logo
মতামত

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

শাহাবুদ্দিন শুভ
শাহাবুদ্দিন শুভ৬ ঘণ্টা আগে
Copied!
নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

একজন সাধারণ গৃহবধূ কীভাবে ধীরে ধীরে উদ্যোক্তা, তারপর জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণায় আলোচিত মুখ হয়ে উঠতে পারেন—সিমি কিবরিয়ার পথচলা তারই এক অনন্য উদাহরণ। তিনি কেবল একজন প্রার্থীর স্ত্রী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন সাহস, সহমর্মিতা ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। স্বামীর সহযোগী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে নেমে তিনি যে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক পরিসরেই নয়, সাধারণ মানুষের হৃদয়েও আলোড়ন তুলেছে।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন ড. রেজা কিবরিয়া ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেন, তখন সিমি কিবরিয়া সরাসরি প্রচারণার ময়দানে না থাকলেও পেছন থেকে দৃঢ় মেন্টরের ভূমিকা পালন করেছিলেন। রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার ঘটনাটি আমাদের জন্য ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। একটি ব্যাংকিং জটিলতার কারণে মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে ভেঙে পড়েছিলাম, কারণ বিষয়টি তদারকির দায়িত্বে ছিলাম আমি। তখনই তিনি পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—“এখানে তোমার কোনো দোষ নেই।” তাঁর সেই দৃঢ় উচ্চারণ শুধু সান্ত্বনা ছিল না, ছিল আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম। পরবর্তীতে যাচাই করে দেখা যায়, সামান্য এসএমএস এলার্ট চার্জের ভুল হিসাব থেকেই জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বিষয়টি সমাধান হয়। সেই সময়টিতে তাঁর স্থিরতা ও মানসিক শক্তি আমাদের জন্য ছিল প্রেরণার উৎস।

Simi Kibria 2

এবারের নির্বাচনে ধারণা ছিল, তিনি আগের মতো পেছন থেকেই কাজ করবেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি সরাসরি মাঠে নেমে গেলেন। মানুষের সঙ্গে কথা বললেন, তাঁদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলেন। যা ঘটল, তা ছিল অভাবনীয়। গ্রামের নারী থেকে বৃদ্ধা, কিশোর থেকে শিশু—সবাই যেন তাঁকে আপন করে নিল। ভিডিওতে দেখেছি, ছোট শিশুরা মায়ের কোল ছেড়ে তাঁর কোলে এসে বসছে। এক বছরের কম বয়সী শিশুরাও যেন তার সান্নিধ্যে নিরাপত্তা খুঁজে পাচ্ছে। এই গ্রহণযোগ্যতা কোনো অভিনয় বা কৌশল দিয়ে অর্জন করা যায় না; এটি আসে আন্তরিকতা ও মানবিকতার গভীরতা থেকে।

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন। চা-বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে মাটিতে বসে কথা বলেছেন। শতবর্ষী বৃদ্ধার মাথায় হাত রেখেছেন, গ্রামের বাজারে দাঁড়িয়ে চাচাদের সঙ্গে গল্প করেছেন। শিশুদের জন্য খেলনা, কাপড় কিনে তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই সহজ-সরল আচরণ মানুষকে ছুঁয়ে গেছে।

Simi Kibria 3

গ্রামের ভাই-ভাতিজারা তার সঙ্গে ছিল ভ্যানগার্ডের মতো। এতে বোঝা যায়, তিনি শুধু রাজনৈতিক প্রচারণা করেননি; আত্মীয়তা ও দায়িত্ববোধের বন্ধনও দৃঢ় করেছেন। “মা, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি যাও”—এই রাজনৈতিক স্লোগানকে তিনি বাস্তব রূপ দিয়েছেন। ভালোবাসা কৃত্রিমভাবে অর্জন করা যায় না; এটি অর্জন করতে হয় হৃদয় দিয়ে। তিনি তা পেরেছেন।

