logo
মতামত

অধিকারীর অনধিকার চর্চা আর মমতার নির্মম পরাজয়

সৈয়দ ইজাজ আহসান৬ ঘণ্টা আগে
Copied!
অধিকারীর অনধিকার চর্চা আর মমতার নির্মম পরাজয়
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সদ্য সমাপ্ত হলো পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভা নির্বাচন। বিজেপির নেতৃত্বদানকারী শুভেন্দু অধিকারী ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন। এতে হিন্দুত্ববাদীদের আনন্দের সীমা নেই। বহুদিনের রাজনৈতিক পরিকল্পনা, কৌশল ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এই বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে।

মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেই তিনি সংখ্যালঘু, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুরু থেকেই মুসলিমদের প্রতি তার বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে। বিজেপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে মুসলিমবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচিত। এই বিভাজনমূলক রাজনীতি একদিকে কট্টর হিন্দু ভোটকে সুসংহত করে, অন্যদিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালায়।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত একটি দেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। মুসলিমবিদ্বেষকে রাজনৈতিক ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করে একদিকে ভোটব্যাংক শক্তিশালী করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে, বিশেষত মুসলিমদের, ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি তাদের ‘পুশব্যাক’-এর হুমকি দিয়ে বাংলাদেশকে চাপের মুখে রাখার কৌশলও দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—এই মানুষগুলোর অপরাধ কী? তারা মুসলিম—এটাই কি তাদের একমাত্র অপরাধ? ভারতের মুসলিমরা নিজেদের ভারতীয় বলেই মনে করে। তারা কখনো নিজেদের বাংলাদেশি বা পাকিস্তানি হিসেবে পরিচয় দেয় না। ভারতীয় চলচ্চিত্র, সাহিত্য, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাজমহল, দিল্লির লালকেল্লা, টিপু সুলতানের প্রাসাদ—এসব স্থাপত্য কেবল মুসলিম ঐতিহ্য নয়, ভারতের জাতীয় গৌরব ও পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও অসংখ্য মুসলিম আত্মত্যাগ করেছেন। মুসলিমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা অর্জন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারত। স্বাধীনতার আগে মুসলিমদের একাংশের মধ্যে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে, অখণ্ড ভারতে তারা সংখ্যাগুরু ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের অধীনে নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লাখো মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়। দুই রাষ্ট্রের সীমারেখা নিয়েও নানা বিতর্ক ছিল। মুসলিম অধ্যুষিত অনেক অঞ্চল ভারতের অংশ হয়ে যায়—যেমন কাশ্মীর, হায়দরাবাদ, মুর্শিদাবাদ, আসাম ও মেঘালয়ের কিছু এলাকা। এসব অঞ্চলের মুসলিমরা যুগ যুগ ধরে সেখানে বসবাস করলেও আজ তারা নানা বৈষম্য ও নিপীড়নের অভিযোগ তুলছে।

ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম পরিচয় প্রকাশ করতেও অনেকে ভয় পান—এমন অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়টি গভীর ও বিস্তৃত; সংক্ষেপে সব আলোচনা সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক এর রাজনৈতিক পরিণতির প্রসঙ্গে। ভারতের মণিপুর রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। সেখানেও বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। তার সরকারের আচরণ মেইতেই ও কুকি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত বাড়িয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন। ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাও জোরালো হচ্ছে।

ইতিহাস বলছে, সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন রাষ্ট্র ভাঙনের পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হয়েছিল, আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল। আজ ভারতের কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও পূর্বাঞ্চলের কিছু রাজ্যে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে বিভোর ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সেই বাস্তবতা উপলব্ধির প্রবণতা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যে রাজনৈতিক আত্মঘাতিতার নামান্তর, তা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের উদাহরণও প্রাসঙ্গিক। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। সেখানে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে মূলত তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে। অথচ বাংলাদেশে এখনো মগসহ বিভিন্ন মিয়ানমারীয় জাতিগোষ্ঠী বসবাস করছে। এমনকি ভারত থেকে আসা বহু মুসলিম ও হিন্দুও বাংলাদেশে নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাস করছে। স্বাধীনতার পর বিপুলসংখ্যক বিহারি বাংলাদেশে আটকা পড়লেও পরবর্তীকালে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এটিই সভ্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক আচরণ।

আজকের আমেরিকান বা অস্ট্রেলিয়ানদের পূর্বপুরুষও বহিরাগত ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতায় এসে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তিনি জানতেন, প্রতিহিংসা নয়—সহাবস্থানই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। এখানেই ম্যান্ডেলার সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের মৌলিক পার্থক্য।

যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের শিকল পরিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে—এ নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে ক্ষোভ দেখা গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, ভারতে অবস্থানরত বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাকর্মীদের প্রতি আচরণ কেন ভিন্ন হবে? মুসলিমদের ক্ষেত্রেই কেন কঠোরতা বেশি দেখা যায়?

অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের কারণ নিয়েও বিশ্লেষণ চলছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে দৃশ্যমান শিল্পায়ন বা বেকারত্ব সমস্যার কার্যকর সমাধান তিনি দেখাতে পারেননি—এমন অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাদামাটা জীবনযাপন করেন, তার দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, বিশেষ করে আর জি কর মেডিকেল কলেজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনমনে ক্ষোভ ও অনাস্থা তৈরি হয়, যা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। নদীর পানি বন্ধ, ভিসা সীমিতকরণ, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, ‘পুশব্যাক’-এর হুমকি—এসব কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল বাংলাদেশকে আরও বেশি চীন ও পাকিস্তানের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়বে এবং ইসলামপন্থি দলগুলো রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশকে বিকল্প অংশীদারের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে, যার বড় সুবিধাভোগী হতে পারে চীন। চিকিৎসা ভিসা বন্ধ করেও বাংলাদেশকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশের মানুষ চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিকল্প চিকিৎসা গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছে। একইভাবে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের ডেইরি শিল্প ও খামার খাত বরং আরও স্বনির্ভর হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দেখা গেছে, অতিরিক্ত শক্তি প্রদর্শন অনেক সময় উল্টো ফল বয়ে আনে। ইরানকে দুর্বল করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান প্রভাবই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

সবশেষে বলা যায়, বিজেপি ভারতের বেকারত্ব, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র হিন্দুত্ববাদ যদি রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে চলে আসে, তাহলে তা ভারতের অখণ্ডতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনি। তাই সতর্ক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

লেখকের ইমেইল: [email protected], ফেসবুক: Syed Ahsan

আরও দেখুন

অধিকারীর অনধিকার চর্চা আর মমতার নির্মম পরাজয়

অধিকারীর অনধিকার চর্চা আর মমতার নির্মম পরাজয়

ইতিহাস বলছে, সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন রাষ্ট্র ভাঙনের পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হয়েছিল, আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল।

৬ ঘণ্টা আগে

আমিন আবদুল্লাহ, পৃথিবীতে আপনার মতো মানুষ খুব প্রয়োজন

আমিন আবদুল্লাহ, পৃথিবীতে আপনার মতো মানুষ খুব প্রয়োজন

আমিন আবদুল্লাহ নিজের জীবন দিয়ে হত্যাকারীদের প্রতিহত করলেন। নিজের ৮ সন্তানের কথা চিন্তা করেননি তিনি। একজন জাতীয় বীর তিনি। এই ঘটনায় আরও যে দুজন শহীদ হয়েছেন তাদের একজন ২০ বছর ধরে সেবক আর আরেকজন গুলির শব্দ শুনে সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন, তার স্ত্রী ওই স্কুলেরই শিক্ষক।

২ দিন আগে

বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ

বাংলাদেশের ফুটবল, হাইপ্রোফাইল কোচের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের অনিবার্য পথ

একটি দেশের ফুটবলারদের মান তৈরি হয় প্রতিনিয়ত উচ্চমানের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ার মাধ্যমে। যখন একজন খেলোয়াড় বারবার দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলেন, তখন তার ব্যক্তিগত উন্নতি থেমে যায়।

১১ দিন আগে

ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

ডালাস মঞ্চে জ্বিন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

আমাদের সবার প্রয়াস একটিই, আগামী জুন মাসের ২০ ও ২১ তারিখে, ডালাসের চিলড্রেন্স থিয়েটার মঞ্চে, আমরা হুমায়ূন ভক্ত হিসেবে তার ভক্তদের জন্য মিসির আলীর জাদু পরিবেশন করব।

১১ দিন আগে