
নাজমীন মর্তুজা

বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র অঙ্গনকে দেখলে কখনো কখনো মনে হয়, এখানে মেধার চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি। শিল্প, সাহিত্য, অভিনয় দক্ষতা কিংবা সৃজনশীলতা নয় বরং কার চারপাশে কত বড় প্রচারণার বলয় তৈরি করা যায়, সেটাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
অনেক পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী এবং তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মী এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে প্রশ্ন করার চেয়ে প্রশংসা করা নিরাপদ, সমালোচনার চেয়ে তোষামোদ লাভজনক। ফলে শিল্পের মান উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিপূজা বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
গান সহজ করো, সংলাপ সহজ করো, গল্প সহজ করো, যেন দর্শকের চিন্তা করার কোনো প্রয়োজনই নেই। শিল্পকে এমনভাবে সরলীকরণ করা হচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে তার গভীরতা, সৌন্দর্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ প্রকৃত শিল্প তৈরি করতে শ্রম লাগে, অধ্যবসায় লাগে, ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু বাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে দ্রুত লাভই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কোনো শিল্পকর্ম নয়, বরং শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় সংবাদ। সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা হয় যেন এগুলোই সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু।
সাকিব খান, অপু বিশ্বাস এবং শবনম বুবলীকে ঘিরে বছরের পর বছর যে আলোচনা, বিতর্ক এবং কনটেন্ট নির্মাণ হয়েছে, তা অনেকের কাছে চলচ্চিত্রের চেয়ে বড় বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর পেছনে যে বাস্তব মানুষ আছে, তাদের অনুভূতি, কষ্ট, সম্পর্কের জটিলতা সেগুলো প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। যখন একজন মানুষকে শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একটি অবিরাম কনটেন্টের উৎস হিসেবে দেখা হয়, তখন মানবিকতা হারিয়ে যায়। একজন নারী, একজন পুরুষ, একটি পরিবার সবাই তখন ভিউ, রিচ আর আলোচনার উপকরণে পরিণত হয়।
সমস্যা আসলে কোনো একক ব্যক্তি নয়। সমস্যা হলো এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে শিল্পের চেয়ে প্রচারণা বড়, সৃষ্টির চেয়ে গসিপ বড়, আর মানবিকতার চেয়ে বাজার বড় হয়ে উঠেছে। শিল্প যদি শুধু ব্যক্তিপূজা আর চটকদার প্রচারণার মধ্যে আটকে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংস্কৃতিক পরিবেশ, শুধু একজন নায়ক বা একজন নায়িকা নয়। হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ওঠা আজকাল অনেক তথাকথিত তারকাকে দেখলে মনে হয়, যেন একটি ফুলানো বেলুন আকারে আছে, আওয়াজ আছে, প্রচার আছে, কিন্তু ভেতরে তেমন কোনো ওজন নেই। না জ্ঞানচর্চা, না ব্যক্তিত্বের গভীরতা, না মানবিক সংবেদনশীলতা, না শিল্পীসুলভ পরিশীলন। সবকিছু যেন সাজানো প্যাকেটের মতো মোড়কটাই মূল পণ্য, ভেতরের বিষয়বস্তু নয়।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, মৌলিক কিছু সৃষ্টি করার বদলে অনেকেই পাশের দেশের বিনোদন জগতকে নকল করতেই ব্যস্ত। অথচ নকল করে পোশাক, সাজসজ্জা বা ভঙ্গিমা নেওয়া যায়, ব্যক্তিত্ব নেওয়া যায় না। প্রকৃত শিল্পীর শক্তি তার পোশাকে নয়, তার চিন্তায় তার প্রচারণায় নয়, তার কর্মে। শিল্প যখন কেবল বাজারের পণ্য হয়ে যায়, তখন শিল্পীর চেয়ে তার গসিপ বড় হয়ে ওঠে। আর তখন সংস্কৃতির চেয়ে চটকদার প্রচারণাই বেশি মূল্য পায়।
