
সহিদুল আলম স্বপন

ইতিহাস কখনো কখনো বৃত্তাকারে ফেরে। ১৯৮০ সালে যখন দক্ষিণ এশিয়া বিভেদ, অবিশ্বাস আর পারস্পরিক সন্দেহের ঘেরাটোপে আটকে ছিল, তখন একজন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন আঞ্চলিক ঐক্যের। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৭টি দেশের নেতাদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন গড়ার আহ্বান জানিয়ে। সেই দূরদর্শী উদ্যোগেরই ফসল ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্ক। আজ চার দশক পরে, যখন সেই সংগঠন আবার মৃতপ্রায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নতুন কোনো জিয়া কি আসবেন? বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারেন?
ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি সম্প্রতি এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বয়ানের মধ্যে আটকে না থেকে বাস্তববাদী আঞ্চলিক কূটনীতির পথে হাঁটা। পাকিস্তানকে 'সম্মান' দিয়ে সার্ককে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার কথায় স্পষ্ট, সমস্যাটি কেবল ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় নয় এটি একটি আঞ্চলিক নেতৃত্বের শূন্যতার সংকটও। আর সেই শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
জিয়াউর রহমানের সার্ক উদ্যোগের শক্তি ছিল তার নিরপেক্ষ অবস্থানে। বাংলাদেশ তখন ভারত বা পাকিস্তান কোনো পক্ষেরই পরিচিত মিত্র ছিল না, বরং উভয়ের সাথে কার্যকর সম্পর্ক রক্ষা করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এই কৌশলগত নিরপেক্ষতাই ছিল সার্কের জন্মের মূল চাবিকাঠি। আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
তবে এই আলোচনাকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বৃহত্তর এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো সার্কের ভবিষ্যতের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। আজকের এশিয়া মূলত দুটি বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ময়দান একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, অন্যদিকে ভারতের নেতৃত্বে পশ্চিমা সমর্থিত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো প্রায়ই দিশাহারা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ প্রতিটি দেশই চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন খেলা খেলছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী সার্ক হতে পারত এই ছোট দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যা বৃহৎ শক্তির চাপ থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিত।
এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হয় কোথায় দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে আছে। আসিয়ান আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। ১০টি দেশের এই জোট ২০২৩ সালে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্মিলিত জিডিপি অর্জন করেছে। তাদের আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ সার্কভুক্ত দেশগুলোর আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের যেকোনো আঞ্চলিক জোটের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই বিশাল ব্যবধানের পেছনে রাজনৈতিক অনিচ্ছা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসই মূল কারণ। আসিয়ানের সাফল্যের রহস্য হলো তারা রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রেখেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়েও দেশগুলো একই টেবিলে বসে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। দক্ষিণ এশিয়া এই শিক্ষাটি এখনো আত্মস্থ করতে পারেনি।
এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই সদস্য। অথচ সার্কের মঞ্চে তারা একত্রিত হতে পারছে না এই দ্বৈততা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অপরিপক্বতার একটি নিদর্শন। এসসিও-তে চীনের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে এই সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন কণ্ঠস্বর হওয়ার বদলে চীনা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের একটি হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি পুনরুজ্জীবিত ও স্বাধীন সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেশি। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া ভারত, নেপাল ও ভুটানের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সিন্ধু নদের পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এই পরিবেশগত সংকটগুলো কোনো একটি দেশের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এখানেই সার্কের অপরিহার্যতা সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলো জলবায়ু আলোচনায় সম্মিলিত অবস্থান নিতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের দরকষাকষির শক্তিও দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
ডিজিটাল এশিয়ার প্রসঙ্গটিও এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভারত ইউপিআই পেমেন্ট সিস্টেমে বিপ্লব এনেছে। বাংলাদেশের বিকাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাকিস্তানের তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। এই ডিজিটাল সম্ভাবনাগুলো যদি একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে একত্রিত করা যেত, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া আসিয়ানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক বিভেদ সেই সম্ভাবনার দরজায় তালা মেরে রেখেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে যে সুযোগ, তা ঐতিহাসিক। তার বাবা জিয়াউর রহমান যখন সার্কের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশ ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্র, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, কূটনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ। আজকের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন, ৫০ বছরে দেশটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তার তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে। তার রেমিট্যান্স প্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ায় ঈর্ষণীয়। এই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমান যদি সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেন, তাহলে তা জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারকে কেবল ধারণ নয়, বরং তা আরও সমৃদ্ধ করবে।
