
রহমান মৃধা

পদ্মফুল কাদা আর পানিতে জন্মায়—এটাই প্রকৃতির নিয়ম। গোবর সেখানে সার হতে পারে, জন্মস্থান নয়। বাস্তব অর্থে গোবরে পদ্মফুল ফোটা অসম্ভব।
কিন্তু সমাজ প্রকৃতির নিয়মে চলে না। সমাজ চলে বৈষম্য, অবহেলা, নীরবতা আর প্রতিরোধের ইতিহাসে। সেখানেই প্রশ্নটি অর্থ পায়—গোবরে পদ্মফুল কি সম্ভব?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শৈশবে রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন। এই গল্প শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের নয়; এটি বলে দেয়, সামাজিক সিঁড়ির নিচের ধাপ মানেই শেষ নয়।
বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে।
ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা ছিলেন দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তান। ছোটবেলায় কারখানায় কাজ করেছেন। সেখান থেকেই তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেছেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা একসময় রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী ছিলেন। ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। সেই মানুষই পরে হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ববিবেকের প্রতীক।
বলিভিয়ার ইভো মোরালেস বেড়ে উঠেছেন আদিবাসী কৃষক পরিবারে। লামা চরানো ছিল তার শৈশব। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন জন্মেছিলেন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। শিক্ষা ছিল অনিয়মিত। সেই মানুষই দাসপ্রথা বিলোপের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইউরোপও ব্যতিক্রম নয়।
সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লোভেন বেড়ে উঠেছেন শ্রমজীবী পরিবারে। তিনি নিজে ছিলেন একজন ওয়েল্ডার। কোনো অভিজাত রাজনৈতিক বংশ নয়—শ্রমিক আন্দোলন থেকেই তার উত্থান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি তার শ্রমিক পরিচয় লুকাননি।
ফিনল্যান্ডের সানা মারিন বড় হয়েছেন একক মায়ের সংসারে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে। সেই বাস্তবতা থেকেই উঠে এসে তিনি হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে—বয়স বা সামাজিক পটভূমি রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
এই সব উদাহরণ একটি কথাই স্পষ্ট করে—সমাজ যত বৈষম্যময়, তত গভীর সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। শর্ত একটাই: নীরবতা ভাঙতে হবে।
প্রকৃতিতে গোবরে পদ্মফুল ফোটে না। কিন্তু ইতিহাসে ফোটে—যদি আমরা গোবরকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিই।
যদি বলি, একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানকে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে প্রশাসনে বা সংসদে দেখতে চাই—তাহলে সেটি কি শুধু শিরোনাম হবে? না, সেটি সময়ের দাবি। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান। দেশের দায়ভার তাদেরই নেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি এখনো ঘটছে না। বরং এটাই আমাদের ভাবায়। তবু আশা আছে, এবং সেই অপেক্ষাও আছে।
এই অপেক্ষা কোনো এক ব্যক্তিকে দেখার অপেক্ষা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার পরিবর্তনের অপেক্ষা। যে সংসদ এখনো বংশ, অর্থ, ক্ষমতা আর তথাকথিত এলিট পরিচয়ের চারপাশে ঘোরে, সেখানে একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানের প্রবেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাওয়া।
জেলে তার দক্ষতায় সমুদ্রের গভীর থেকে মাছ তুলে আনে। তার সন্তান সেই জীবন দেখে, শেখে, অভিজ্ঞতায় বড় হয়। একজন রাজমিস্ত্রির সন্তানও শেখে কীভাবে ঘর গড়ে ওঠে—ইট, বালি আর সিমেন্টে। অথচ সেই রাজমিস্ত্রি নিজের জন্য স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করতে পারেন না। যে স্কুল বানান, তার সন্তান সেখানে মানসম্মত শিক্ষা পায় না। যে শহরের অবকাঠামো দাঁড় করান, সেই শহরের নীতিনির্ধারণে তার কোনো কণ্ঠ থাকে না।
কিন্তু যদি এই জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানেরা সংসদে যেতে পারে, তারা শুধু নিজেদের ভাগ্য নয়—অসংখ্য মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারবে। তারা বুঝবে ঘর মানে শুধু বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নয়, নিরাপদ আশ্রয়ও। তারা বুঝবে রাষ্ট্র মানে কেবল ক্ষমতার অলংকার নয়, দায়িত্বের ভার।
