
শরীফুল আলম

শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এখন বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, অবরোধ ও নানা কর্মসূচি চলছে। কেউ ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছেন, কেউ শরিয়া আইনে বিচার চান, আবার কেউ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের দাবিও তুলছেন।
এই ক্ষোভ, প্রতিবাদ সবই স্বাভাবিক। কারণ, একটি শিশুর ওপর এমন নির্মমতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তবে এই ঘটনাকে আমি খুব সরল কোনো সমীকরণে ফেলতে চাই না। বাংলাদেশে এটাই প্রথম শিশু ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনা নয়। শুধু শিশুরাই নয়, নারীরাও আজ বহু ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
রামিসার ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে এটি ইতিবাচক দিক। কারণ, জনসচেতনতা তৈরি করতে সামাজিক প্রতিবাদের বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেও এ ধরনের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের নিশ্চয়ই অ্যাসিড সন্ত্রাসের কথা মনে আছে। একসময় বাংলাদেশে অ্যাসিড নিক্ষেপ ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলন, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার ফলে এখন এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কেন এখনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ফল দেখাতে পারছে না?
এবার আসি বিচার প্রসঙ্গে।
অনেকেই ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করছেন। আমিও এই অপরাধের সর্বোচ্চ বিচার চাই। কিন্তু একটি রাষ্ট্রে বিচারিক প্রক্রিয়া বলে তো কিছু আছে। তদন্ত হবে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ হবে, ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদালতে উপস্থাপন করা হবে, এরপর বিচারক প্রচলিত আইনের আলোকে রায় দেবেন। তার আগেই যদি আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি তুলি, তাহলে আইনের শাসনের জায়গাটি কোথায় দাঁড়াবে?
সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে আজ সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে আমার প্রশ্ন হলো, যারা ধর্ষণের বিচারে শরিয়া আইন প্রয়োগের দাবি তুলছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন বাংলাদেশ একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে বিচারব্যবস্থা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়? এখানে শরিয়া আইন রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থার ভিত্তি নয়।
আরেকটি বিষয়ও স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ধর্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। অনেকেই হয়তো না জেনেই শরিয়া আইনের কথা বলছেন। অথচ ইসলামী ফিকহে ধর্ষণ ও ‘জিনা’ (সম্মতিসূচক অবৈধ যৌনসম্পর্ক) এক বিষয় নয়। তাদের প্রমাণ পদ্ধতি ও বিচারিক কাঠামোও ভিন্ন।
ইসলামী আইনশাস্ত্রে ধর্ষণ প্রমাণের প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল। ঐতিহাসিকভাবে চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীর প্রসঙ্গ এসেছে মূলত ‘জিনা’ প্রমাণের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফরেনসিক, ডিএনএ, আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার সম্পন্ন হয়। ফলে ধর্মীয় আবেগের জায়গা থেকে নয়, বাস্তব বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনা করেই আমাদের আলোচনা করা উচিত।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ধর্ষণ ও হত্যা একসঙ্গে সংঘটিত হলে সেটি কেবল যৌন অপরাধ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। রামিসার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাই এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। তবে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
আজ আমরা রামিসার জন্য প্রতিবাদ করছি। কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই চলবে না। আমি চাই, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক। একজন রামিসা নয় পৃথিবীর প্রতিটি শিশুই আমাদের সবার দায়িত্ব।
শেষে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি নিজে ভিকটিম পরিবারের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার বিচার তদারকির আশ্বাস দিয়েছেন। সরকার প্রধানের এই মানবিক উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেশবাসী চায় এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রামিসাকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: কলামিস্ট ও কবি, নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র
ইমেইল: [email protected]

শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এখন বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, অবরোধ ও নানা কর্মসূচি চলছে। কেউ ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছেন, কেউ শরিয়া আইনে বিচার চান, আবার কেউ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের দাবিও তুলছেন।
এই ক্ষোভ, প্রতিবাদ সবই স্বাভাবিক। কারণ, একটি শিশুর ওপর এমন নির্মমতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। তবে এই ঘটনাকে আমি খুব সরল কোনো সমীকরণে ফেলতে চাই না। বাংলাদেশে এটাই প্রথম শিশু ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনা নয়। শুধু শিশুরাই নয়, নারীরাও আজ বহু ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীন। এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
রামিসার ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে এটি ইতিবাচক দিক। কারণ, জনসচেতনতা তৈরি করতে সামাজিক প্রতিবাদের বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেও এ ধরনের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের নিশ্চয়ই অ্যাসিড সন্ত্রাসের কথা মনে আছে। একসময় বাংলাদেশে অ্যাসিড নিক্ষেপ ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলন, কঠোর আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার ফলে এখন এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কেন এখনো কার্যকর ও দৃশ্যমান ফল দেখাতে পারছে না?
