
সহিদুল আলম স্বপন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি সতর্ক করেছে—বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ বাড়লে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিও বাড়তে পারে, যদি সেই বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়। আপাতদৃষ্টিতে সমীকরণটি সরল হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি জটিল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত এই প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতার জন্য?
এআই এখন আর ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দুয়ার খুলতে পারে—এমনটাই বলছে আইএমএফ। কিন্তু এই আশাবাদের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা—বাংলাদেশ কি সত্যিই এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো স্পষ্টভাবে শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় এবং কৃষি—এই তিনটি খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান স্তম্ভ। অথচ এআই বিপ্লব এই তিন ক্ষেত্রেই মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলো দ্রুত স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও স্মার্ট ফ্যাক্টরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যেখানে মানবশ্রমের প্রয়োজন কমছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে, যেখানে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কর্মরত। দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ ছাড়া অটোমেশন একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও, অন্যদিকে বড় আকারের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি করতে পারে।
প্রবাসী আয়ের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন রোবোটিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজার গড়ে তুলছে। ফলে স্বল্পদক্ষ বিদেশি শ্রমের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। এই বাস্তবতায় দক্ষতাবঞ্চিত বাংলাদেশি শ্রমিকরা আগামী দশকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই শ্রমবাজার পুনর্গঠন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং অভিবাসন নীতির সংস্কার ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি অনিবার্য দায়িত্ব।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এআই এক নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করছে। এতদিন বাংলাদেশের উন্নয়ন রাজনীতি অনেকাংশে সস্তা শ্রম ও অবকাঠামোভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই মডেল বদলে যাচ্ছে। অথচ দেশে এখনো এআই, তথ্য সুরক্ষা কিংবা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারে সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি যুক্ত হলে তা সহজেই নজরদারি, তথ্য বিকৃতি বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে—যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
তবে সম্ভাবনার দিকটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ প্রযুক্তিমনস্ক, সৃজনশীল এবং উদ্যোক্তাপ্রবণ। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ফিনটেক ও ই-কমার্স খাতে ইতিমধ্যেই এআইভিত্তিক স্থানীয় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা যদি তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল বিপণন এবং স্মার্ট লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবে ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সামাজিক বাস্তবতায় এআই একটি নতুন বিভাজনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। এটি হতে পারে দক্ষতাভিত্তিক সমাজ, যেখানে প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এগিয়ে যাবে, আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে শিক্ষা ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে বৈষম্য এখনো প্রকট, সেখানে এই ‘প্রযুক্তি ফাঁক’ সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে ডিজিটাল সমতা নিশ্চিত করা—যাতে প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে দেয়াল নয়, সেতু তৈরি করে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। চীন ও ভারতের মাঝামাঝি অবস্থান এই অঞ্চলকে আগামী দশকে এআই বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার নতুন মানচিত্রে পরিণত করতে পারে। চীন এআইনির্ভর উৎপাদনে দ্রুত এগোচ্ছে, আর ভারত বলছে “এআই ফর অল”। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব প্রযুক্তি রোডম্যাপ ও কৌশল নির্ধারণে পিছিয়ে থাকে, তবে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রবল।
সবশেষে, এআই কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি নতুন রাজনীতির ভাষা। আগামী সরকারের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতি ও ন্যায্যতা রক্ষা।
প্রশ্ন একটাই: আমরা কি গড়তে পারব একটি স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি—নাকি অজান্তেই জন্ম দেব বৈষম্যের এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতির? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথ।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি সতর্ক করেছে—বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ বাড়লে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিও বাড়তে পারে, যদি সেই বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতায় রূপ নেয়। আপাতদৃষ্টিতে সমীকরণটি সরল হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি জটিল প্রশ্ন—বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত এই প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতার জন্য?
