
শাহাবুদ্দিন শুভ

শিক্ষা আমাকে বরাবরই টানে। কোনো একটি কলেজ, কোনো একটি বিদ্যালয় কিংবা সাবেক শিক্ষার্থীদের কোনো মিলনমেলা—এসব কেবল অনুষ্ঠান নয়, এগুলো আসলে স্মৃতির পুনর্জন্ম। তাই যখন প্যারিসে কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলার দাওয়াত পেলাম, তখনই বুঝেছিলাম, এটা আমার কলেজ না হলেও, এটা হবে আমার অনুভূতির জায়গা।
আমি কুলাউড়া সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম না। তবু সেই মিলনমেলার হলে বসে, তাদের চোখের কোণে জমে থাকা আবেগ, কণ্ঠের কাঁপন, আর স্মৃতির ভেজা হাসি দেখে মনে হচ্ছিল—আমি যেন নিজেরই কোনো হারিয়ে যাওয়া ক্যাম্পাসে ফিরে গেছি। তারা যখন সহপাঠী, প্রিয় শিক্ষক কিংবা উড়ন্ত ছাত্রজীবনের গল্প বলছিল, তখন আমার নিজের কলেজ, আমার নিজের বন্ধু, আমার নিজের দিনগুলোও ভেতরে ভেতরে জেগে উঠছিল।

প্যারিসের মতো এক বিশ্বনগরীতে বসে কুলাউড়ার একটি কলেজ যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল—উচ্চারণে, হাসিতে, গল্পে, নীরবতায়। কেউ বলছিল কলেজের মাঠের কথা, কেউ কোনো শিক্ষকের শাসনের স্মৃতি, কেউ আবার হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধুর নাম নিয়ে হঠাৎ থমকে যাচ্ছিল। আমি ছিলাম একজন দর্শক, কিন্তু সেই আবেগের ঢেউ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের অন্তরের ভেতরে।
এই মিলনমেলা আমাকে নতুন করে বুঝিয়ে দিল—শিক্ষা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষা এক ধরনের আত্মীয়তা। যে কলেজই হোক, যে ব্যাচই হোক—যখন কিছু মানুষ তাদের ছাত্রজীবনের স্মৃতি নিয়ে একত্র হয়, তখন সেখানে এক ধরনের পবিত্রতা জন্ম নেয়। সেই পবিত্রতাই আমাকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল।

কুলাউড়ার সঙ্গে আমার নিজেরও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অনার্স জীবনে আমার বহু সহপাঠী ছিল কুলাউড়ার, যাদের অনেকেই আজ দেশের বাইরে—তবু যোগাযোগ কখনো কমেনি। দেশে থাকাকালে পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে শ্বশুরবাড়ির পাশের থানায় যাওয়ার সময় কলেজশিক্ষক বন্ধু এমদাদ প্রায় প্রতিবারই রেলস্টেশনে এসে আমাদের রিসিভ করত। সিলেটপিডিয়ার জন্য সিলেটের চা-বাগানের ইতিহাস লিখতে গিয়েও বারবার ফিরে এসেছে কুলাউড়ার নাম। সিলেটের নদী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মৌলভীবাজার জেলার নদীর সংখ্যা নিয়ে লেখায়ও কুলাউড়ার কথা উঠে এসেছে।
ঢাকায় বসবাসরত কুলাউড়ার অনেকের সঙ্গে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কুলাউড়ার মানুষ সংগঠিত—এটা বহুবার টের পেয়েছি। ঢাকায় সিলেট বিভাগের পুরোনো উপজেলা সমিতিগুলোর মধ্যে কুলাউড়ার সমিতি অন্যতম প্রাচীন, আর তাদের বহু অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই প্যারিসে কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ৬০ জন সাবেক ছাত্রছাত্রী, আর পরিবার-পরিজনসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিরাও এসেছিলেন অনেকেই। পুরো হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ—প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও ছয় শতাধিক মানুষের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আলোচনা ও স্মৃতিচারণ শেষে নৃত্য পরিবেশন করেন জি এম শরীফুল ইসলাম ও তার দল, আর সংগীত পরিবেশন করেন ‘জলের গান’ খ্যাত রাহুল আনন্দ—যার বাড়িও কুলাউড়া উপজেলায়।
আমি অন্য এক কলেজের অনুষ্ঠানে গিয়ে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে আপন অধ্যায়গুলো ছুঁয়ে এসেছি—এই ছিল প্যারিসের সেই সন্ধ্যার সবচেয়ে সুন্দর বিস্ময়। লুলু ভাই ও বাবু ভাইদের টিমকে ধন্যবাদ এ ধরনের একটি আয়োজন করার জন্য।

