logo
মতামত

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা২ দিন আগে
Copied!
মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

শহরের শুরু হয় মানুষের চোখে, পায়ের ছন্দে, শব্দে আর শ্বাসে। শহর কেবল রাস্তা বা ভবনের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবনধারা, মিলনস্থল, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতার বুনন। এই অনুভূতি বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় বহু বছর আগের স্টকহোমের পুরনো শহর গামলা স্টানে। সরু রাস্তাগুলোর নিচতলায় দোকান, ওপরে বাসা। শিশুরা খেলত রাস্তার কোণে, বৃদ্ধরা হঠাৎই একে অপরের সঙ্গে দেখা করতেন, ব্যবসায়ীরা খোলা আড্ডায় গল্প জমাতেন। কেউ পরিকল্পনা করে কারও সঙ্গে দেখা করতে বের হতেন না। শহরের প্রতিটি জায়গাতেই জীবন নিজে নিজে প্রবাহিত হতো। প্রতিটি চত্বর, প্রতিটি দোকান, প্রতিটি ফুটপাত ছিল মানুষের জন্য।

পুরনো ঢাকাও একসময় ছিল তেমনই—মানুষকেন্দ্রিক। হাটবাজার, চৌরাস্তা, সরু গলি—সব মিলেই তৈরি হতো জীবনের ছন্দ। ব্যবসায়ী, শিশু, বৃদ্ধ—সবাই মিশে যেত শহরের চলমান স্রোতে। সেখানে শহর গড়ে উঠেছিল মানুষকে কেন্দ্র করে; মানুষকে মানিয়ে নিতে হয়নি শহরের সঙ্গে।

I want to live among people 1

কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া ধীরে ধীরে সেই ছন্দ ভেঙে দিয়েছে। গাড়ির আগমনে শহরের কেন্দ্র দখল হয়ে গেল। রাস্তা প্রশস্ত হলো, চত্বর পরিণত হলো শুধু পার হয়ে যাওয়ার স্থানে। মানুষ সরতে লাগল প্রান্তে। শহর এখন গাড়ির জন্য—মানুষের জন্য নয়। যানজট, লোহার খাঁচার মতো পার্কিং, ধুলোবালু আর অবিরাম শব্দ—সব মিলিয়ে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত। শহর যেন ইট-কংক্রিটের পাঁজরে বন্দি এক জীবন, যেখানে স্বাধীনতা সীমিত, শান্তি দুর্লভ।

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

আজকের স্টকহোম শহর সুন্দর, সুশৃঙ্খল, নিরাপদ। কিন্তু সামাজিকভাবে তা খণ্ডিত। পর্যটক আসে, ছবি তোলে, কেনাকাটা করে, চলে যায়। বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন সংগঠিত হয় শহরের কেন্দ্রের বাইরে। ‘ফিকা’—কফি আর কথোপকথনের সংস্কৃতি এখনো আছে, সম্পর্কও আছে, কিন্তু আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ততা নেই। শহরের কেন্দ্র আর নিজে নিজে সামাজিকতা তৈরি করে না।

I want to live among people 2

অন্যদিকে দুবাই, টোকিও, হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো বিশ্বনগরীতে দেখা যায় ভিন্ন এক ছন্দ—প্রচণ্ড গতিশীল, ভরপুর, প্রায় বিশৃঙ্খল অথচ জীবন্ত। রাস্তা, ফুটপাত, মল, স্কাইব্রিজ—সবখানে মানুষের ভিড়। কেউ হাঁটছে, কেউ কাজ করছে, দোকান খোলা, বিজ্ঞাপন ঝলমল করছে, পর্যটক ঘুরছে। এখানে জীবন থেমে থাকে না। এটি শান্ত বা ধীর নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তে উপস্থিত থাকার এক প্রবল অভিজ্ঞতা। শহরের ছন্দ দ্রুত, কখনো বিশৃঙ্খল, কিন্তু জীবন্ত।

আবার ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী শহর—স্টকহোম, প্যারিস, লন্ডন দেয় ভিন্ন অভিজ্ঞতা। রাস্তা পরিচ্ছন্ন, স্থাপত্য মনোরম, চত্বর ও বাগান সুসংগঠিত। মানুষ ধীরে হাঁটে, দৃশ্য উপভোগ করে। শহর সুন্দর, নিরাপদ, শৃঙ্খল—কিন্তু সামাজিক উপস্থিতি প্রায়ই পরিকল্পিত, কখনো পর্যটকনির্ভর। জীবন আছে, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ততার ঘনত্ব কম।