এআই এখন আর ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে এআই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দুয়ার খুলতে পারে—এমনটাই বলছে আইএমএফ। কিন্তু এই আশাবাদের আড়ালে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা—বাংলাদেশ কি সত্যিই এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনো স্পষ্টভাবে শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয় এবং কৃষি—এই তিনটি খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান স্তম্ভ। অথচ এআই বিপ্লব এই তিন ক্ষেত্রেই মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলো দ্রুত স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ও স্মার্ট ফ্যাক্টরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যেখানে মানবশ্রমের প্রয়োজন কমছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে, যেখানে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কর্মরত। দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ ছাড়া অটোমেশন একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ালেও, অন্যদিকে বড় আকারের কর্মসংস্থান সংকট তৈরি করতে পারে।
প্রবাসী আয়ের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ এখন রোবোটিকস ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজার গড়ে তুলছে। ফলে স্বল্পদক্ষ বিদেশি শ্রমের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। এই বাস্তবতায় দক্ষতাবঞ্চিত বাংলাদেশি শ্রমিকরা আগামী দশকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই শ্রমবাজার পুনর্গঠন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং অভিবাসন নীতির সংস্কার ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি অনিবার্য দায়িত্ব।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এআই এক নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করছে। এতদিন বাংলাদেশের উন্নয়ন রাজনীতি অনেকাংশে সস্তা শ্রম ও অবকাঠামোভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন সেই মডেল বদলে যাচ্ছে। অথচ দেশে এখনো এআই, তথ্য সুরক্ষা কিংবা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারে সুস্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। শক্তিশালী রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি যুক্ত হলে তা সহজেই নজরদারি, তথ্য বিকৃতি বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে—যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
তবে সম্ভাবনার দিকটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ প্রযুক্তিমনস্ক, সৃজনশীল এবং উদ্যোক্তাপ্রবণ। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ফিনটেক ও ই-কমার্স খাতে ইতিমধ্যেই এআইভিত্তিক স্থানীয় উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা যদি তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল বিপণন এবং স্মার্ট লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবে ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সামাজিক বাস্তবতায় এআই একটি নতুন বিভাজনের ঝুঁকিও তৈরি করছে। এটি হতে পারে দক্ষতাভিত্তিক সমাজ, যেখানে প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এগিয়ে যাবে, আর অদক্ষ জনগোষ্ঠী আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে শিক্ষা ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে বৈষম্য এখনো প্রকট, সেখানে এই ‘প্রযুক্তি ফাঁক’ সামাজিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে ডিজিটাল সমতা নিশ্চিত করা—যাতে প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে দেয়াল নয়, সেতু তৈরি করে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। চীন ও ভারতের মাঝামাঝি অবস্থান এই অঞ্চলকে আগামী দশকে এআই বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার নতুন মানচিত্রে পরিণত করতে পারে। চীন এআইনির্ভর উৎপাদনে দ্রুত এগোচ্ছে, আর ভারত বলছে “এআই ফর অল”। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব প্রযুক্তি রোডম্যাপ ও কৌশল নির্ধারণে পিছিয়ে থাকে, তবে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রবল।
সবশেষে, এআই কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি নতুন রাজনীতির ভাষা। আগামী সরকারের সামনে তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতি ও ন্যায্যতা রক্ষা।
প্রশ্ন একটাই: আমরা কি গড়তে পারব একটি স্মার্ট, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি—নাকি অজান্তেই জন্ম দেব বৈষম্যের এক নতুন প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতির? এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যাত্রাপথ।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]
আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।
প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সমাজের সন্ধিক্ষণে—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত এআই যুগের জন্য?
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো প্রস্তুতি। বিদেশি সাংবাদিকের সামনে দাঁড়ানো মানে ব্যক্তিগত মতামত দেওয়া নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, দাবি ও বাস্তবতাকে প্রতিনিধিত্ব করা। সে ক্ষেত্রে ভাষাগত দুর্বলতা কোনো অজুহাত হতে পারে না।
নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, কামার, কুমার—যাই হোক না কেন, পরিচিত হবে তার শ্রম ও প্রতিভায়। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি—সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাত।