logo
মতামত

ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?

শাহাবুদ্দিন শুভ
শাহাবুদ্দিন শুভ৮ ঘণ্টা আগে
Copied!
ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিতে উঠতে গিয়ে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

ঈদ মানেই আনন্দ, ঘরে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে মিলন। বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এই যাত্রা ঘিরে থাকে আবেগ, ভালোবাসা আর এক ধরনের ব্যাকুলতা। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই প্রতি বছর একটি অদ্ভুত ভয় আমাদের তাড়া করে—এই যাত্রা কি সত্যিই নিরাপদ? নাকি আবারও খবরের শিরোনামে ভেসে উঠবে প্রাণহানির মর্মান্তিক সংখ্যা?

দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা মানুষের মনে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের জন্ম দিচ্ছে—যা শুধু আজ নয়, আগামী দিনগুলোতেও আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।

গতকাল বুধবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে। ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী বাস, প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে নদী পারাপারের অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ একটি ফেরির ধাক্কায় বাসটি পল্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বিকেল সোয়া ৫টার সেই মুহূর্তটি ছিল কয়েক সেকেন্ডের—কিন্তু তার প্রভাব একেকটি পরিবারের জীবনে আজীবনের শোক হয়ে রয়ে যাবে।

আরেব দুর্ঘটনার ঘটনাটি আরও হৃদয়বিদারক। কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেলক্রসিংয়ে একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ। বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী ওমর ফারুকের ভাষায়— “কিছুক্ষণ আগেই বিরতি শেষে বাস ছেড়েছে, বসে মোবাইল দেখছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ, তারপর কিছুই মনে নেই…।”

অন্যদিকে ট্রেনযাত্রী মাহমুদুল হাসান রোমান জানান, গভীর রাতে হঠাৎ শব্দে ঘুম ভেঙে তিনি ছুটে যান আহতদের উদ্ধার করতে। একজন আহত ব্যক্তিকে নিজে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। তার কথায় সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা হলো—দুর্ঘটনার পর যথাসময়ে উদ্ধার ও চিকিৎসা না পৌঁছানো।

এই একটি বিষয়ই আমাদের বড় করে ভাবায়—দুর্ঘটনা হয়তো পুরোপুরি ঠেকানো সবসময় সম্ভব নয়, কিন্তু দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা নিলে কত প্রাণ বাঁচানো যেত!

সংখ্যার ভাষায় ভয়াবহ বাস্তবতা

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বড় চিত্রের অংশ। ২০২৬ সালের ঈদ-উল-ফিতরকে কেন্দ্র করে মাত্র ৮ দিনের যাত্রায় ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২০৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৬০০ জনের বেশি মানুষ।

এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ঈদ-উল-আজহায় প্রায় ১২ দিনে ৩৫০টির মতো দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩১২ জন, আহত ১,০৫৭ জন। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যা একটি করে পরিবার ভেঙে যাওয়ার গল্প, একটি করে স্বপ্নের মৃত্যু।

লেখক
লেখক

আশঙ্কা: আমরা কি মৃত্যুকে স্বাভাবিক করে ফেলছি

আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই। আমরা কি ধীরে ধীরে এই মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছি? প্রতি ঈদে ২০০–৩০০ মানুষের মৃত্যু—এটা যেন এখন আর আমাদের তেমন নাড়া দেয় না। সংবাদপত্রে দেখি, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি—তারপর ভুলে যাই। এই মানসিকতা ভয়ংকর। কারণ যখন একটি সমাজ মৃত্যুতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন পরিবর্তনের তাগিদও কমে যায়।

যদি এই প্রবণতা চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ আরও উদ্বেগজনক। জনসংখ্যা বাড়ছে, যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কি সেই অনুপাতে উন্নত হচ্ছে? বাস্তবতা বলছে—না।

কোথায় মূল সমস্যা?

সমস্যাগুলো নতুন কিছু নয়, কিন্তু সমাধানের জায়গাটিই দুর্বল—

  • অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালনা
  • ফিটনেসবিহীন যানবাহন
  • অদক্ষ বা লাইসেন্সবিহীন চালক
  • মোটরসাইকেলের ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার
  • ট্রাফিক আইন অমান্য করার সংস্কৃতি
  • দুর্বল নজরদারি

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা পৌঁছাতে বিলম্ব। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পেলে যে প্রাণগুলো বাঁচতে পারত, সেগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জবাবদিহিতা কোথায়? দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই চক্র ভাঙবে কীভাবে?

করণীয়: এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়, যদি আন্তরিকতা থাকে—

১. কঠোর আইন প্রয়োগ: ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।

২. চালক প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স সংস্কার: যোগ্যতা যাচাই ছাড়া লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করতে হবে।

৩. মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ: হেলমেট, গতি নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ঈদকেন্দ্রিক বিশেষ ব্যবস্থাপনা: অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে আলাদা ট্রাফিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।

৫. দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা: দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ার’ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: দুর্ঘটনার তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

শেষ কথা

আমরা রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু চাই না। আমাদের চাওয়া একটাই—স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা। ঈদের মতো আনন্দের উৎসব যদি বারবার শোকের প্রতীকে পরিণত হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়—এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা।

২০২৫ সালে ৩১২ জন এবং ২০২৬ সালে অন্তত ২০৪ জনের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সময় এসেছে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। নইলে হয়তো আগামী বছর আবারও একই লেখা লিখতে হবে, শুধু সংখ্যাগুলো আরও বড় হবে—আর আমরা আবারও প্রশ্ন করব, কেন থামছে না এই মৃত্যু?

প্যারিস ২৬ মার্চ ২০২৬

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

শাহাবুদ্দিন শুভ: ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট

ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?

ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?

দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা মানুষের মনে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের জন্ম দিচ্ছে—যা শুধু আজ নয়, আগামী দিনগুলোতেও আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।

৮ ঘণ্টা আগে

কবিতা: তোমার ফিরে আসা

কবিতা: তোমার ফিরে আসা

এইভাবেই তুমি কি/ আমার কষ্ট কিংবা সুখের/ অংশীদার হয়ে থাকবে?/ আর কিছুই চাই না তার চেয়ে বেশি।

১ দিন আগে

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

চাঁদহাট গ্রাম হয়ে উঠল বৃন্দাবন

দোল পূর্ণিমায় শ্রী শ্রী মহানাম চর্চার অনুষ্ঠান। কৃষ্ণ কিংবা রাম নামের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে এ এক আয়োজন। দুই দিন ভাগবত পাঠ, তিন দিন নাম কীর্তন। শেষ দিনে লীলা কীর্তন। অনুষ্ঠানজুড়ে নিমাই-বিষ্ণুপ্রিয়া এবং রাধা-কৃষ্ণের পৌরাণিক দৃশ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৬টি নাম কীর্তনের দল আমন্ত্রিত হয়েছিল এখানে।

৪ দিন আগে

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

প্রবাসে ঈদের তাকবিরেই চোখের কোণায় জল টলমল

আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে, মালয়েশিয়ার যত মসজিদে ঈদের তাকবির শুনেছি, মনে হয় সবার কণ্ঠ যেন একই! যেন রেকর্ড করা তাকবির বাজানো হচ্ছে। বাস্তবে তা নয়। সরাসরি তাকবির পাঠ করেন মসজিদের ঈমাম ও মুসল্লিরা। সবাই সেই মধুর সুরে। একই ছন্দে।

৬ দিন আগে