এই তুলনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝায়—ভিড়, গতি, এমনকি কিছুটা বিশৃঙ্খলতাও শহরের প্রাকৃতিক সামাজিক জীবন তৈরি করতে পারে। আরামদায়ক না হলেও সেখানে প্রাণ থাকে। বিপরীতে, অতিরিক্ত শৃঙ্খলা ও নকশা অনেক সময় শহরের সামাজিক উষ্ণতাকে কমিয়ে দেয়।

I want to live among people 3

ভেনিস এখানে এক ব্যতিক্রম। এখানে রাস্তা মানুষের জন্য, গাড়ির জন্য নয়। হাঁটা মানে কেবল কোথাও পৌঁছানো নয়—হাঁটা মানে থাকা, ভাবা, অনুভব করা। শহরের কেন্দ্র এখনো জীবন ধারণ করে; শুধু চলাচল নয়, সেখানে অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বড় শহর—ঢাকা, চট্টগ্রাম অন্য বাস্তবতার মুখোমুখি। জনসংখ্যা বিপুল, কিন্তু নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ চলাচল সীমিত। ট্রাফিক, দূষণ, অনিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নগরজীবনকে সংকুচিত করে। পার্ক, উন্মুক্ত চত্বর, বিনামূল্যের সামাজিক মিলনস্থল কম। মানুষ একত্র হয় মূলত ভোগের কারণে; ক্রয়ক্ষমতা না থাকলে সামাজিক উপস্থিতিও সংকুচিত হয়। শহর তখন জীবন নয়, বেঁচে থাকার সংগ্রামক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায়।

সব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটি জটিল প্রশ্ন সামনে আসে, শহর যদি মানুষকে নিরাপদে হাঁটার, বসার, দেখা করার সুযোগ না দেয়, তবে তার সামাজিক ভূমিকা কোথায়? শহরের কেন্দ্র যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে শহর তার মূল অর্থ হারায়।

I want to live among people 4

জীবনকে আবার কেন্দ্রে আনতে হবে। এটি নস্টালজিয়া নয়, রোমান্টিক কল্পনা নয়—এটি বাস্তব সামাজিক প্রয়োজন। শহর এমন হতে হবে, যেখানে মানুষ থাকতে চায়; শুধু কাজ সেরে চলে যেতে নয়। যেখানে চলাচল মানে কেবল গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং উপস্থিত থাকা।

স্টকহোমের ইতিহাস, ভেনিসের ব্যতিক্রম, বাংলাদেশের কঠিন বাস্তবতা, আর বিশ্বনগরীর অভিজ্ঞতা—সবই একই কথা বলে: শহর মানুষের কেন্দ্র না হলে, শহর ফাঁকা হয়ে যায়। কেন্দ্র যদি জীবনের জন্য না হয়, তবে আমরা শুধু জায়গা পাই—জীবন পাই না।

এই লেখা কোনো উপসংহার নয়; বরং একটি সূচনা—একটি প্রশ্ন, একটি আহ্বান: আমরা কীভাবে একসাথে থাকতে চাই, যাতে মানুষ সত্যিকার অর্থে শহরের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে? হাঁটলে যেন মানুষ পাওয়া যায়, থামলে যেন দেখা হয়, বসলে যেন সম্পর্ক জন্মায়। মানুষ থাকলেই শহর বাঁচে। মানুষ না থাকলে শহর কেবল কংক্রিট আর রাস্তার সমষ্টি—সেখানে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকা যায় না।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

রহমান মৃধা: গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

২ দিন আগে

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

স্বপ্নের দেশে অভিবাসীর দুঃস্বপ্ন

আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।

৪ দিন আগে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: রাজনীতি, অর্থনীতি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সমাজের সন্ধিক্ষণে—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত এআই যুগের জন্য?

৪ দিন আগে

প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?

প্রযুক্তি যখন হাতের মুঠোয়, তখন ভাষাগত বিভ্রান্তি কেন?

রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো প্রস্তুতি। বিদেশি সাংবাদিকের সামনে দাঁড়ানো মানে ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, দাবি ও বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করা। সে ক্ষেত্রে ভাষাগত দুর্বলতা কোনো অজুহাত হতে পারে না।

৪ দিন আগে