logo
মতামত

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাহার উদ্দিন বকুল, জেদ্দা, সৌদি আরব২ ঘণ্টা আগে
Copied!
বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প
মোহাম্মদ ওমর ফারুক

প্রবাসজীবনের গল্প অনেকেরই থাকে। কিন্তু কিছু গল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো ছুঁয়ে যায় অসংখ্য মানুষের জীবন, একটি সম্প্রদায়ের অগ্রযাত্রা এবং দুই দেশের মধ্যকার মানবিক সেতুবন্ধনকে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে পাড়ি জমানো মোহাম্মদ ওমর ফারুকের দীর্ঘ ২৮ বছরের যাত্রা তেমনই এক অনন্য অধ্যায়।

করপোরেট নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠিত করা এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি—বিভিন্ন ভূমিকায় তার অবদান একজন প্রবাসী পেশাজীবীর সাফল্যকে ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর সামাজিক উচ্চতায় পৌঁছেছে।

১৯৯৮ সালে শুরু হওয়া এক দীর্ঘ যাত্রা

প্রতিটি দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয় একটি ছোট কিন্তু সাহসী সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের মাটি ছেড়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় পাড়ি জমান মোহাম্মদ ওমর ফারুক, যিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে অধিক পরিচিত ওমর ফারুক চৌধুরী নামে।

সেই সময়ের সৌদি আরব ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল এক অর্থনীতি। অবকাঠামো, পরিবহন ও শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও তার সঙ্গে ছিল কঠিন প্রতিযোগিতা এবং নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রাম। ওমর ফারুক এই বাস্তবতাকে কেবল জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং একে গ্রহণ করেছেন শেখার, নিজেকে গড়ে তোলার এবং নিজের সাফল্যের মাধ্যমে অন্যদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসেবে।

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। আজ প্রায় তিন দশক পরে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, তার এই পথচলা কেবল একজন মানুষের কর্মজীবনের ইতিহাস নয়; বরং এটি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নীরবে উজ্জ্বল করে চলেছেন।

Mohammad Omar Faruk 2

করপোরেট জগতে পেশাগত উৎকর্ষের এক দীর্ঘ অধ্যায়

জেদ্দার করপোরেট অঙ্গনে মোহাম্মদ ওমর ফারুকের সুখ্যাতি একজন দক্ষ অপারেশনস ও শেয়ার্ড সার্ভিসেস নেতা হিসেবে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের এমন সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে প্রতিদিনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত শত যানবাহন, হাজারো গ্রাহক এবং বিপুল বিনিয়োগ।

ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট, ওয়ার্কশপ অপারেশন, ভারী বাণিজ্যিক যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা মান নিশ্চিতকরণ, আইনি কমপ্লায়েন্স এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন তিনি। বহু মিলিয়ন সৌদি রিয়ালের রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে তিনি তার পেশাগত দর্শনে পরিণত করেছেন।

করপোরেট ব্যবস্থাপনায় ‘লিন অপারেশন’ (Lean Operations) ধারণাকে বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন, যা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে করেছে আরও গতিশীল ও সাশ্রয়ী। পাশাপাশি শিল্প নিরাপত্তা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বীমা ব্যবস্থাপনায় তার পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কৌশল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় ধরনের সংকট থেকে রক্ষা করেছে।

শিক্ষার নেতৃত্বে আরেকটি অধ্যায়

করপোরেট জগতের ব্যস্ততার মধ্যেও মোহাম্মদ ওমর ফারুক বিশ্বাস করেন, একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো শিক্ষা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি যুক্ত হন জেদ্দার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের (ইংলিশ সেকশন) সঙ্গে। পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির অভূতপূর্ব সংকটের সময়ে তিনি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিষদের নেতৃত্বে থেকে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় সম্পূর্ণ অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা চালু হয়, যা মহামারির মাঝেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখে। শিক্ষকদের কারিগরি সহায়তা, অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও তিনি সফলভাবে সমন্বয় করেন।

তার নেতৃত্বের আরেকটি ঐতিহাসিক অর্জন হলো সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির বিশেষ অনুমোদন অর্জন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কমিউনিটি স্কুলগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ ছিল না। তার দূরদর্শী প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে এই নীতিতে পরিবর্তন আসে এবং স্কুলটিতে ৪০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর ভর্তির স্থায়ী আইনি সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি, পরিধি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

Mohammad Omar Faruk 3

প্রবাসী সমাজকে এক সুতোয় গাঁথার প্রচেষ্টা

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মোহাম্মদ ওমর ফারুক সৌদি আরবস্থ বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তার নেতৃত্বে সমিতি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অসুস্থ প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানো, সংকটে থাকা পরিবারকে সহায়তা করা এবং নতুন আগতদের দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তিনি প্রবাসেও শিকড়ের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি

মোহাম্মদ ওমর ফারুকের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সবচেয়ে মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। গত প্রায় তিন দশকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, পেশাগত নেটওয়ার্ক এবং সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির সৌদি আরবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। একই সঙ্গে শতাধিক পেশাজীবীকে পদোন্নতি ও উন্নত ক্যারিয়ার গঠনে মেন্টর হিসেবে সহায়তা করেছেন।

এগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। তিনি বিশ্বাস করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কোনো দান নয়; বরং এটি মানুষের যোগ্যতাকে সঠিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার একটি সামাজিক দায়িত্ব।

Mohammad Omar Faruk 4

শেষ কথা

মোহাম্মদ ওমর ফারুকের জীবনপথের বিভিন্ন অধ্যায় মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তিনি নেতৃত্বকে কখনো পদবি হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন দায়িত্ব হিসেবে। সততা, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং অবিরাম শেখার মানসিকতাই তাঁর পথচলার মূল চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশ থেকে একজন তরুণ পেশাজীবী হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিন দশক পর আজ তিনি প্রবাসে একজন দক্ষ নির্বাহী, শিক্ষানুরাগী, সফল সংগঠক এবং মানবিক সহযাত্রীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের সন্তানেরা যে তাদের কর্ম, চরিত্র ও মানবিকতায় দেশের গৌরব বহন করতে পারেন—মোহাম্মদ ওমর ফারুকের জীবন ও অবদান তারই এক অনুপ্রেরণাময় উদাহরণ।

আরও দেখুন

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

২ ঘণ্টা আগে

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

৩ ঘণ্টা আগে

ব্রাজিলিয়ানদের সাথে ব্রাজিলের খেলা

ব্রাজিলিয়ানদের সাথে ব্রাজিলের খেলা

এক চিপায় রোনালদো বসে বসে খেলা দেখছিলেন। বিগ ফ্যান! বিশ্বাসই করতে পারছি না এই লোকটাই ব্রাজিলকে ২০০২ বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল।

৩ ঘণ্টা আগে

যেখানে বাতাসে মাটির গন্ধ, জলে শান্তির ছোঁয়া

যেখানে বাতাসে মাটির গন্ধ, জলে শান্তির ছোঁয়া

চর সিঙ্গুইর গ্রামে পৌঁছে নামের সঙ্গে গ্রামের পরিবেশের এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। যে বাড়িতে আমরা পৌঁছালাম, তার ঠিক পেছনেই বিশাল জলাভূমি। কচুরিপানায় ভরা সেই জলরাশি দেখতে যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। কয়েকজন কিশোর জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তাদের হাসি আর চিৎকারে চারপাশ মুখরিত।

৭ দিন আগে