বিচার আহমেদ খান হিরকের একটা গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম হলো ‘বিচার’। ইঁদুর ময়ূরের বিচার বসেছে। বিচারক হাতী। হাতীর বন্ধু আবার ইঁদুর। উকিল কাঠবিড়ালি বলল, জমি থেকে ধান চুরির ব্যাপারে ময়ূর কিছুই জানে না। আকাশে মেঘ আসার আশায় ময়ূর তখন নাচছিল। চুরিটা ন্যাংটিই করেছে। হাতী বলল, মেঘ আসায় ময়ূর নাচছিল। তাতে কিন্তু বৃষ্টি হতে পারত। বৃষ্টি হলে বন্যা হতো, বন্যা হলে জমিতে পানি ঢুকত, পানি ঢুকলে ধানগুলো নষ্ট হতো। তাই ইঁদুর ধান চুরি করে ধানগুলোকে রক্ষা করেছে। ইঁদুর বেকসুর খালাস। আর ময়ূর যেন নাচতে না পারে, এ জন্য মেঘের আসার ওপর জারি হলো নিষেধাজ্ঞা। ময়ূর বলল, মেঘ না এলে বৃষ্টি না হলে দুর্ভিক্ষ হবে। হাতী বলল, তখন ইঁদুরের চুরি তো আমাদের কাজে লাগবে।
এই যে গল্পটা, এই গল্পটা ইঁদুর, ময়ূর, হাতী আর বেড়ালের সেই গল্পটি আসলে চুরির গল্প নয় এটি ক্ষমতা, পক্ষপাত আর সুবিধাবাদী বিচারের গল্প। সেখানে অপরাধ কে করেছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কে বিচারকের বন্ধু। যখন বিচারক সত্যের বদলে সুবিধাকে রক্ষা করতে শুরু করে, তখন চোর হয়ে যায় রক্ষক, আর নির্দোষ হয়ে যায় অভিযুক্ত। যুক্তি আর ন্যায়বোধকে এমনভাবে উল্টে দেওয়া হয় যে, অন্যায়ই একসময় নিয়মে পরিণত হয়।
আমাদের বিনোদন জগতের কিছু আলোচিত ঘটনাকে ঘিরেও অনেক মানুষের এমন অনুভূতি জন্মায়। কোনো তারকার জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা বা বাজারমূল্য এত বড় হয়ে ওঠে যে তার কাজের সমালোচনার চেয়ে তাকে রক্ষা করাই যেন বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তখন শিল্পের বিচার হয় না, তারকার বিচার হয় না, বিচার হয় শুধু তার জনপ্রিয়তার সাকিব খানকে ঘিরে যে, দীর্ঘদিনের বিতর্ক, সম্পর্কের আলোচনা এবং জনমাধ্যমের কৌতূহল দেখা গেছে, তা নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকতেই পারে।
কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে এত বড় করে তোলা উচিত নয় যে, তাকে প্রশ্ন করাটাই অপরাধ হয়ে যায়। একটি সুস্থ সংস্কৃতিতে নায়ক থাকবেন, কিন্তু নায়কপূজা থাকবে না। শিল্পী সম্মান পাবেন, কিন্তু সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবেন না। কারণ যেখানে মানুষকে কিংবদন্তি বানাতে গিয়ে জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, সেখানে হাতীর আদালতের মতোই একদিন চোর বেকসুর খালাস পায়, আর মেঘের ওপর জারি হয় নিষেধাজ্ঞা। সেই সমাজে বিচার বেঁচে থাকে না বেঁচে থাকে শুধু ক্ষমতার সুবিধাজনক গল্প।
শিল্পকলায় সন্ত্রাস ও সংহতির বাস্তব পর্যবেক্ষণ সমাজে ভালো মন্দ, শান্তি-অশান্তি, সৌন্দর্য-হিংসা একসাথে চলছে, আর সেটাই শিল্পেও প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো ভারসাম্য আর দৃষ্টিভঙ্গি।
আগে সিনেমা বা নাটকে যে পারিবারিক গল্প, গ্রামীণ জীবন, মানবিক সম্পর্ক বেশি আসত, তার একটা কারণ ছিল দর্শকের জীবনধারা এবং গল্প বলার ধীর গতি। মানুষ তখন গল্পের ভেতরে বসে ভাবত, অনুভব করত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে তিনটা বড় কারণে। প্রথমটা হলো সামাজিক চাপ আর বাস্তবতা। সমাজে সংঘাত, বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব বেড়েছে বা অন্তত দৃশ্যমান হয়েছে বেশি। শিল্প সেটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে গল্পগুলোও বেশি তীব্র, বেশি উত্তেজনামূলক হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয়টা হলো বাজার। এখন যেটা দ্রুত মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সেটাই বেশি তৈরি হচ্ছে। তাই সহিংসতা, থ্রিল, বিতর্ক এগুলো সহজে দর্শক টানে। শান্ত, ধীর, পারিবারিক গল্প তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
তৃতীয়টা হলো দর্শকের রুচির পরিবর্তন। মানুষ এখন একসাথে অনেক কনটেন্ট দেখে, কিন্তু গভীরভাবে কম দেখে। ফলে নির্মাতারা ধরে নেয়, দ্রুত ইমপ্যাক্ট না দিলে গল্প টিকবে না।

তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাজে একই সাথে হিংসা আর সৌন্দর্য দুটোই আছে। শিল্পের কাজ হওয়া উচিত এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য দেখানো। শুধু অন্ধকার না, আবার শুধু আদর্শও না দুটো মিলেই সত্য। সাকিব খান, অপু বিশ্বাস বা শবনম বুবলীর মতো পরিচিত মুখদের কেন্দ্র করে যে মিডিয়া সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটাও একটা বড় লক্ষণ। গল্পের জায়গা থেকে অনেক সময় ব্যক্তিজীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে দর্শকের কাছে। তাই ‘দৈত্যকলা’ যেটা আসলে সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্বটাই শিল্পে ঢুকে পড়া। সমস্যা এটা না যে শিল্প বদলাচ্ছে, সমস্যা তখন হয় যখন শুধু অস্থির দিকটাই বড় হয়ে যায়, আর মানবিক, শান্ত, চিন্তাশীল দিকটা ছোট হয়ে পড়ে।
এই পরিবর্তন স্থায়ী নাও হতে পারে। শিল্প সবসময় দোল খায়। একসময় আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে গল্পের গভীরতা, সম্পর্কের নরম দিক, মানুষের ভেতরের জীবন। শিল্পের দুর্ভিক্ষ অবক্ষয় এটা আসলে পরিবর্তনের একটা অগোছালো পর্যায়। সমাজ যখন দ্রুত বদলায়, তখন কয়েকটা জিনিস একসাথে ঘটে। পুরনো রুচি, গল্প আর মূল্যবোধ ভেঙে যায়। নতুন কিছু তৈরি হয়, কিন্তু সেটা শুরুতে পরিপক্ব হয় না। এই মাঝের সময়টাকেই অনেক সময় অবক্ষয়ের মতো লাগে।
আমাদের রুচির সমন্বয় এখন এআই হাংরি জেনারেশনের সাথে তারা আসলে একেবারে আলাদা এক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে ডিজিটাল চাপ, দ্রুত তথ্য, কম মনোযোগ, আর অসংখ্য কণ্ঠস্বরের ভিড়ে। তাদের চিন্তা দ্রুত, কিন্তু গভীরতা অনেক সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এটা রক্ত বা স্বভাবের সমস্যা না, এটা পরিবেশের ফল।
ভাষা বা শিল্প ভাঙে মানেই ধ্বংস হয় না। অনেক সময় ভাঙার ভেতর দিয়েই নতুন ভাষা তৈরি হয়। সমস্যা তখনই হয়, যখন ভাঙার পরে কোনো মানদণ্ড, কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না।
শিল্পের ক্ষেত্রে একটা সত্য কথা আছে। শিল্প কখনো এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে না। এটা দোল খায় একসময় আদর্শিক, একসময় বিশৃঙ্খল, আবার একসময় পরিণত। আমরা এখন যেটা দেখছি সেটা হয়তো সেই বিশৃঙ্খলার সময়। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এমন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু ইতিহাস বলে, এমন সময়গুলো চিরস্থায়ী হয় না। প্রতিক্রিয়া আসে। ভালো গল্প, ভালো লেখা, ভালো নির্মাণ আবার জায়গা করে নেয়। তবে সেটা ধীরে হয়, হঠাৎ না।
সেই আসায় বাঁধি বুক
আবার আসুক সেই যুগ।
নাজমীন মর্তুজা: অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া

বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্র অঙ্গনকে দেখলে কখনো কখনো মনে হয়, এখানে মেধার চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি। শিল্প, সাহিত্য, অভিনয় দক্ষতা কিংবা সৃজনশীলতা নয় বরং কার চারপাশে কত বড় প্রচারণার বলয় তৈরি করা যায়, সেটাই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে।
অনেক পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পী এবং তথাকথিত সাংস্কৃতিক কর্মী এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে প্রশ্ন করার চেয়ে প্রশংসা করা নিরাপদ, সমালোচনার চেয়ে তোষামোদ লাভজনক। ফলে শিল্পের মান উন্নয়নের চেয়ে ব্যক্তিপূজা বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
গান সহজ করো, সংলাপ সহজ করো, গল্প সহজ করো, যেন দর্শকের চিন্তা করার কোনো প্রয়োজনই নেই। শিল্পকে এমনভাবে সরলীকরণ করা হচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে তার গভীরতা, সৌন্দর্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ প্রকৃত শিল্প তৈরি করতে শ্রম লাগে, অধ্যবসায় লাগে, ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু বাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে দ্রুত লাভই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কোনো শিল্পকর্ম নয়, বরং শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনই হয়ে উঠছে সবচেয়ে বড় সংবাদ। সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা হয় যেন এগুলোই সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু।
সাকিব খান, অপু বিশ্বাস এবং শবনম বুবলীকে ঘিরে বছরের পর বছর যে আলোচনা, বিতর্ক এবং কনটেন্ট নির্মাণ হয়েছে, তা অনেকের কাছে চলচ্চিত্রের চেয়ে বড় বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলোর পেছনে যে বাস্তব মানুষ আছে, তাদের অনুভূতি, কষ্ট, সম্পর্কের জটিলতা সেগুলো প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। যখন একজন মানুষকে শিল্পী হিসেবে নয়, বরং একটি অবিরাম কনটেন্টের উৎস হিসেবে দেখা হয়, তখন মানবিকতা হারিয়ে যায়। একজন নারী, একজন পুরুষ, একটি পরিবার সবাই তখন ভিউ, রিচ আর আলোচনার উপকরণে পরিণত হয়।
সমস্যা আসলে কোনো একক ব্যক্তি নয়। সমস্যা হলো এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে শিল্পের চেয়ে প্রচারণা বড়, সৃষ্টির চেয়ে গসিপ বড়, আর মানবিকতার চেয়ে বাজার বড় হয়ে উঠেছে। শিল্প যদি শুধু ব্যক্তিপূজা আর চটকদার প্রচারণার মধ্যে আটকে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংস্কৃতিক পরিবেশ, শুধু একজন নায়ক বা একজন নায়িকা নয়। হঠাৎ ফুলে ফেঁপে ওঠা আজকাল অনেক তথাকথিত তারকাকে দেখলে মনে হয়, যেন একটি ফুলানো বেলুন আকারে আছে, আওয়াজ আছে, প্রচার আছে, কিন্তু ভেতরে তেমন কোনো ওজন নেই। না জ্ঞানচর্চা, না ব্যক্তিত্বের গভীরতা, না মানবিক সংবেদনশীলতা, না শিল্পীসুলভ পরিশীলন। সবকিছু যেন সাজানো প্যাকেটের মতো মোড়কটাই মূল পণ্য, ভেতরের বিষয়বস্তু নয়।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, মৌলিক কিছু সৃষ্টি করার বদলে অনেকেই পাশের দেশের বিনোদন জগতকে নকল করতেই ব্যস্ত। অথচ নকল করে পোশাক, সাজসজ্জা বা ভঙ্গিমা নেওয়া যায়, ব্যক্তিত্ব নেওয়া যায় না। প্রকৃত শিল্পীর শক্তি তার পোশাকে নয়, তার চিন্তায় তার প্রচারণায় নয়, তার কর্মে। শিল্প যখন কেবল বাজারের পণ্য হয়ে যায়, তখন শিল্পীর চেয়ে তার গসিপ বড় হয়ে ওঠে। আর তখন সংস্কৃতির চেয়ে চটকদার প্রচারণাই বেশি মূল্য পায়।