কুলাউড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ এক ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৬৯ সালের ১ জুন যাত্রা শুরু করা এই কলেজ আজও শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে ভবন, মাঠ, লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, মসজিদ, শহীদ মিনার আর সবুজ বৃক্ষরাজির মাঝে—প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে।
তবে আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়—ফ্রান্সে কোনো উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের এত বড়, দল-মত-পথ নির্বিশেষে একসঙ্গে মিলিত হওয়ার এমন আয়োজন সত্যিই বিরল। এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

দেশের অন্য জেলা ও উপজেলার স্কুল-কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরাও যদি এভাবে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সংগঠিত হতে পারেন, তবে শুধু স্মৃতি আর আবেগ নয়—সেখান থেকে জন্ম নেবে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে এক শক্তিশালী ভূমিকা।
প্যারিসের সেই সন্ধ্যায় আমি বুঝেছিলাম—ক্যাম্পাস বদলায়, দেশ বদলায়, শহর বদলায়; কিন্তু ছাত্রজীবনের টান আর স্মৃতির আলো কখনো নিভে যায় না।
লেখক ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক। ইমেইল: [email protected]

শিক্ষা আমাকে বরাবরই টানে। কোনো একটি কলেজ, কোনো একটি বিদ্যালয় কিংবা সাবেক শিক্ষার্থীদের কোনো মিলনমেলা—এসব কেবল অনুষ্ঠান নয়, এগুলো আসলে স্মৃতির পুনর্জন্ম। তাই যখন প্যারিসে কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলার দাওয়াত পেলাম, তখনই বুঝেছিলাম, এটা আমার কলেজ না হলেও, এটা হবে আমার অনুভূতির জায়গা।
আমি কুলাউড়া সরকারি কলেজের ছাত্র ছিলাম না। তবু সেই মিলনমেলার হলে বসে, তাদের চোখের কোণে জমে থাকা আবেগ, কণ্ঠের কাঁপন, আর স্মৃতির ভেজা হাসি দেখে মনে হচ্ছিল—আমি যেন নিজেরই কোনো হারিয়ে যাওয়া ক্যাম্পাসে ফিরে গেছি। তারা যখন সহপাঠী, প্রিয় শিক্ষক কিংবা উড়ন্ত ছাত্রজীবনের গল্প বলছিল, তখন আমার নিজের কলেজ, আমার নিজের বন্ধু, আমার নিজের দিনগুলোও ভেতরে ভেতরে জেগে উঠছিল।

প্যারিসের মতো এক বিশ্বনগরীতে বসে কুলাউড়ার একটি কলেজ যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল—উচ্চারণে, হাসিতে, গল্পে, নীরবতায়। কেউ বলছিল কলেজের মাঠের কথা, কেউ কোনো শিক্ষকের শাসনের স্মৃতি, কেউ আবার হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধুর নাম নিয়ে হঠাৎ থমকে যাচ্ছিল। আমি ছিলাম একজন দর্শক, কিন্তু সেই আবেগের ঢেউ আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের অন্তরের ভেতরে।
এই মিলনমেলা আমাকে নতুন করে বুঝিয়ে দিল—শিক্ষা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষা এক ধরনের আত্মীয়তা। যে কলেজই হোক, যে ব্যাচই হোক—যখন কিছু মানুষ তাদের ছাত্রজীবনের স্মৃতি নিয়ে একত্র হয়, তখন সেখানে এক ধরনের পবিত্রতা জন্ম নেয়। সেই পবিত্রতাই আমাকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল।

কুলাউড়ার সঙ্গে আমার নিজেরও অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অনার্স জীবনে আমার বহু সহপাঠী ছিল কুলাউড়ার, যাদের অনেকেই আজ দেশের বাইরে—তবু যোগাযোগ কখনো কমেনি। দেশে থাকাকালে পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে শ্বশুরবাড়ির পাশের থানায় যাওয়ার সময় কলেজশিক্ষক বন্ধু এমদাদ প্রায় প্রতিবারই রেলস্টেশনে এসে আমাদের রিসিভ করত। সিলেটপিডিয়ার জন্য সিলেটের চা-বাগানের ইতিহাস লিখতে গিয়েও বারবার ফিরে এসেছে কুলাউড়ার নাম। সিলেটের নদী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মৌলভীবাজার জেলার নদীর সংখ্যা নিয়ে লেখায়ও কুলাউড়ার কথা উঠে এসেছে।
ঢাকায় বসবাসরত কুলাউড়ার অনেকের সঙ্গে জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কুলাউড়ার মানুষ সংগঠিত—এটা বহুবার টের পেয়েছি। ঢাকায় সিলেট বিভাগের পুরোনো উপজেলা সমিতিগুলোর মধ্যে কুলাউড়ার সমিতি অন্যতম প্রাচীন, আর তাদের বহু অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই প্যারিসে কুলাউড়া সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের এই মিলনমেলা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