এই ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা গেছে ১২ তারিখের নির্বাচনে, যখন জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে রেজা কিবরিয়াকে সমর্থন জানিয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনগুলো তার প্রচারণা কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। দূরদেশে বসে সেই খবরগুলো দেখেছি, কিন্তু সরাসরি পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপ রয়ে গেছে।

আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধুই রাজনৈতিক নয়, পারিবারিকও বটে। তার স্বামীর বাড়ি ও আমার বাড়ি একই পাড়ায়। ২০১১ সালের এক বিকেলে ডাচ বাংলা ব্যাংকের গুলশান অফিস থেকে বের হয়ে রেজা কিবরিয়ার বাসায় গেলে প্রথমবার তার সঙ্গে দেখা। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “কেমন আছো বাবা?” সেই সম্বোধন আজও কানে বাজে। প্রথম দেখাতেই তার আন্তরিকতা আমাকে আপন করে নিয়েছিল।

আমি তার শ্বশুর, প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার প্রকাশিত পত্রিকা ‘মৃদুভাষণ’-এ লেখালেখি করতাম। সেই সূত্রেই আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একদিন তিনি প্রস্তাব দিলেন—চলুন অনলাইনে পত্রিকা বের করি। সেখান থেকেই নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে আমার নতুন যাত্রা শুরু। পরে তার উৎসাহেই ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি এই কাজে যুক্ত হই।

Simi Kibria 4

ব্যক্তিগত জীবনেও তার স্নেহ পেয়েছি। আমার বড় মেয়ে যখন মায়ের গর্ভে, তিনি বাসায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সন্তানের জন্মের সময় হাসপাতালে ছুটে গিয়েছেন। বিদেশ থেকে ফিরলে সবার আগে আমার পরিবারের খোঁজ নিতেন। শ্রীলঙ্কা সফর থেকে প্রায়ই আমার পছন্দের ‘Dilmah Tea’ নিয়ে আসতেন। এই ছোট ছোট আচরণই মানুষকে বড় করে তোলে।

রাজনৈতিক টানাপোড়েনে যখন আমরা হতাশ হয়ে পড়তাম, তিনি বলতেন—“আল্লাহর উপর ভরসা রাখ, সব ঠিক হয়ে যাবে।” যুক্তি দিয়ে সাহস জোগাতেন। একজন মানুষ কীভাবে এত দৃঢ়তার সঙ্গে অন্যদের মনোবল চাঙা করতে পারেন, তা ভাবলে আজও বিস্মিত হই।

মিডিয়ার সামনে তিনি আগে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনাগ্রহ ছিল। কিন্তু একবার ঈদের পোশাক নিয়ে একটি টেলিভিশন বক্তব্য মিলিয়ন ভিউ পেলে বুঝেছিলাম—তিনি চাইলে মিডিয়া দারুণভাবে সামলাতে পারেন। এবারের নির্বাচনে সংবাদ সম্মেলনে তার সাবলীল উপস্থাপনা আমাকে নতুন করে বিস্মিত করেছে। প্রথমবারের মতো মাঠে নেমেও তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

সিমি কিবরিয়ার গল্প তাই কেবল একজন প্রার্থীর সহধর্মিণীর গল্প নয়। এটি একজন নারীর আত্মপ্রকাশের গল্প—যিনি গৃহবধূ থেকে উদ্যোক্তা, উদ্যোক্তা থেকে জননেতৃত্বের সহযাত্রী হয়েছেন। মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন হৃদয়ের টানে। আমার প্রত্যাশা, তিনি এভাবেই মানুষের কাছাকাছি থাকবেন। যেভাবে তিনি আমাকে “বাবা” বলে ডাকতেন, সেই স্নেহের ডাক যেন আজীবন শুনে যেতে পারি।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

শাহাবুদ্দিন শুভ: সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

আরও দেখুন

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।

৬ ঘণ্টা আগে

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

৪ দিন আগে

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।

৭ দিন আগে

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

১২ দিন আগে