
শরীফুল আলম

মানুষের ভেতরে থাকা প্রায় সব প্রাথমিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই এক ধরনের দ্বৈততা কাজ করে। এটা না ওটা, হ্যাঁ নাকি না, গ্রহণ নাকি বর্জন। আমি এই অবস্থাকেই দ্বৈততা বলছি। যদিও শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্ত অন্যটিকে বাতিল করে দেয়, তবুও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বমুহূর্তে এই দ্বৈততার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।
পশু জবাইয়ের আগে একটি পশুও পালানোর চেষ্টা করে, ছোটাছুটি করে, প্রাণপণে নিজেকে রক্ষা করতে চায়। ভয়ে তার শরীর কেঁপে ওঠে। অর্থাৎ মৃত্যুভয় শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পশুদের মধ্যেও তা বিদ্যমান। অথচ শিল্পায়িত মাংসশিল্প আজ পৃথিবীর বহু দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও, যেখানে কিছু রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ, সেই ভারতই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গোমাংস রপ্তানিকারক দেশ। কেউ কেউ একে প্রথম, আবার কেউ দ্বিতীয় অবস্থানে রাখেন।
পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক বিধান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মেও দাসপ্রথা, গণিমতের মাল কিংবা বিবাহের উপযুক্ত বয়স সংক্রান্ত নানা সামাজিক ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় আইনে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের এবং ২১ বছরের নিচে ছেলেদের বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো প্রথাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; সবকিছুই সময়, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্বিবেচনার বিষয় হতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বর্বরতাই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাই প্রশ্ন হলো আমরা কোন পাশে গিয়ে দাঁড়াব? উত্তরাধিকারের পক্ষে, নাকি ক্রমবিবর্তনের পক্ষে?
একসময় বাগদাদে হালাকু খানের আক্রমণে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। সম্রাট অশোকের শাসনামলেও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় পাওয়া যায়। আজও ফিলিস্তিনে লাখো মানুষ উদ্বাস্তু, হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে লাখ লাখ ইহুদি প্রাণ হারিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। প্রতি বছর যুদ্ধ, মহামারি ও বিভিন্ন রোগে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাম্প্রতিক করোনা মহামারিতেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও বিপুল প্রাণহানির কথা আমরা স্মরণ করি।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের চিন্তাধারা পাঠ করলে দেখা যায়, তিনি বিশ্বজগতের শাসন ও মানবদুঃখের প্রশ্নকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আমিও বিশ্বাস করি, বিশ্বজগতের পেছনে কোনো বুদ্ধিমান সত্তার অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন জাগে—এত মৃত্যু, এত কষ্ট, এত বেদনা কেন?
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত উপনিষদ পাঠ করতেন। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে।” কিন্তু সত্যিই কি আমরা আজকের পৃথিবীতে সেই আনন্দধারার অবাধ প্রবাহ দেখতে পাই?

লালন শাহের পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয় ছিল হিন্দু। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে যাননি। তার দর্শন ছিল মানুষ ও মানবতার অনুসন্ধানে নিবেদিত।
পরিশেষে আমি বলব, অবসর সময় কাটানোর জন্য কিংবা অস্তিত্বের জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রয়াস হিসেবে ঈশ্বর-ধারণা মোটেও অগ্রহণযোগ্য কিছু নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু দার্শনিক—যেমন প্লেটো, এরিস্টটল এবং সক্রেটিস—মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা ও মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার চর্চা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ঈশ্বর সম্পর্কিত আলোচনা ও অনুসন্ধানও মানবচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: কলামিস্ট ও কবি। নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: [email protected]