আমি বিশ্বাস করতে চাই—এদের উপস্থিতি মানে নীরব মানুষের কথা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন হোক শ্রেণি-উল্টে দেওয়ার রাজনীতি নয়, মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। প্রশ্ন এই নয়—কে কোন পেশার সন্তান। প্রশ্ন হলো—কে মানুষের কথা বোঝে, কে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির ছেলে সংসদে গেলে সংসদ ছোট হবে না, বরং বড় হবে। তখন সংসদ যুক্ত হবে বাস্তব জীবনের সঙ্গে, যুক্ত হবে ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে।
এই অপেক্ষা কেবল একটি আসনের জন্য নয়। এটি সেই দিনের অপেক্ষা, যেদিন শ্রম, ঘাম আর সততার সন্তানদের আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। যেদিন রাষ্ট্র বলবে—তুমি কার সন্তান তা নয়, তুমি কেমন মানুষ সেটাই শেষ কথা।
এই বক্তব্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে নতুন বাংলাদেশের ছবি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডে কেউই শুধু সংখ্যা নয়—প্রত্যেকে একটি জীবন, একটি গল্প, একটি সম্ভাবনা। তবুও অনেকেই আজও আটকে আছে এক অদৃশ্য খাঁচায়, কিছু মুখোশধারী ক্ষমতাবান মানুষের তৈরি কাঠামোর ভেতরে।
এই ভণ্ড এলিট পরিচয়ের মুখোশ—ভাষা, পোশাক, ক্ষমতা আর অর্থের আড়াল—ভাঙাই নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত।
নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, কামার, কুমার—যাই হোক না কেন, পরিচিত হবে তার শ্রম ও প্রতিভায়। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি—সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাত।
কামারের হাতুড়ির আঘাতে লোহা যেমন আকার পায়, তেমনি গড়ে ওঠে সভ্যতা। কুমারের চাকায় ঘুরতে থাকা মাটি থেকে জন্ম নেয় জীবনের ধারক পাত্র। অথচ এই মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
কৃষক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, নার্স, ক্ষুদ্র দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষক—সবাই এই রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের শ্রমেই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব হবে তখনই, যখন শ্রম ও প্রতিভাকে শ্রেণির চোখে দেখা বন্ধ হবে। অধিকার তখন ভিক্ষা নয়—স্বীকৃত সত্য হবে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠুক নতুন কিছু নাম—যারা কোনো ক্ষমতাধর পরিবারের উত্তরাধিকারী নয়, বরং সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছে। যাদের বাবারা সন্তানদের মধ্যে ভয় নয়, আত্মসম্মান গড়ে তুলেছেন; মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন।
স্বাধীনতা সংগ্রাম বা গণআন্দোলনের সময় এমন হাজারো তরুণ-তরুণী ছিলেন—সংগঠক, চিন্তক, সাহস জাগানো কণ্ঠ। তারা উত্তেজনা নয়, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন; প্রতিশোধ নয়, দায়িত্বের কথা বলেছেন। আন্দোলনের পরেও অনেকেই নীরবে কাজ করে গেছেন—মানুষকে ব্যবহার করেননি, মানুষকে বিশ্বাস করেছেন।
এই কারণেই তাদের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব মানে শুধু মাইক্রোফোন ধরা নয়; নেতৃত্ব মানে সময়ের আগে ভাবা এবং সঠিক সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আরও একটি কথা স্পষ্ট—জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তান হওয়া দুর্বলতা নয়, শক্তি। তারা জানে কীভাবে গড়তে হয়। তারা দেখেছে ভিত্তি দুর্বল হলে ঘর টেকে না। এই বাস্তব শিক্ষা তাদের ধৈর্যশীল, দায়িত্ববান ও বাস্তবমুখী নেতৃত্ব দেয়।
তারা শুধু কথা বলে না—তারা গড়তে জানে। যেমন করে তাদের বাবারা ঘর গড়েন, তেমন করেই তারা স্বপ্ন দেখে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার।
সবশেষে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রেখে আমি এই তরুণদের মঙ্গল কামনা করি। তাদের সাহস অটুট থাকুক, দায়বদ্ধতা অক্ষুণ্ণ থাকুক। নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন গড়ার শক্তি তাদের ভেতরে আরও দৃঢ় হোক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]

পদ্মফুল কাদা আর পানিতে জন্মায়—এটাই প্রকৃতির নিয়ম। গোবর সেখানে সার হতে পারে, জন্মস্থান নয়। বাস্তব অর্থে গোবরে পদ্মফুল ফোটা অসম্ভব।
কিন্তু সমাজ প্রকৃতির নিয়মে চলে না। সমাজ চলে বৈষম্য, অবহেলা, নীরবতা আর প্রতিরোধের ইতিহাসে। সেখানেই প্রশ্নটি অর্থ পায়—গোবরে পদ্মফুল কি সম্ভব?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শৈশবে রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন। এই গল্প শুধু ব্যক্তিগত উত্থানের নয়; এটি বলে দেয়, সামাজিক সিঁড়ির নিচের ধাপ মানেই শেষ নয়।
