ডিফিকাল্ট।

তারপরেও আমরা সাহস করলাম। গ্রুপের অন্য সদস্যদের সাথে রিডিং সেশন হলো। গল্প প্রত্যেকেরই দুর্দান্ত লেগেছে। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল একে মঞ্চস্থ করা। সবাই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। কারণ গল্পটা যে সবাইকে জানাতে হবে।

4 on stage in Dallas

রিহার্সেলের পাশাপাশি স্ক্রিপ্ট ঘষামাজা চলতে লাগল।

এই পথচলায় আমাদের সাথে অনেক গুণী ব্যক্তিত্বরাই যুক্ত হতে শুরু করলেন।

আমাদের নাট্যজগতের মহীরুহ শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশিদ এক রিহার্সেল দেখে লতিফা চরিত্রের অভিনেত্রীকে ডেকে এনে বললেন, “এমন চরিত্র once in a life time কোনো অভিনেত্রীর ভাগ্যে জোটে। এর ওপর সুবিচার করতে হবে। এইটা মনে রাখবা।”

মেহের আফরোজ শাওন গল্পের নাম শুনেই বলেন, "লতিফার গল্পটা? এটাতো অনেক কঠিন গল্প! আপনাদের সাহসের তারিফ করতে হয়!"

ফরহাদ ভাই ওনার প্রিয় বন্ধু চ্যাট জিপিটিকে জিজ্ঞেস করলেন এই প্রজেক্ট কেমন? চ্যাট জিপিটি জবাব দিল "অতি বিপজ্জনক!"

আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। "সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়?"

5 on stage in Dallas

আমাদের যাত্রায় যুক্ত হলেন হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘদিনের ডান হাত, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জুয়েল রানা। তিনি এতটাই মুগ্ধ যে, বারবার বলছেন, "আপনারা আমেরিকায় থেকে এমন জটিল নাটক করতে যাচ্ছেন শুধু স্যারের জন্য?"

আবহ সংগীতে চলে এলেন হুমায়ূন আহমেদের প্রিয়তম সংগীত পরিচালক, যার সুরের জাদুতে মুগ্ধ হতেন আমাদের গল্পের জাদুকর স্বয়ং, মকসুদ জামিল মিন্টু।

আমাদের সবার প্রয়াস একটিই, আগামী জুন মাসের ২০ ও ২১ তারিখে, ডালাসের চিলড্রেন্স থিয়েটার মঞ্চে, আমরা হুমায়ূন ভক্ত হিসেবে তার ভক্তদের জন্য মিসির আলীর জাদু পরিবেশন করব।

যতদূর জানি, বিশ্বে কেউ কখনো কোনো দিন মিসির আলীকে মঞ্চে উপস্থাপন করেনি। আমরাই প্রথম হতে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে আবেগময়।

আমরা চাই আমাদের দর্শকেরাও সেই আবেগের সঙ্গী হন।

মঞ্জুর চৌধুরী: ডালাস, টেক্সাস, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

আরও দেখুন

যেখানে বাতাসে মাটির গন্ধ, জলে শান্তির ছোঁয়া

যেখানে বাতাসে মাটির গন্ধ, জলে শান্তির ছোঁয়া

চর সিঙ্গুইর গ্রামে পৌঁছে নামের সঙ্গে গ্রামের পরিবেশের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। যে বাড়িতে আমরা পৌঁছালাম, তার ঠিক পেছনেই বিশাল জলাভূমি। কচুরিপানায় ভরা সেই জলরাশি দেখতে যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। কয়েকজন কিশোর জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তাদের হাসি আর চিৎকারে চারপাশ মুখরিত।

২ দিন আগে

কবিতা: কাজল

কবিতা: কাজল

কত রোদের রং তামাটে হলো/ অথচ অনিবার্য ভোরের মতোই/ তোমার আসা উচিৎ ছিল আরও আগে/ তবে কি এতদিন একাকী ঘুঘুর মতো উদাসীন ছিলাম আমি?

৪ দিন আগে

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

গণহত্যার স্মৃতি ও একটি জাতির ঘুরে দাঁড়ানো

রুয়ান্ডার সমাজে দীর্ঘদিন ধরে হুতু ও তুতসি পরিচয় বিদ্যমান ছিল। কিন্তু এই পরিচয়কে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো, তখন একটি সাধারণ সামাজিক বিভাজন ভয়াবহ সংঘাতে রূপ নেয়।

৬ দিন আগে