মানুষের ভেতরে থাকা প্রায় সব প্রাথমিক সিদ্ধান্তের মধ্যেই এক ধরনের দ্বৈততা কাজ করে। এটা না ওটা, হ্যাঁ নাকি না, গ্রহণ নাকি বর্জন। আমি এই অবস্থাকেই দ্বৈততা বলছি। যদিও শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্ত অন্যটিকে বাতিল করে দেয়, তবুও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বমুহূর্তে এই দ্বৈততার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।
পশু জবাইয়ের আগে একটি পশুও পালানোর চেষ্টা করে, ছোটাছুটি করে, প্রাণপণে নিজেকে রক্ষা করতে চায়। ভয়ে তার শরীর কেঁপে ওঠে। অর্থাৎ মৃত্যুভয় শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পশুদের মধ্যেও তা বিদ্যমান। অথচ শিল্পায়িত মাংসশিল্প আজ পৃথিবীর বহু দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও, যেখানে কিছু রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ, সেই ভারতই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গোমাংস রপ্তানিকারক দেশ। কেউ কেউ একে প্রথম, আবার কেউ দ্বিতীয় অবস্থানে রাখেন।
পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সামাজিক বিধান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মেও দাসপ্রথা, গণিমতের মাল কিংবা বিবাহের উপযুক্ত বয়স সংক্রান্ত নানা সামাজিক ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় আইনে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের এবং ২১ বছরের নিচে ছেলেদের বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো প্রথাই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়; সবকিছুই সময়, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্বিবেচনার বিষয় হতে পারে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বর্বরতাই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাই প্রশ্ন হলো আমরা কোন পাশে গিয়ে দাঁড়াব? উত্তরাধিকারের পক্ষে, নাকি ক্রমবিবর্তনের পক্ষে?
একসময় বাগদাদে হালাকু খানের আক্রমণে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। সম্রাট অশোকের শাসনামলেও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা বিভিন্ন ঐতিহাসিক আলোচনায় পাওয়া যায়। আজও ফিলিস্তিনে লাখো মানুষ উদ্বাস্তু, হাজার হাজার মানুষ নিহত হচ্ছে। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাতে লাখ লাখ ইহুদি প্রাণ হারিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। প্রতি বছর যুদ্ধ, মহামারি ও বিভিন্ন রোগে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সাম্প্রতিক করোনা মহামারিতেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও বিপুল প্রাণহানির কথা আমরা স্মরণ করি।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকিউরাসের চিন্তাধারা পাঠ করলে দেখা যায়, তিনি বিশ্বজগতের শাসন ও মানবদুঃখের প্রশ্নকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আমিও বিশ্বাস করি, বিশ্বজগতের পেছনে কোনো বুদ্ধিমান সত্তার অস্তিত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন জাগে—এত মৃত্যু, এত কষ্ট, এত বেদনা কেন?
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত উপনিষদ পাঠ করতেন। তাই তিনি বলতে পেরেছিলেন, “আনন্দধারা বহিছে ভূবনে।” কিন্তু সত্যিই কি আমরা আজকের পৃথিবীতে সেই আনন্দধারার অবাধ প্রবাহ দেখতে পাই?

লালন শাহের পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয় ছিল হিন্দু। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে যাননি। তার দর্শন ছিল মানুষ ও মানবতার অনুসন্ধানে নিবেদিত।
পরিশেষে আমি বলব, অবসর সময় কাটানোর জন্য কিংবা অস্তিত্বের জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার প্রয়াস হিসেবে ঈশ্বর-ধারণা মোটেও অগ্রহণযোগ্য কিছু নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু দার্শনিক—যেমন প্লেটো, এরিস্টটল এবং সক্রেটিস—মানুষের অস্তিত্ব, নৈতিকতা ও মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনার চর্চা করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ঈশ্বর সম্পর্কিত আলোচনা ও অনুসন্ধানও মানবচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: কলামিস্ট ও কবি। নিউইয়র্ক, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।
ইমেইল: [email protected]
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বর্বরতাই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাই প্রশ্ন হলো আমরা কোন পাশে গিয়ে দাঁড়াব? উত্তরাধিকারের পক্ষে, নাকি ক্রমবিবর্তনের পক্ষে?
আজ আমরা সন্তানদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, শিক্ষক বা বড় কর্মকর্তা বানানোর জন্য সর্বস্ব ব্যয় করছি। ভালো স্কুল, কোচিং, বিশ্ববিদ্যালয়—সবকিছুর পেছনে ছুটছি। কিন্তু আমরা কি সমান গুরুত্ব দিয়ে তাদের মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি?
কষ্টটা নানা ধরনের। অন্য কষ্ট চাপিয়ে সবচেয়ে বড় এক কষ্টের নাম—পরিবার-পরিজন ছাড়া প্রবাসে ঈদ উদ্যাপন।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনেও সেই একই সুযোগ উন্মুক্ত। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নতুন বাংলাদেশ যদি আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তাহলে তা কেবল দেশের জন্য নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি যুগান্তকারী সুযোগ হতে পারে।
৯ দিন আগে