অনুষ্ঠানে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ৬০ জন সাবেক ছাত্রছাত্রী, আর পরিবার-পরিজনসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রিত অতিথিরাও এসেছিলেন অনেকেই। পুরো হল ছিল কানায় কানায় পূর্ণ—প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও ছয় শতাধিক মানুষের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আলোচনা ও স্মৃতিচারণ শেষে নৃত্য পরিবেশন করেন জি এম শরীফুল ইসলাম ও তার দল, আর সংগীত পরিবেশন করেন ‘জলের গান’ খ্যাত রাহুল আনন্দ—যার বাড়িও কুলাউড়া উপজেলায়।
আমি অন্য এক কলেজের অনুষ্ঠানে গিয়ে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে আপন অধ্যায়গুলো ছুঁয়ে এসেছি—এই ছিল প্যারিসের সেই সন্ধ্যার সবচেয়ে সুন্দর বিস্ময়। লুলু ভাই ও বাবু ভাইদের টিমকে ধন্যবাদ এ ধরনের একটি আয়োজন করার জন্য।

কুলাউড়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ এক ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৬৯ সালের ১ জুন যাত্রা শুরু করা এই কলেজ আজও শিক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে ভবন, মাঠ, লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, মসজিদ, শহীদ মিনার আর সবুজ বৃক্ষরাজির মাঝে—প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে।
তবে আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়—ফ্রান্সে কোনো উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের এত বড়, দল-মত-পথ নির্বিশেষে একসঙ্গে মিলিত হওয়ার এমন আয়োজন সত্যিই বিরল। এটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

দেশের অন্য জেলা ও উপজেলার স্কুল-কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীরাও যদি এভাবে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে সংগঠিত হতে পারেন, তবে শুধু স্মৃতি আর আবেগ নয়—সেখান থেকে জন্ম নেবে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহযোগিতা এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে এক শক্তিশালী ভূমিকা।
প্যারিসের সেই সন্ধ্যায় আমি বুঝেছিলাম—ক্যাম্পাস বদলায়, দেশ বদলায়, শহর বদলায়; কিন্তু ছাত্রজীবনের টান আর স্মৃতির আলো কখনো নিভে যায় না।
লেখক ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক। ইমেইল: [email protected]
এই মিলনমেলা আমাকে নতুন করে বুঝিয়ে দিল—শিক্ষা শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, শিক্ষা এক ধরনের আত্মীয়তা। যে কলেজই হোক, যে ব্যাচই হোক—যখন কিছু মানুষ তাদের ছাত্রজীবনের স্মৃতি নিয়ে একত্র হয়, তখন সেখানে এক ধরনের পবিত্রতা জন্ম নেয়। সেই পবিত্রতাই আমাকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল।
সে ভয় পায়নি।/ কারণ সে জানত,/ যে দেশকে ভালোবাসে,/ সে মৃত্যুকে ছোট করে দেখে।
ক্লাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে তখন শিল্প মানে ছিল দায়, কেবল জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বলেছিলেন, “সেই সময় আমরা জানতাম, ভুল অভিনয় শুধু একটি চরিত্রকে নয়, একটি সময়কেও ভুলভাবে তুলে ধরে।”
দিনগুলো ধীরে এগোল। উরফি মাছ ধরতে যায়। সখিনা রান্না করে। রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়। একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল—আপনি কি কাউকে মেরেছেন? উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—হ্যাঁ। —তাহলে আপনি খারাপ মানুষ। —হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না। এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল।

দিনগুলো ধীরে এগোল। উরফি মাছ ধরতে যায়। সখিনা রান্না করে। রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়। একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল—আপনি কি কাউকে মেরেছেন? উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—হ্যাঁ। —তাহলে আপনি খারাপ মানুষ। —হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না। এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল।
১ দিন আগে