বিশ্বে এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে।
ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা ছিলেন দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তান। ছোটবেলায় কারখানায় কাজ করেছেন। সেখান থেকেই তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং দারিদ্র্য বিমোচনকে রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত করেছেন।
নেলসন ম্যান্ডেলা একসময় রাষ্ট্রের চোখে অপরাধী ছিলেন। ২৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। সেই মানুষই পরে হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্ববিবেকের প্রতীক।
বলিভিয়ার ইভো মোরালেস বেড়ে উঠেছেন আদিবাসী কৃষক পরিবারে। লামা চরানো ছিল তার শৈশব। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন জন্মেছিলেন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। শিক্ষা ছিল অনিয়মিত। সেই মানুষই দাসপ্রথা বিলোপের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ইউরোপও ব্যতিক্রম নয়।
সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লোভেন বেড়ে উঠেছেন শ্রমজীবী পরিবারে। তিনি নিজে ছিলেন একজন ওয়েল্ডার। কোনো অভিজাত রাজনৈতিক বংশ নয়—শ্রমিক আন্দোলন থেকেই তার উত্থান। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি তার শ্রমিক পরিচয় লুকাননি।
ফিনল্যান্ডের সানা মারিন বড় হয়েছেন একক মায়ের সংসারে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে। সেই বাস্তবতা থেকেই উঠে এসে তিনি হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তার নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে—বয়স বা সামাজিক পটভূমি রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়।
এই সব উদাহরণ একটি কথাই স্পষ্ট করে—সমাজ যত বৈষম্যময়, তত গভীর সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। শর্ত একটাই: নীরবতা ভাঙতে হবে।
প্রকৃতিতে গোবরে পদ্মফুল ফোটে না। কিন্তু ইতিহাসে ফোটে—যদি আমরা গোবরকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিই।
যদি বলি, একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানকে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে প্রশাসনে বা সংসদে দেখতে চাই—তাহলে সেটি কি শুধু শিরোনাম হবে? না, সেটি সময়ের দাবি। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান। দেশের দায়ভার তাদেরই নেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি এখনো ঘটছে না। বরং এটাই আমাদের ভাবায়। তবু আশা আছে, এবং সেই অপেক্ষাও আছে।
এই অপেক্ষা কোনো এক ব্যক্তিকে দেখার অপেক্ষা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার পরিবর্তনের অপেক্ষা। যে সংসদ এখনো বংশ, অর্থ, ক্ষমতা আর তথাকথিত এলিট পরিচয়ের চারপাশে ঘোরে, সেখানে একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানের প্রবেশ মানে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাওয়া।
জেলে তার দক্ষতায় সমুদ্রের গভীর থেকে মাছ তুলে আনে। তার সন্তান সেই জীবন দেখে, শেখে, অভিজ্ঞতায় বড় হয়। একজন রাজমিস্ত্রির সন্তানও শেখে কীভাবে ঘর গড়ে ওঠে—ইট, বালি আর সিমেন্টে। অথচ সেই রাজমিস্ত্রি নিজের জন্য স্থায়ী ঘর নিশ্চিত করতে পারেন না। যে স্কুল বানান, তার সন্তান সেখানে মানসম্মত শিক্ষা পায় না। যে শহরের অবকাঠামো দাঁড় করান, সেই শহরের নীতিনির্ধারণে তার কোনো কণ্ঠ থাকে না।
কিন্তু যদি এই জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তানেরা সংসদে যেতে পারে, তারা শুধু নিজেদের ভাগ্য নয়—অসংখ্য মানুষের ভাগ্য বদলাতে পারবে। তারা বুঝবে ঘর মানে শুধু বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নয়, নিরাপদ আশ্রয়ও। তারা বুঝবে রাষ্ট্র মানে কেবল ক্ষমতার অলংকার নয়, দায়িত্বের ভার।
আমি বিশ্বাস করতে চাই—এদের উপস্থিতি মানে নীরব মানুষের কথা রাষ্ট্রের কেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়া।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন হোক শ্রেণি-উল্টে দেওয়ার রাজনীতি নয়, মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি। প্রশ্ন এই নয়—কে কোন পেশার সন্তান। প্রশ্ন হলো—কে মানুষের কথা বোঝে, কে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। একজন জেলে বা রাজমিস্ত্রির ছেলে সংসদে গেলে সংসদ ছোট হবে না, বরং বড় হবে। তখন সংসদ যুক্ত হবে বাস্তব জীবনের সঙ্গে, যুক্ত হবে ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে।