সেই উদ্যোগের কৌশলগত রূপরেখা হতে পারে বহুস্তরীয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ একটি 'সার্ক পুনরুজ্জীবন সংলাপ' আয়োজন করতে পারে, যেখানে সরকারি প্রতিনিধির পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও তরুণ উদ্যোক্তারাও অংশ নেবেন। দ্বিতীয়ত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে বাংলাদেশ একটি 'সুবিধাদাতা' ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। ঠিক যেভাবে নরওয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে সামনে রেখে একটি 'সার্ক গ্রিন ও ডিজিটাল ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক' প্রস্তাব করা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক বিরোধ থেকে মুক্ত একটি কারিগরি সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
বীণা সিক্রি বলেছেন, নতুন প্রজন্ম দৈনন্দিন বাস্তব বিষয় চায়। এই কথাটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের তরুণদের ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য। ঢাকার তরুণ উদ্যোক্তা, করাচির তরুণ প্রযুক্তিবিদ, মুম্বাইয়ের তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা, কাঠমান্ডুর তরুণ পরিবেশকর্মী এরা সবাই একটি সংযুক্ত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখে। রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
ইতিহাস সাক্ষী, বড় পরিবর্তন প্রায়ই ছোট দেশের বড় উদ্যোগ থেকে জন্ম নেয়। জিয়াউর রহমান সেটা একবার প্রমাণ করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া আজ আবার সেই প্রমাণের অপেক্ষায়। তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে কেবল একজন দেশের নেতা নন, একজন আঞ্চলিক দূরদর্শী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার। প্রশ্ন কেবল একটাই সেই সাহস ও দূরদর্শিতা কি তিনি দেখাবেন?
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]

ইতিহাস কখনো কখনো বৃত্তাকারে ফেরে। ১৯৮০ সালে যখন দক্ষিণ এশিয়া বিভেদ, অবিশ্বাস আর পারস্পরিক সন্দেহের ঘেরাটোপে আটকে ছিল, তখন একজন মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন আঞ্চলিক ঐক্যের। বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৭টি দেশের নেতাদের কাছে চিঠি লিখেছিলেন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার সংগঠন গড়ার আহ্বান জানিয়ে। সেই দূরদর্শী উদ্যোগেরই ফসল ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্ক। আজ চার দশক পরে, যখন সেই সংগঠন আবার মৃতপ্রায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নতুন কোনো জিয়া কি আসবেন? বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি সেই ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারেন?
ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি সম্প্রতি এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বয়ানের মধ্যে আটকে না থেকে বাস্তববাদী আঞ্চলিক কূটনীতির পথে হাঁটা। পাকিস্তানকে 'সম্মান' দিয়ে সার্ককে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তার কথায় স্পষ্ট, সমস্যাটি কেবল ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় নয় এটি একটি আঞ্চলিক নেতৃত্বের শূন্যতার সংকটও। আর সেই শূন্যতা পূরণে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
জিয়াউর রহমানের সার্ক উদ্যোগের শক্তি ছিল তার নিরপেক্ষ অবস্থানে। বাংলাদেশ তখন ভারত বা পাকিস্তান কোনো পক্ষেরই পরিচিত মিত্র ছিল না, বরং উভয়ের সাথে কার্যকর সম্পর্ক রক্ষা করে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এই কৌশলগত নিরপেক্ষতাই ছিল সার্কের জন্মের মূল চাবিকাঠি। আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
তবে এই আলোচনাকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বৃহত্তর এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো সার্কের ভবিষ্যতের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। আজকের এশিয়া মূলত দুটি বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ময়দান একদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, অন্যদিকে ভারতের নেতৃত্বে পশ্চিমা সমর্থিত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো প্রায়ই দিশাহারা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ প্রতিটি দেশই চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন খেলা খেলছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী সার্ক হতে পারত এই ছোট দেশগুলোর সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যা বৃহৎ শক্তির চাপ থেকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিত।
এশিয়ার আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হয় কোথায় দক্ষিণ এশিয়া পিছিয়ে আছে। আসিয়ান আজ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। ১০টি দেশের এই জোট ২০২৩ সালে ৩ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্মিলিত জিডিপি অর্জন করেছে। তাদের আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ সার্কভুক্ত দেশগুলোর আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের যেকোনো আঞ্চলিক জোটের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই বিশাল ব্যবধানের পেছনে রাজনৈতিক অনিচ্ছা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসই মূল কারণ। আসিয়ানের সাফল্যের রহস্য হলো তারা রাজনৈতিক বিরোধকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে আলাদা রেখেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়েও দেশগুলো একই টেবিলে বসে বাণিজ্য চুক্তি করেছে। দক্ষিণ এশিয়া এই শিক্ষাটি এখনো আত্মস্থ করতে পারেনি।
এশিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই সদস্য। অথচ সার্কের মঞ্চে তারা একত্রিত হতে পারছে না এই দ্বৈততা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অপরিপক্বতার একটি নিদর্শন। এসসিও-তে চীনের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ফলে এই সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন কণ্ঠস্বর হওয়ার বদলে চীনা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের একটি হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি পুনরুজ্জীবিত ও স্বাধীন সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে অপরিহার্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেশি। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া ভারত, নেপাল ও ভুটানের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। সিন্ধু নদের পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এই পরিবেশগত সংকটগুলো কোনো একটি দেশের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এখানেই সার্কের অপরিহার্যতা সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলো জলবায়ু আলোচনায় সম্মিলিত অবস্থান নিতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের দরকষাকষির শক্তিও দুর্বল থেকে যাচ্ছে।
ডিজিটাল এশিয়ার প্রসঙ্গটিও এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভারত ইউপিআই পেমেন্ট সিস্টেমে বিপ্লব এনেছে। বাংলাদেশের বিকাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাকিস্তানের তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। এই ডিজিটাল সম্ভাবনাগুলো যদি একটি সমন্বিত আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে একত্রিত করা যেত, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া আসিয়ানকেও ছাড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক বিভেদ সেই সম্ভাবনার দরজায় তালা মেরে রেখেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে যে সুযোগ, তা ঐতিহাসিক। তার বাবা জিয়াউর রহমান যখন সার্কের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশ ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্র, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, কূটনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ। আজকের বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন, ৫০ বছরে দেশটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তার তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে। তার রেমিট্যান্স প্রবাহ দক্ষিণ এশিয়ায় ঈর্ষণীয়। এই অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমান যদি সার্ক পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেন, তাহলে তা জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকারকে কেবল ধারণ নয়, বরং তা আরও সমৃদ্ধ করবে।
সেই উদ্যোগের কৌশলগত রূপরেখা হতে পারে বহুস্তরীয়। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ একটি 'সার্ক পুনরুজ্জীবন সংলাপ' আয়োজন করতে পারে, যেখানে সরকারি প্রতিনিধির পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও তরুণ উদ্যোক্তারাও অংশ নেবেন। দ্বিতীয়ত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে বাংলাদেশ একটি 'সুবিধাদাতা' ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। ঠিক যেভাবে নরওয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে সামনে রেখে একটি 'সার্ক গ্রিন ও ডিজিটাল ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক' প্রস্তাব করা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক বিরোধ থেকে মুক্ত একটি কারিগরি সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
বীণা সিক্রি বলেছেন, নতুন প্রজন্ম দৈনন্দিন বাস্তব বিষয় চায়। এই কথাটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের তরুণদের ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য। ঢাকার তরুণ উদ্যোক্তা, করাচির তরুণ প্রযুক্তিবিদ, মুম্বাইয়ের তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতা, কাঠমান্ডুর তরুণ পরিবেশকর্মী এরা সবাই একটি সংযুক্ত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখে। রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
ইতিহাস সাক্ষী, বড় পরিবর্তন প্রায়ই ছোট দেশের বড় উদ্যোগ থেকে জন্ম নেয়। জিয়াউর রহমান সেটা একবার প্রমাণ করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া আজ আবার সেই প্রমাণের অপেক্ষায়। তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে কেবল একজন দেশের নেতা নন, একজন আঞ্চলিক দূরদর্শী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেওয়ার। প্রশ্ন কেবল একটাই সেই সাহস ও দূরদর্শিতা কি তিনি দেখাবেন?
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
রামিসার ঘটনায় মানুষ রাস্তায় নেমেছে এটি ইতিবাচক দিক। কারণ, জনসচেতনতা তৈরি করতে সামাজিক প্রতিবাদের বিকল্প নেই। রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতেও এ ধরনের আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ।
আমি চুমুক দিই।/ কফির তেতো স্বাদে হঠাৎ বুঝি,/ সব দেশ মানচিত্রে থাকে না,/ কিছু দেশ থাকে মানুষের অপেক্ষায়,/ কিছু শহর জন্ম নেয়/ একটি স্পর্শহীন হাতের ভেতর।
ইতিহাস বলছে, সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন রাষ্ট্র ভাঙনের পথ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হয়েছিল, আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
১০ ঘণ্টা আগে