logo
মতামত

কিংবদন্তির জন্ম

মঞ্জুর চৌধুরী৭ ঘণ্টা আগে
Copied!
কিংবদন্তির জন্ম
ফুটবল–দুনিয়ায় প্রথম বিশ্ব তারকা পেলে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

১৯৫০ সালের একদিন নয় বছরের এক শিশু বালক লুকিয়ে লুকিয়ে রেডিওতে ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালের ধারাভাষ্য শুনছিল।

তারা গরিব, তাদের নিজস্ব রেডিও ছিল না। সমস্ত পাড়ায় হয়তো বা একটি রেডিও, সেই ছোট্ট রেডিওর সামনেই ভিড় করত সমস্ত এলাকাবাসী।

তা ভিড় করার মতোই অনুষ্ঠান চলছিল সেদিন। ব্রাজিল স্বাগতিক দেশ, বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। ফাইনালে ড্র করলেই ওরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবে। সেই পথেই দল এগোচ্ছিল। সবাই যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই একদম শেষ মুহূর্তে হঠাৎ সব ওলটপালট হয়ে যায়। তার দল, তার দেশ সেই ম্যাচ হেরে যায়। ছেলেটি কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ানের মতোই তার বাবাকেও অঝোরে কাঁদতে দেখে।

বড়দের কাঁদতে দেখা কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা নয়।

শিশুটি তখন বাবাকে সান্তনা দিয়ে বলে, "কেঁদো না বাবা, আমি তোমার জন্য বিশ্বকাপ জয় করব!"

ছেলেটির নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো—সেই ঘটনার এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে গোটা বিশ্ব যাকে ‘পেলে’ নামে চিনবে।

পেলের বাবাও ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। এক ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সংসার চালাতে থাকেন।

পেলের মায়ের তাই ইচ্ছে ছিল ছেলে ফুটবলের ধারেকাছেও না যাক। সে লেখাপড়া করুক, ভাল কোনো চাকরি করুক। মা চাননি বাবার মতোই হতভাগ্যের জীবন ছেলের হোক।

কিন্তু ছেলের যে জন্ম হয়েছিল রাজা হওয়ার ভাগ্য নিয়ে! সে কি অফিসের ফাইল ঘাটাঘাটি করে জীবন কাটাতে পারবে?

রক্তে ছিল ফুটবল। কিন্তু পকেট গড়ের মাঠ।

বল কেনার টাকা নেই। কাপড় মুড়িয়ে বস্তির অন্য ছেলেদের সাথে ফুটবল ড্রিবলিং খেলে সময় কাটে। মায়ের বকুনি, বাবার প্রশ্রয়। গাছের আম দিয়ে কিক প্র্যাকটিস করে।

কী কঠিন সময় যে গিয়েছে!

তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমে না।

উপরওয়ালাও এই ভালোবাসা আর পাগলামির মূল্য দিতে শুরু করেন। সৌভাগ্যের দরজা একে একে খুলতে থাকে।

পাড়ার ফুটবল থেকে পেশাদার লীগ হয়ে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সে ব্রাজিল দলে ডাক পায়। খেলতে যায় সুইডেন, বিশ্বকাপ ১৯৫৮।

‘পেলে’ তথ্যচিত্রের দৃশ্য। ছবি–নেটফ্লিক্স
‘পেলে’ তথ্যচিত্রের দৃশ্য। ছবি–নেটফ্লিক্স

মাঝে আরেকটি বিশ্বকাপ পেরিয়ে গেছে। ব্রাজিল ইউরোপিয়ান দল হাঙ্গেরির হাতে মার খেয়ে হেরে যায়। আক্ষরিক অর্থেই ‘মার’, ম্যাচটি ‘দ্য ব্যাটল অব বার্ন’ নামে পরিচিত। খেলায় অসংখ্য সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, তিনটি লাল কার্ড, দুটি পেনাল্টি এবং ছয়টি গোল হয়। শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরি ৪-২ ব্যবধানে জয় পায়। ম্যাচ শেষে টানেলেও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি হয়। সুন্দর আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত দুই দলই সেদিন রুক্ষ ও সহিংস ফুটবল খেলেছিল। ব্রাজিল আবারও শিরোপাহীন অবস্থায় দেশে ফিরে আসে।

মারাকানা ট্রাজেডির পর ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে খুব সমালোচনা ওঠে। এতগুলো টুর্নামেন্ট হয়ে গেছে, অথচ ব্রাজিল একটিতেও সাফল্য পায়নি। এদিকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার সব ধরনের অভিজ্ঞতাই দর্শকদের দিয়েছে। প্রথম রাউন্ডে বাদ, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ, সেমি ফাইনাল এমনকি ফাইনালেও বাদ পড়েছে।

ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ফুটবল কেবলই খেলা নয়, ওটাই জীবন। স্বাধীনচেতা মানসিকতার ব্রাজিলিয়ানদের ‘জিঙ্গা ফুটবল’ কেবল দেখতেই সুন্দর, কিন্তু ওটা দিয়ে বিশ্বকাপ জয় সম্ভব নয়। বিশ্বকাপ জিততে হলে ইউরোপিয়ানদের মতোন ডিসিপ্লিন্ড ফুটবল খেলতে হবে। কাজেই ব্রাজিলকে খেলার স্টাইল পাল্টাতে হয়, কাপ জিততে হবে!

