logo
মতামত

আব্বু আমার শুকতারা

ফারহানা আহমেদ লিসা
ফারহানা আহমেদ লিসা২১ জুন ২০২৬
Copied!
আব্বু আমার শুকতারা
বাবার সঙ্গে লেখক

বাবা দিবস এসে গেল। যা দেখি তাতেই মনে হয়, ইশ্ যদি আর একটিবার বলতে পারতাম ভালোবাসি। বাবাকে নিয়ে কত আয়োজন চারদিকে। তবে আমি জানি আব্বু, আপনি জানতেন আমি আপনাকে কত ভালোবাসি।

আব্বুর হার্ট অ্যাটাক হয় আমি যখন ছোট, স্কুলে পড়ি। তার বয়স ৪১ হবে তখন। ডাক্তার চাচা বাসায় এসে চিকিৎসা দিলেন। বেশ কিছুদিন আব্বু বাসায় ছিলেন। ফুটবল খেলা আব্বু, পুলে সাঁতার করা আব্বু, বাসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা ওপেন হার্ট সার্জারি বহু বছর পরের কথা। মেডিকেল ম্যানেজমেন্ট করা হয়েছিল। সে সময়ে আম্মি চিন্তা করলেন সংসারের হাল ধরা উচিত আব্বুর সঙ্গে। তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেন, পোস্টিং ফেনী মহিলা কলেজ। আম্মি চলে গেলেন।

আমি আর আমার ভাই রয়ে গেলাম খুলনায়। আব্বু আমাদের মোটামুটি একা মানুষ করলেন স্কুল–কলেজের ওই সময়টায়। আম্মি চেষ্টা করতেন ছুটি হলেই খুলনা চলে আসতে; কিন্তু আমরা মোটামুটি আব্বুর সঙ্গেই ছিলাম। আম্মির পোস্টিং খুলনা মহিলা কলেজে হয়েছিল আমি এইচএসসি দেওয়ার আগে বোধ হয়। ক্লাস এইটে সেকেন্ড গ্রেডে স্কলারশিপ পাওয়ার পর আব্বুর মুখ হাঁড়ি কেন বা ইন্টার স্কুল ডিবেটে ঢাকা/বাড়বকুন্ড যেতে আব্বু এত বিরক্ত কেন তখন বুঝিনি। হাইজাম্পে ইন্টার স্কুল কম্পিটিশনে যখন অন্য স্কুলে আমি এবং বিরক্ত হয়ে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছিল বাসায়, তখনো আমি বুঝিনি কেন। আমি বুঝতাম না আমি মেয়েসন্তান এবং পড়াশোনা করাটা কতটা জরুরি সবার জন্য জীবনে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চাইলে। কলোনির রাস্তায় সাইকেল চালানো বা পুলে শুধু মেয়েদের সময়ে সাঁতার কাটার কোনো বাধা ছিল না। বাধা ছিল না স্কুলের সব এক্সট্রা কারিকুলামে থাকতে। কারণ, আব্বু নিশ্চিত করতেন আমি নিরাপদ। কিন্তু পড়াশোনা করার ব্যাপারে কোনো ছাড় ছিল না। বলতেন, “মা, দুনিয়ার সবকিছু সবাই নিয়ে যেতে পারবে; কিন্তু তোমার বিদ্যাটুকু কেউ নিতে পারবে না। নিজের পায়ে তোমাকে দাঁড়াতেই হবে।”

আর এশিয়ান বাবাদের কত রকম বাহানা শুনি। এটা খেতে পারেন না তো ওটা করে দিতে হয়। আম্মি চাকরিতে চলে যাওয়ার পর আমার আব্বু খুকির মার রান্না করা খাবার মাসের পর মাস খেয়েছেন, নিজের কাজ নিজে করেছেন, আমাদের একটা নিরাপদ জায়গায় মানুষ করেছেন। কোনো অভিযোগ শুনিনি। মেডিকেলে পড়ার সময় আগে আগে টাকা শেষ করে কতবার আব্বুকে চট্টগ্রাম আনিয়েছি টাকা দিয়ে যাওয়ার জন্য। বিকাশ চালু হওয়ার আগের সময় তখন। শুধু শুনতাম, আমার পাগলটা। এক জেনারেশন আগের আব্বু যতটা ধৈর্য নিয়ে, সাহস নিয়ে জীবন পার করেছেন, সেটা আমার কল্পনায়ও আসে না, কীভাবে সম্ভব। আব্বু চলে গেছেন গত ডিসেম্বরে। আমার বোনের আফসোস, আম্মি একটু কম রিজিড হলে এটা করা যেত, তার জন্য আরও কত কিছু করা যেত। কিন্তু আমি জানি, আমার আম্মি পৃথিবীতে আমার আব্বুর সবচেয়ে পছন্দের মানুষ ছিলেন। তার হাতে খেয়ে, তার হাতে সেবা পেয়ে জীবনের শেষ মুহূর্ত কাটিয়েছেন তিনি। পৃথিবীর কোনো হাসপাতাল বা কোনো নার্স বা কোনো সেবা এই শান্তি তাকে দিতে পারত না।

আমার বাচ্চারা বড় হয়েছে একটু, তবু গত সাত বছরে বহুবার মনে হয়েছে সিঙ্গেল প্যারেন্টিং এত কঠিন কেন? আমি পারছি তো? পারব? তারপর শুকতারাটা দেখি কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পথে আর বলি, “আব্বু, কত বছর আগে আপনি সব প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে যা শিখিয়ে গেছেন, আমি এ সময়ে আপনার মেয়ে হয়ে কেন সেটা কাজে লাগাতে পারব না?”

পৃথিবীর সব ভালো বাবাদের বাবা দিবসের শুভেচ্ছা। বাচ্চারা হয়তো বলতে পারছে না; কিন্তু সব ভালোবাসা ওদের হৃদয়ে ধারণ করে ওরা। আমার মতো। আল্লাহ আমার আব্বুকে আপনি বেহেশত নসিব করুন। ওনার সৎ জীবনযাপনের উত্তম প্রতিদান দিন। আমিন।

*ফারহানা আহমেদ লিসা: সান ডিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

০৪ জুলাই ২০২৬

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

০৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

০২ জুলাই ২০২৬

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

০২ জুলাই ২০২৬