বিচার আহমেদ খান হিরকের একটা গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির নাম হলো ‘বিচার’। ইঁদুর ময়ূরের বিচার বসেছে। বিচারক হাতী। হাতীর বন্ধু আবার ইঁদুর। উকিল কাঠবিড়ালি বলল, জমি থেকে ধান চুরির ব্যাপারে ময়ূর কিছুই জানে না। আকাশে মেঘ আসার আশায় ময়ূর তখন নাচছিল। চুরিটা ন্যাংটিই করেছে। হাতী বলল, মেঘ আসায় ময়ূর নাচছিল। তাতে কিন্তু বৃষ্টি হতে পারত। বৃষ্টি হলে বন্যা হতো, বন্যা হলে জমিতে পানি ঢুকত, পানি ঢুকলে ধানগুলো নষ্ট হতো। তাই ইঁদুর ধান চুরি করে ধানগুলোকে রক্ষা করেছে। ইঁদুর বেকসুর খালাস। আর ময়ূর যেন নাচতে না পারে, এ জন্য মেঘের আসার ওপর জারি হলো নিষেধাজ্ঞা। ময়ূর বলল, মেঘ না এলে বৃষ্টি না হলে দুর্ভিক্ষ হবে। হাতী বলল, তখন ইঁদুরের চুরি তো আমাদের কাজে লাগবে।
এই যে গল্পটা, এই গল্পটা ইঁদুর, ময়ূর, হাতী আর বেড়ালের সেই গল্পটি আসলে চুরির গল্প নয় এটি ক্ষমতা, পক্ষপাত আর সুবিধাবাদী বিচারের গল্প। সেখানে অপরাধ কে করেছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কে বিচারকের বন্ধু। যখন বিচারক সত্যের বদলে সুবিধাকে রক্ষা করতে শুরু করে, তখন চোর হয়ে যায় রক্ষক, আর নির্দোষ হয়ে যায় অভিযুক্ত। যুক্তি আর ন্যায়বোধকে এমনভাবে উল্টে দেওয়া হয় যে, অন্যায়ই একসময় নিয়মে পরিণত হয়।
আমাদের বিনোদন জগতের কিছু আলোচিত ঘটনাকে ঘিরেও অনেক মানুষের এমন অনুভূতি জন্মায়। কোনো তারকার জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা বা বাজারমূল্য এত বড় হয়ে ওঠে যে তার কাজের সমালোচনার চেয়ে তাকে রক্ষা করাই যেন বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তখন শিল্পের বিচার হয় না, তারকার বিচার হয় না, বিচার হয় শুধু তার জনপ্রিয়তার সাকিব খানকে ঘিরে যে, দীর্ঘদিনের বিতর্ক, সম্পর্কের আলোচনা এবং জনমাধ্যমের কৌতূহল দেখা গেছে, তা নিয়ে মানুষের মতভেদ থাকতেই পারে।
কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে এত বড় করে তোলা উচিত নয় যে, তাকে প্রশ্ন করাটাই অপরাধ হয়ে যায়। একটি সুস্থ সংস্কৃতিতে নায়ক থাকবেন, কিন্তু নায়কপূজা থাকবে না। শিল্পী সম্মান পাবেন, কিন্তু সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবেন না। কারণ যেখানে মানুষকে কিংবদন্তি বানাতে গিয়ে জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়, সেখানে হাতীর আদালতের মতোই একদিন চোর বেকসুর খালাস পায়, আর মেঘের ওপর জারি হয় নিষেধাজ্ঞা। সেই সমাজে বিচার বেঁচে থাকে না বেঁচে থাকে শুধু ক্ষমতার সুবিধাজনক গল্প।
শিল্পকলায় সন্ত্রাস ও সংহতির বাস্তব পর্যবেক্ষণ সমাজে ভালো মন্দ, শান্তি-অশান্তি, সৌন্দর্য-হিংসা একসাথে চলছে, আর সেটাই শিল্পেও প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা হলো ভারসাম্য আর দৃষ্টিভঙ্গি।
আগে সিনেমা বা নাটকে যে পারিবারিক গল্প, গ্রামীণ জীবন, মানবিক সম্পর্ক বেশি আসত, তার একটা কারণ ছিল দর্শকের জীবনধারা এবং গল্প বলার ধীর গতি। মানুষ তখন গল্পের ভেতরে বসে ভাবত, অনুভব করত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে তিনটা বড় কারণে। প্রথমটা হলো সামাজিক চাপ আর বাস্তবতা। সমাজে সংঘাত, বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এসব বেড়েছে বা অন্তত দৃশ্যমান হয়েছে বেশি। শিল্প সেটাকে এড়িয়ে যেতে পারে না। ফলে গল্পগুলোও বেশি তীব্র, বেশি উত্তেজনামূলক হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয়টা হলো বাজার। এখন যেটা দ্রুত মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সেটাই বেশি তৈরি হচ্ছে। তাই সহিংসতা, থ্রিল, বিতর্ক এগুলো সহজে দর্শক টানে। শান্ত, ধীর, পারিবারিক গল্প তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
তৃতীয়টা হলো দর্শকের রুচির পরিবর্তন। মানুষ এখন একসাথে অনেক কনটেন্ট দেখে, কিন্তু গভীরভাবে কম দেখে। ফলে নির্মাতারা ধরে নেয়, দ্রুত ইমপ্যাক্ট না দিলে গল্প টিকবে না।

তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাজে একই সাথে হিংসা আর সৌন্দর্য দুটোই আছে। শিল্পের কাজ হওয়া উচিত এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য দেখানো। শুধু অন্ধকার না, আবার শুধু আদর্শও না দুটো মিলেই সত্য। সাকিব খান, অপু বিশ্বাস বা শবনম বুবলীর মতো পরিচিত মুখদের কেন্দ্র করে যে মিডিয়া সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সেটাও একটা বড় লক্ষণ। গল্পের জায়গা থেকে অনেক সময় ব্যক্তিজীবন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে দর্শকের কাছে। তাই ‘দৈত্যকলা’ যেটা আসলে সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্বটাই শিল্পে ঢুকে পড়া। সমস্যা এটা না যে শিল্প বদলাচ্ছে, সমস্যা তখন হয় যখন শুধু অস্থির দিকটাই বড় হয়ে যায়, আর মানবিক, শান্ত, চিন্তাশীল দিকটা ছোট হয়ে পড়ে।
এই পরিবর্তন স্থায়ী নাও হতে পারে। শিল্প সবসময় দোল খায়। একসময় আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে গল্পের গভীরতা, সম্পর্কের নরম দিক, মানুষের ভেতরের জীবন। শিল্পের দুর্ভিক্ষ অবক্ষয় এটা আসলে পরিবর্তনের একটা অগোছালো পর্যায়। সমাজ যখন দ্রুত বদলায়, তখন কয়েকটা জিনিস একসাথে ঘটে। পুরনো রুচি, গল্প আর মূল্যবোধ ভেঙে যায়। নতুন কিছু তৈরি হয়, কিন্তু সেটা শুরুতে পরিপক্ব হয় না। এই মাঝের সময়টাকেই অনেক সময় অবক্ষয়ের মতো লাগে।
আমাদের রুচির সমন্বয় এখন এআই হাংরি জেনারেশনের সাথে তারা আসলে একেবারে আলাদা এক বাস্তবতায় বড় হচ্ছে ডিজিটাল চাপ, দ্রুত তথ্য, কম মনোযোগ, আর অসংখ্য কণ্ঠস্বরের ভিড়ে। তাদের চিন্তা দ্রুত, কিন্তু গভীরতা অনেক সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এটা রক্ত বা স্বভাবের সমস্যা না, এটা পরিবেশের ফল।
ভাষা বা শিল্প ভাঙে মানেই ধ্বংস হয় না। অনেক সময় ভাঙার ভেতর দিয়েই নতুন ভাষা তৈরি হয়। সমস্যা তখনই হয়, যখন ভাঙার পরে কোনো মানদণ্ড, কোনো দায়িত্ববোধ থাকে না।
শিল্পের ক্ষেত্রে একটা সত্য কথা আছে। শিল্প কখনো এক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে না। এটা দোল খায় একসময় আদর্শিক, একসময় বিশৃঙ্খল, আবার একসময় পরিণত। আমরা এখন যেটা দেখছি সেটা হয়তো সেই বিশৃঙ্খলার সময়। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এমন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক, কিন্তু ইতিহাস বলে, এমন সময়গুলো চিরস্থায়ী হয় না। প্রতিক্রিয়া আসে। ভালো গল্প, ভালো লেখা, ভালো নির্মাণ আবার জায়গা করে নেয়। তবে সেটা ধীরে হয়, হঠাৎ না।
সেই আসায় বাঁধি বুক
আবার আসুক সেই যুগ।
নাজমীন মর্তুজা: অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া
অমৃতের সন্ধানে সিম সিম সিনেমা বলে কালো দরজা খুলে গেলে আমরা পর্দায় যা দেখি …।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বর্বরতাই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাই প্রশ্ন হলো আমরা কোন পাশে গিয়ে দাঁড়াব? উত্তরাধিকারের পক্ষে, নাকি ক্রমবিবর্তনের পক্ষে?
আজ আমরা সন্তানদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, শিক্ষক বা বড় কর্মকর্তা বানানোর জন্য সর্বস্ব ব্যয় করছি। ভালো স্কুল, কোচিং, বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুর পেছনে ছুটছি। কিন্তু আমরা কি সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি?
কষ্টটা নানা ধরনের। অন্য কষ্ট চাপিয়ে সবচেয়ে বড় এক কষ্টের নাম—পরিবার-পরিজন ছাড়া প্রবাসে ঈদ উদ্যাপন।