ব্রাজিল ফাইনালে পৌঁছে ঠিকই, কিন্তু টুর্নামেন্টজুড়ে ওরা যেভাবে খেলছিল, সেটাকে ঠিক ব্রাজিলীয় ‘জিঙ্গা’ ফুটবল বলে না। কার্যকর ছিল, ম্যাচ জিতছিল, কিন্তু খেলোয়াড়দেরই মন ভরছিল না।

কোচের কাছে সবচেয়ে বেশি বকুনি খাচ্ছিল পেলে। ছেলের বিদ্রোহী মন কিছুতেই জিঙ্গা ছাড়তে রাজি নয়। কিন্তু কোচের কথা না শুনেও উপায় নেই।

ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিরুদ্ধে যখন ব্রাজিল খেলতে নামে এবং প্রথম চার মিনিটেই গোল খেয়ে পিছিয়ে যায়, মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল এবারও ব্রাজিল হারতে চলেছে।

ভালো কথা, সেই বিশ্বকাপই প্রথম সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার হয়।

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

বিশ্বকাপ ফাইনালে শূন্য এক গোলে পিছিয়ে থাকার পরে ব্রাজিল দেখালো কীভাবে ম্যাচে ফিরে আসতে হয়। সেভাবে ফিরে আসা যা কেবল ব্রাজিলই করে দেখাতে পারে।

‘পেলে’ তথ্যচিত্রের দৃশ্য। নেটফ্লিক্স
‘পেলে’ তথ্যচিত্রের দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

গোল হজম করার পরেই ব্রাজিল শুরু করে ‘জিঙ্গা’ স্টাইল ফুটবল। টেলিভিশনের পর্দায় গোটা বিশ্ব মুগ্ধ হয়ে দেখল যেন একটা দল মাঠে খেলতে নামেনি, ওরা ফুটবলকে নিয়ে কোন ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশন করতে এসেছে। কোথায় ইউরোপিয়ান শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল? এতো স্বাধীন, বুনো, কিন্তু সৌন্দর্য্যে ঠাসা একটি মহৎ শিল্প!

নবম মিনিটে ভাভা গোল করল। বত্রিশতম মিনিটে ভাভা আরেকটি গোল করল। পুরো খেলা তখন ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণে। দর্শক তখন ব্রাজিলের খেলায় মুগ্ধ। ল্যাটিন ফুটবলের জয়জয়কার!

পঞ্চান্ন মিনিটে পেলে যে গোলটি করল, উপস্থিত জনতা এবং টেলিভিশনের সামনে বসা ল্যাটিন আমেরিকা থেকে ইউরোপ-এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এমনকি আফ্রিকাসহ বিশ্বের কোণে কোণে ছড়িয়ে থাকা লাখো কোটি দর্শক এমন গোল জীবনেও দেখেননি। সবাই বাকরুদ্ধ! একটি কিশোর ছেলে, যার গালে ঠিকমতো দাড়ি গজানো শুরু হয়নি, বিশ্বকাপ ফাইনালের চাপে যে পিষ্ট হওয়ার কথা, সে কি না বুক দিয়ে বল রিসিভ করে একজন ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে ফ্লিক করে ভলি করে জালে জড়িয়ে দিল! এত ঠান্ডা মাথা! এত ক্ষুরধার মস্তিষ্ক! তখন পর্যন্ত সেটাই ছিল সবার চোখে দেখা সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন গোল!

এর পরে মারিও জাগালো একটি গোল করে এবং শেষ বাঁশি বাজার আগে পেলে শেষ গোলটি করে।

ব্রাজিল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় পাঁচ-দুই ব্যবধানে।

সুইডেনের ডিফেন্ডার সিগভার্ড পারলিং পরে বলেছিলেন - "পেলে পঞ্চম গোলটি করার পর আর তাকে মার্ক করতে ইচ্ছা করেনি। শুধু দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে চেয়েছিলাম।"

কে বলবে শুরুতে সুইডেন ছিল হট ফেভারিট? ম্যাচের চার মিনিটেই তারা গোল দিয়ে এগিয়েও গিয়েছিল?

সতেরো বছরের কিশোর, স্বাগতিক দেশের সমর্থকে ঠাসা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের বিরুদ্ধেই বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই দুইটা গোল করে ফেলল। আগের ম্যাচের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হ্যাট্রিক করেছিল। সেমিফাইনাল ও ফাইনালের দুই ম্যাচ মিলিয়ে তার গোল সংখ্যা তখন পাঁচ!

আট বছর আগে এক রেস্তোরায় বাবাকে কাঁদতে দেখে তাকে দেওয়া কথা সে রাখতে পেরেছে!

শেষ বাঁশি যখন বেজে উঠল, ওর পা দুটো তার শরীরের ভার নিতে পারছিল না। সে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল আর শিশুর মত কাঁদছিল। সতীর্থরা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে, কাঁধে তুলে নেয়। নাহলে হয়তো সে অজ্ঞান হয়ে যেত।

ব্রাজিল ক্যাপ্টেন বেলিনি বিশ্বকাপ ট্রফিটা প্রথমবারের জন্য মাথার ওপরে ধরেছিল। ফুটবল সৌন্দর্য্যের আতুরঘর ব্রাজিল প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন! তারপর থেকে সেটাই ধারা হয়ে যায়, যেই চ্যাম্পিয়ন হয়, সেই ট্রফিটাকে মাথার ওপর তুলে ধরে।

ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় পেলের ক্যারিয়ার সেদিন আড়মোড়া ভাঙছিল। তার হাত ধরেই ব্রাজিল ফুটবলের রাজত্ব সেই দিনই শুরু হয়।

আজকে যে গোটা বিশ্বে ব্রাজিলের এত এত সমর্থক, এর শুরুর তারিখটা ছিল জুন মাসের ২৯তম দিন, সাল ১৯৫৮।

মঞ্জুর চৌধুরী: ডালাস, টেক্সাস, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

৪ ঘণ্টা আগে

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

৭ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

২ দিন আগে

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

২ দিন আগে