এই অপেক্ষা কেবল একটি আসনের জন্য নয়। এটি সেই দিনের অপেক্ষা, যেদিন শ্রম, ঘাম আর সততার সন্তানদের আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। যেদিন রাষ্ট্র বলবে—তুমি কার সন্তান তা নয়, তুমি কেমন মানুষ সেটাই শেষ কথা।
এই বক্তব্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে নতুন বাংলাদেশের ছবি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডে কেউই শুধু সংখ্যা নয়—প্রত্যেকে একটি জীবন, একটি গল্প, একটি সম্ভাবনা। তবুও অনেকেই আজও আটকে আছে এক অদৃশ্য খাঁচায়, কিছু মুখোশধারী ক্ষমতাবান মানুষের তৈরি কাঠামোর ভেতরে।
এই ভণ্ড এলিট পরিচয়ের মুখোশ—ভাষা, পোশাক, ক্ষমতা আর অর্থের আড়াল—ভাঙাই নতুন বাংলাদেশের প্রথম শর্ত।
নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, কামার, কুমার—যাই হোক না কেন, পরিচিত হবে তার শ্রম ও প্রতিভায়। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি—সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাত।
কামারের হাতুড়ির আঘাতে লোহা যেমন আকার পায়, তেমনি গড়ে ওঠে সভ্যতা। কুমারের চাকায় ঘুরতে থাকা মাটি থেকে জন্ম নেয় জীবনের ধারক পাত্র। অথচ এই মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
কৃষক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, জেলে, তাঁতি, নার্স, ক্ষুদ্র দোকানি, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষক—সবাই এই রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাদের শ্রমেই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ রাষ্ট্র তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়।
নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তব হবে তখনই, যখন শ্রম ও প্রতিভাকে শ্রেণির চোখে দেখা বন্ধ হবে। অধিকার তখন ভিক্ষা নয়—স্বীকৃত সত্য হবে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠুক নতুন কিছু নাম—যারা কোনো ক্ষমতাধর পরিবারের উত্তরাধিকারী নয়, বরং সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছে। যাদের বাবারা সন্তানদের মধ্যে ভয় নয়, আত্মসম্মান গড়ে তুলেছেন; মাথা নত না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন।
স্বাধীনতা সংগ্রাম বা গণআন্দোলনের সময় এমন হাজারো তরুণ-তরুণী ছিলেন—সংগঠক, চিন্তক, সাহস জাগানো কণ্ঠ। তারা উত্তেজনা নয়, দিকনির্দেশনা দিয়েছেন; প্রতিশোধ নয়, দায়িত্বের কথা বলেছেন। আন্দোলনের পরেও অনেকেই নীরবে কাজ করে গেছেন—মানুষকে ব্যবহার করেননি, মানুষকে বিশ্বাস করেছেন।
এই কারণেই তাদের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্ব মানে শুধু মাইক্রোফোন ধরা নয়; নেতৃত্ব মানে সময়ের আগে ভাবা এবং সঠিক সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আরও একটি কথা স্পষ্ট—জেলে বা রাজমিস্ত্রির সন্তান হওয়া দুর্বলতা নয়, শক্তি। তারা জানে কীভাবে গড়তে হয়। তারা দেখেছে ভিত্তি দুর্বল হলে ঘর টেকে না। এই বাস্তব শিক্ষা তাদের ধৈর্যশীল, দায়িত্ববান ও বাস্তবমুখী নেতৃত্ব দেয়।
তারা শুধু কথা বলে না—তারা গড়তে জানে। যেমন করে তাদের বাবারা ঘর গড়েন, তেমন করেই তারা স্বপ্ন দেখে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার।
সবশেষে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রেখে আমি এই তরুণদের মঙ্গল কামনা করি। তাদের সাহস অটুট থাকুক, দায়বদ্ধতা অক্ষুণ্ণ থাকুক। নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই স্বপ্ন গড়ার শক্তি তাদের ভেতরে আরও দৃঢ় হোক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]
নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, কামার, কুমার—যাই হোক না কেন, পরিচিত হবে তার শ্রম ও প্রতিভায়। আমরা যে ঘরে থাকি, যে চেয়ারে বসি, যে হাঁড়িতে ভাত রান্না করি, যে রাস্তা দিয়ে চলি—সবকিছুর পেছনেই আছে এই মানুষের হাত।
কত বঞ্চনা/ তবুও করি তার বন্দনা/ আমি নই পণ্য,/ তুমি চতুর/ তুমি শিকারি/ মনে রেখ আমি নই ভিখারি,
বাংলাদেশের রাজনীতির সূচনা হয়েছিল গণরাজনীতির ভেতর দিয়ে। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রচিন্তা নির্মাণ করেছিল—রাষ্ট্র জনগণের, ক্ষমতা জনগণের সম্মতির ফল। কিন্তু স্বাধীনতার পর খুব দ্রুতই সেই ধারায় ছেদ পড়ে।
কান্নাকাটি করলেই বলতেন, আমার মেয়ের মনোবলে এত কম হলে হবে? তারপর জীবনের কত চড়াই–উতরাই গেল। দুটো বাবু নিয়ে আলাদা জীবনযাপন শুরু করলাম। ফোনে শুধু শুনতাম, মা তুমি পারবে, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো, তোমার দায়িত্ব আমার নানুদের সুন্দর করে মানুষ করা।