

ফারহানা আহমেদ লিসা

ঘটনাটার শুরু দুই সপ্তাহ আগে। বিভিন্ন কারণে হাসপাতালে চরম ব্যস্ততা চলছে। এর মাঝে একজন রোগী এলেন, ৪৮ বছর বয়স। সাধারণত ইমার্জেন্সি থেকে হাসপাতলে রোগী ভর্তি হওয়ার দরকার না থাকলে ওরা কল করেন না। সকাল সকাল একজন ডাক্তার কল করলেন। বললেন, ফারহানা রোগীটা একটু দেখবে? চলে যেতে চাইছে বাসায় কিন্তু সব ল্যাব টেস্ট এবনরমাল।
গেলাম দেখতে। গিয়ে দেখি গম্ভীর ভঙ্গীতে রোগী বসা। সাথে কান্না কান্না চেহারার বউ ওর হাত ধরে বসা।
আমি ঢুকতেই রোগীর বউ বলে উঠলেন, একটু দেখ কি হয়েছে ওর। আমাদের বিয়ে হয়েছে এতগুলো বছর, কোনোদিন এত বাজে ঝগড়া করেনি ও আমার সাথে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এজন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছ?
বউ বললেন, হ্যাঁ। হাইস্কুল সুইট হার্ট আমরা, বিয়ের পর থেকে সকালের কফি কোনোদিন নিজে বানিয়ে খাইনি। সব কিছু একসাথে করি। একমাস আগেও কাজের তাড়া থাকাতে কফি না নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। রিয়ার ভিউ মিররে দেখি খালি পায়ে ও দৌড়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে কফি হাতে। আর এই ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ও আমাকে প্রথম বকা দিল, বলল নিজের কফি নিজে বানিয়ে খাও। সব সময় এত অলসতা কেন কর?
আমি হাসব না, হাসব না করেও হেসে ফেললাম। তারপর মাথার সিটি স্ক্যান করতে বলে এক কাপ কফি খেলাম। সিটি স্ক্যান দেখে অবাক হলাম। মনে হলো একটা এবনরমাল গ্রোথ নাকের অনেক গভীরে। সাথে সাথে বায়োপসির জন্য যোগাযোগ করলাম। বায়োপসি করা গেল না, নাকের খুব গভীরে বেকায়দা একটা জায়গায় গ্রোথের জন্য।
আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস্যা নেই।

অনকোলজিস্ট আমার বন্ধু, ভীষণ মেধাবী একজন মানুষ। ওকে ফোন করলাম, একসাথে রিভিউ করলাম সিটি স্ক্যান। তিনি বললেন, ফারহানা ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ একটা ক্যানসার মনে হয় আমরা খুব আর্লি স্টেজে ধরে ফেলেছি। দেখতে আসছি রোগীকে।
সেই রোগী ভর্তি হলেন, পুরো শরীরে স্ক্যান করা হলো জরুরিভিত্তিতে। তারপর কয়েক দিন রেডিয়েশন পেলেন, তারপর কেমোথেরাপি।
ভ্যালেন্টাইনস ডের সকালে রোগীকে দেখতে গেলাম। ঝলমলে আনন্দিত একজন মানুষ বসে আছেন। একটু পর নার্সের সাথে কথা কাটাকাটি করতে করতে মেরি এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখতো ডাক্তার জীবনে এই প্রথম ভালোবাসা দিবসে আমার স্বামীর জন্য ফুল এনেছি, নার্স ফুল রুমের ভেতরে আনতে দেবে না। বলছে, কেমো পেশেন্টকে ফ্রেস ফুল, ফল, সবজি কিচ্ছু দেওয়া যায় না। মেরির কথা শুনে রোগী হাসছেন।
আমি বললাম তুমি তো একে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে চাও তাই না?
মেরি বললেন, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তাহলে ফুল নার্সদের ষ্টেশনে থাকুক।
রোগী বললেন, তাহলে ডাক্তার তোমার বাসায় নিয়ে যাও না?
আমি বললাম, কেন?
মেরি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, নিয়ে যাও বাসায় ডাক্তার। তোমাকে ধন্যবাদ আমার হাবিকে আগের মতো করে ফিরিয়ে দেবার জন্য।
মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর হেসে বললাম আমার বাসায় দুটি বিড়াল ছানা আছে। অনেক ফুল ওদের জন্য টক্সিক।
একগুচ্ছ টিউলিপ ফুল কে যেন দিয়েছিল সেদিন। বাসার পিছনে রাখাতে সেই ফুল গাছ মারা গেছে। আমার বোনের সে কি রাগ শুনে। কেন গাছেরও তো প্রাণ আছে। তুই কি মনে করে গাছ মেরে ফেললি? আমি যতই বোঝাই ব্যাপারটা সেটা না, আমি চেষ্টা করেছি পানি দিয়ে…বোন ততই রাগ হয়। বাবা একই ঝামেলায় দুবার যাব না। আমাদের রমজান আসছে। আমি তোমাদের জন্য মন খুলে দোয়া করব, তুমি সুস্থ হলেই আমার সব কিছু পাওয়া হবে।
ওরা দুজনই খুব হাসছে। রোগীর রুম থেকে বের হয়ে দেখি অপূর্ব কিছু ফুল সাজানো। ভালোবাসার রঙে রাঙ্গানো। ভালোবাসা, যার আর কোনো নাম নেই।
*ফারহানা আহমেদ লিসা: সান ডিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

ঘটনাটার শুরু দুই সপ্তাহ আগে। বিভিন্ন কারণে হাসপাতালে চরম ব্যস্ততা চলছে। এর মাঝে একজন রোগী এলেন, ৪৮ বছর বয়স। সাধারণত ইমার্জেন্সি থেকে হাসপাতলে রোগী ভর্তি হওয়ার দরকার না থাকলে ওরা কল করেন না। সকাল সকাল একজন ডাক্তার কল করলেন। বললেন, ফারহানা রোগীটা একটু দেখবে? চলে যেতে চাইছে বাসায় কিন্তু সব ল্যাব টেস্ট এবনরমাল।
গেলাম দেখতে। গিয়ে দেখি গম্ভীর ভঙ্গীতে রোগী বসা। সাথে কান্না কান্না চেহারার বউ ওর হাত ধরে বসা।
আমি ঢুকতেই রোগীর বউ বলে উঠলেন, একটু দেখ কি হয়েছে ওর। আমাদের বিয়ে হয়েছে এতগুলো বছর, কোনোদিন এত বাজে ঝগড়া করেনি ও আমার সাথে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এজন্য হাসপাতালে নিয়ে এসেছ?
বউ বললেন, হ্যাঁ। হাইস্কুল সুইট হার্ট আমরা, বিয়ের পর থেকে সকালের কফি কোনোদিন নিজে বানিয়ে খাইনি। সব কিছু একসাথে করি। একমাস আগেও কাজের তাড়া থাকাতে কফি না নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। রিয়ার ভিউ মিররে দেখি খালি পায়ে ও দৌড়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে এসেছে কফি হাতে। আর এই ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ও আমাকে প্রথম বকা দিল, বলল নিজের কফি নিজে বানিয়ে খাও। সব সময় এত অলসতা কেন কর?
আমি হাসব না, হাসব না করেও হেসে ফেললাম। তারপর মাথার সিটি স্ক্যান করতে বলে এক কাপ কফি খেলাম। সিটি স্ক্যান দেখে অবাক হলাম। মনে হলো একটা এবনরমাল গ্রোথ নাকের অনেক গভীরে। সাথে সাথে বায়োপসির জন্য যোগাযোগ করলাম। বায়োপসি করা গেল না, নাকের খুব গভীরে বেকায়দা একটা জায়গায় গ্রোথের জন্য।
আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস্যা নেই।

অনকোলজিস্ট আমার বন্ধু, ভীষণ মেধাবী একজন মানুষ। ওকে ফোন করলাম, একসাথে রিভিউ করলাম সিটি স্ক্যান। তিনি বললেন, ফারহানা ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ একটা ক্যানসার মনে হয় আমরা খুব আর্লি স্টেজে ধরে ফেলেছি। দেখতে আসছি রোগীকে।
সেই রোগী ভর্তি হলেন, পুরো শরীরে স্ক্যান করা হলো জরুরিভিত্তিতে। তারপর কয়েক দিন রেডিয়েশন পেলেন, তারপর কেমোথেরাপি।
ভ্যালেন্টাইনস ডের সকালে রোগীকে দেখতে গেলাম। ঝলমলে আনন্দিত একজন মানুষ বসে আছেন। একটু পর নার্সের সাথে কথা কাটাকাটি করতে করতে মেরি এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, দেখতো ডাক্তার জীবনে এই প্রথম ভালোবাসা দিবসে আমার স্বামীর জন্য ফুল এনেছি, নার্স ফুল রুমের ভেতরে আনতে দেবে না। বলছে, কেমো পেশেন্টকে ফ্রেস ফুল, ফল, সবজি কিচ্ছু দেওয়া যায় না। মেরির কথা শুনে রোগী হাসছেন।
আমি বললাম তুমি তো একে সুস্থ করে বাসায় নিয়ে যেতে চাও তাই না?
মেরি বললেন, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তাহলে ফুল নার্সদের ষ্টেশনে থাকুক।
রোগী বললেন, তাহলে ডাক্তার তোমার বাসায় নিয়ে যাও না?
আমি বললাম, কেন?
মেরি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, নিয়ে যাও বাসায় ডাক্তার। তোমাকে ধন্যবাদ আমার হাবিকে আগের মতো করে ফিরিয়ে দেবার জন্য।
মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর হেসে বললাম আমার বাসায় দুটি বিড়াল ছানা আছে। অনেক ফুল ওদের জন্য টক্সিক।
একগুচ্ছ টিউলিপ ফুল কে যেন দিয়েছিল সেদিন। বাসার পিছনে রাখাতে সেই ফুল গাছ মারা গেছে। আমার বোনের সে কি রাগ শুনে। কেন গাছেরও তো প্রাণ আছে। তুই কি মনে করে গাছ মেরে ফেললি? আমি যতই বোঝাই ব্যাপারটা সেটা না, আমি চেষ্টা করেছি পানি দিয়ে…বোন ততই রাগ হয়। বাবা একই ঝামেলায় দুবার যাব না। আমাদের রমজান আসছে। আমি তোমাদের জন্য মন খুলে দোয়া করব, তুমি সুস্থ হলেই আমার সব কিছু পাওয়া হবে।
ওরা দুজনই খুব হাসছে। রোগীর রুম থেকে বের হয়ে দেখি অপূর্ব কিছু ফুল সাজানো। ভালোবাসার রঙে রাঙ্গানো। ভালোবাসা, যার আর কোনো নাম নেই।
*ফারহানা আহমেদ লিসা: সান ডিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস্যা নেই।
তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।
স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।