
জীবিতরা জানিয়েছেন, সমুদ্রের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত বৈরী। কয়েক ফুট উঁচু ঢেউয়ের আঘাতে যাত্রার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। লিবীয় জলসীমার ভেতরেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় নৌকাটি। জীবন বাঁচাতে অনেকেই সাগরের হিমশীতল পানিতে ঝাঁপ দেন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের তালিকায় শীর্ষে আছে বাংলাদেশের নাগরিকেরা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেছেন।
এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কেন একটি তরুণকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে হয়? কেন সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়া তার জন্য একমাত্র পথ?
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে দিরাই উপজেলা কর্মকর্তা সনজিব সরকার আজ রোববার সকালে জানান, নিহতদের মধ্যে চারজন দিরাই উপজেলার। এরা হলেন- তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), সাজিদুর রহমান (২৮), শাহান মিয়া (২৫) এবং রনারচর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৩৮)।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবিতদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশ, চারজন দক্ষিণ সুদান ও একজন চাদের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন কোস্টগার্ড। তাদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নৌকাডুবির ঘটনায় একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং অন্তত ৫০ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজদের ডুবে মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি প্রায় ২৪ ঘণ্টা সমুদ্রে ভেসে ছিলেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক দিনের মধ্যে মাল্টা কর্তৃপক্ষ ৪৪ জন অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। ফেরত পাঠানো এসব অভিবাসীদের গত ১২ ডিসেম্বর ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া একটি নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দক্ষিণ থেকে বাংলাদেশিসহ প্রায় ৫৪০ জন আশ্রয়প্রার্থীকে উদ্ধার করেছে দেশটির উপকূলরক্ষী বাহিনী। একটি নৌকা থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার যুবক সজীব সরদারের (২৯) স্বপ্ন ছিল ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার। পরিবারও তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য যা কিছু ছিল প্রায় সবই বিক্রি করে দিয়েছে। পরিবারটি আশা ছিল, ছেলে ইতালি পৌঁছে রোজগার করে একদিন সব ঠিক করে ফেলবে।
লিবিয়া পৌঁছে ৪ মার্চ ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন ওই দুই তরুণসহ ১০ যুবক। মাঝপথে ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। আগুন থেকে বাঁচতে অভিবাসনপ্রত্যাশী অনেকেই সাগরে ঝাঁপ দেন। এ সময় সাগরে নিখোঁজ হন সুমন ও নাসির।
মাদারীপুরের তরুণ সাইদুল ব্যাপারী (২৩) ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালাল ধরেন। দালালের সঙ্গে চুক্তি ছিল, যেভাবেই হোক বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে পৌঁছে দেবেন। শেষ পর্যন্ত সাইদুলকে জীবিত নয়, দালালের নির্যাতনে মারা যাওয়ার পরে মৃত অবস্থায় নৌকায় ইতালি পাঠানো হয়েছে।
দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে ইতালিতে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে লিবিয়ায় গিয়ে এক বছর যাবৎ নিখোঁজ শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলার ২৪ তরুণ-যুবক। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাদের স্বজনেরা। নিরুপায় হয়ে তারা এখন আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছেন আদালত চত্বরে।
সম্প্রতি লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর জাওয়াইয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা ভূমধ্যসাগরের মাঝপথে দুর্ঘটনায় পড়ে। নৌকাটি গত সপ্তাহে লিবিয়া উপকূল ছেড়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। এ দুর্ঘটনায় এখনো ৭ বাংলাদেশি নিখোঁজ আছে বলে ধারণা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কুদ্দুস ব্যাপারী (৩৩) ছিলেন মালয়েশিয়ায়। ৬ মাস আগে ছুটিতে দেশে আসেন। এরপর স্থানীয় দালাল মনিরের প্রলোভনে পড়ে ইতালি যেতে রাজি হন তিনি। অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছাতে ১৬ লাখ টাকায় হয় ‘বডি কন্ট্রাক্ট’।
ইতালি গিয়ে স্বপ্নপূরণ করতে চেয়েছিলেন সুজন ফরাজী। বৈধ পথে সুযোগ না পেয়ে অবৈধভাবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুজনের সিদ্ধান্তে পরিবারের অন্য সদস্যরা সম্মতি দিলেও ঝুঁকি নিতে রাজি হননি বাবা মিরাজুল ইসলাম। এ নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে কয়েক দফা বাগ্বিতণ্ডাও হয়।
আমার ভাইডা আর আমার ছওয়ালডার (ছেলে) একসাথে ইতালি যাইবার স্বপ্ন ছিল। সেই দিনকা রাইতেও কথা হইছিল। ওরা দুজনই কইল, ভালো আছে, কোনো সমস্যা নাই। দালালে নাকি ওগের খুব তারাতারি গেম দিব। এই কি সেই গেম! আমার ছওয়ালও নাই, ভাইও নাই। হায় আল্লাহ, আমার লগে এইডা কী হইল।
লিবিয়ার পূর্ব উপকূলে মোট ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা লিবিয়া থেকে নৌযানে করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ৫৬ জন আরোহী নিয়ে নৌযানটি গত ২৫ জানুয়ারি ভূমধ্যসাগরে ডুবে যায়।
লিবিয়ার ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী একটি এলাকা থেকে ২০ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি নাগরিক। তবে পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
লিবিয়া উপকূল থেকে ৩৪ জন নারী ও ৬ শিশুসহ ৪৯৯ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারের পর বাংলাদেশিসহ ৪৯ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে ইতালির আনকোনায় পৌঁছেছে ইতালিয়ান এনজিও ইমার্জেন্সির উদ্ধারকারী জাহাজ লাইফ সাপোর্ট। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে বাংলাদেশি ছাড়াও সিরিয়া ও মিসরের নাগরিকেরা রয়েছেন।

সম্প্রতি লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র উপকূলবর্তী শহর জাওয়াইয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা ভূমধ্যসাগরের মাঝপথে দুর্ঘটনায় পড়ে। নৌকাটি গত সপ্তাহে লিবিয়া উপকূল ছেড়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। এ দুর্ঘটনায় এখনো ৭ বাংলাদেশি নিখোঁজ আছে বলে ধারণা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