এবার আসি বিচার প্রসঙ্গে।
অনেকেই ধর্ষকের ফাঁসি দাবি করছেন। আমিও এই অপরাধের সর্বোচ্চ বিচার চাই। কিন্তু একটি রাষ্ট্রে বিচারিক প্রক্রিয়া বলে তো কিছু আছে। তদন্ত হবে, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ হবে, ফরেনসিক রিপোর্ট আসবে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদালতে উপস্থাপন করা হবে, এরপর বিচারক প্রচলিত আইনের আলোকে রায় দেবেন। তার আগেই যদি আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যার দাবি তুলি, তাহলে আইনের শাসনের জায়গাটি কোথায় দাঁড়াবে?
সভ্য রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।
ধর্ষণের বিরুদ্ধে আজ সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে আমার প্রশ্ন হলো, যারা ধর্ষণের বিচারে শরিয়া আইন প্রয়োগের দাবি তুলছেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন বাংলাদেশ একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে বিচারব্যবস্থা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়? এখানে শরিয়া আইন রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থার ভিত্তি নয়।
আরেকটি বিষয়ও স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ধর্ষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। অনেকেই হয়তো না জেনেই শরিয়া আইনের কথা বলছেন। অথচ ইসলামী ফিকহে ধর্ষণ ও ‘জিনা’ (সম্মতিসূচক অবৈধ যৌনসম্পর্ক) এক বিষয় নয়। তাদের প্রমাণ পদ্ধতি ও বিচারিক কাঠামোও ভিন্ন।
ইসলামী আইনশাস্ত্রে ধর্ষণ প্রমাণের প্রশ্নটি অত্যন্ত জটিল। ঐতিহাসিকভাবে চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীর প্রসঙ্গ এসেছে মূলত ‘জিনা’ প্রমাণের ক্ষেত্রে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফরেনসিক, ডিএনএ, আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার সম্পন্ন হয়। ফলে ধর্মীয় আবেগের জায়গা থেকে নয়, বাস্তব বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বিবেচনা করেই আমাদের আলোচনা করা উচিত।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ধর্ষণ ও হত্যা একসঙ্গে সংঘটিত হলে সেটি কেবল যৌন অপরাধ নয়, বরং মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। রামিসার ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে। তাই এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। তবে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
আজ আমরা রামিসার জন্য প্রতিবাদ করছি। কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই চলবে না। আমি চাই, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক। একজন রামিসা নয় পৃথিবীর প্রতিটি শিশুই আমাদের সবার দায়িত্ব।
শেষে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি নিজে ভিকটিম পরিবারের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার বিচার তদারকির আশ্বাস দিয়েছেন। সরকার প্রধানের এই মানবিক উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেশবাসী চায় এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রামিসাকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: কলামিস্ট ও কবি, নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র
ইমেইল: [email protected]
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
রামিসার ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে এটি ইতিবাচক দিক। কারণ, জনসচেতনতা তৈরি করতে সামাজিক প্রতিবাদের বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেও এ ধরনের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ।
আমি চুমুক দিই।/ কফির তেতো স্বাদে হঠাৎ বুঝি,/ সব দেশ মানচিত্রে থাকে না,/ কিছু দেশ থাকে মানুষের অপেক্ষায়,/ কিছু শহর জন্ম নেয়/ একটি স্পর্শহীন হাতের ভেতর।
ইতিহাস বলছে, সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন রাষ্ট্র ভাঙনের পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হয়েছিল, আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
১০ ঘণ্টা আগে