
রহমান মৃধা

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, গণভোট ও জুলাই সনদের ধারণা সবচেয়ে বেশি বহন করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেই সনদ ধারণ করার রাজনৈতিক মূল্য হিসেবেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। অথচ যারা কার্যত কিছু না করে ওই সনদের উত্তরাধিকার দাবি করতে চেয়েছিলেন, তারা আজও দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে আবদ্ধ।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই স্বৈরশাসন, ভোট জালিয়াতি, ত্রাণ ও কম্বল চুরির মতো অনৈতিকতার সংস্কৃতি বিদ্যমান। জিয়া থেকে এরশাদ পর্যন্ত শাসনামলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। একটি আঞ্চলিক প্রবাদ আছে—“সব মাছে গু খায়, ঘাউরা মাছের দোষ হয়।” কিন্তু শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু স্বৈরাচারী উপাধিই অর্জন করেননি; বিনিময়ে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে এক ধরনের বর্জনের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।
যে সনদ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক—সুইডিশ ভাষায় যাকে বলা যায় “självklara valet”, অর্থাৎ স্বাভাবিক ও অনিবার্য—সেই সনদ নিয়েই আজ একটি বড় গোষ্ঠী সংশয় প্রকাশ করছে। যখন একটি জাতি এমন আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ধরে নিতে হয় তার নৈতিক বোধে অবক্ষয় ঘটেছে। যে জাতি নিজের বিপদকে ঈশ্বরের পরীক্ষা বলে মেনে নেয়, কিন্তু অন্যের বিপদকে পাপের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে, সেখানে এই নৈতিক দ্বিচারিতা গভীরভাবে প্রোথিত।
আমি ‘নেমকহারাম’ শব্দটির অর্থ জানি। আমি নেমকহারাম দেখেছি, নেমকহারামি করতেও দেখেছি। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিবিদদের মতো পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নেমকহারামি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। সত্য বলতে কী, অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য জুলাই সনদকে ব্যবহার করেছে। সম্ভবত এই কারণেই সমাজের একাংশ মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে এবং দুঃখের সঙ্গে বলছে, তারা আর জুলাই সনদ ধারণ করে না। আমার বিশ্বাস, এটি অভিমান থেকে বলা—মন থেকে নয়।
এবার আসা যাক অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায়ন এবং গত ১৮ মাসে তাদের ভূমিকার প্রসঙ্গে। জাতির প্রত্যাশা ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি শুধু নিজেই পরাজিত হননি, আমাদেরকেও পরাজিত করেছেন। ওসমান হাদি তাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন তিনি জাতির সামনে স্পষ্ট করে বলেন—কারা তাকে সঠিক পথে দেশ পরিচালনায় বাধা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই নীরবতাই জুলাই সনদকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই দায় কি তিনি এড়াতে পারবেন?
রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি যখন বলেন, “জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন,” তখন সেই বক্তব্য আর ব্যক্তিগত মত থাকে না—তা রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়। বিশেষত যখন সেই ব্যক্তি মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নোবেলজয়ী ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হন, তখন তার প্রতিটি উচ্চারণ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর প্রতিধ্বনিত হয়।
বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাদের সব জিনিস জাল। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আমরা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই বক্তব্যের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপর—যাদের বড় একটি অংশ কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভিসা ও পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।
পাসপোর্ট খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সেবাখাতের মধ্যে পাসপোর্ট সেবায় মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে।
মনে পড়ে, শেখ হাসিনাকেও একসময় বলতে শুনেছি—তার বাড়ির কাজের লোক নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। সেদিনই আমি ধরে নিয়েছিলাম, তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি সেই বাস্তবতা আজও মেনে নিতে পারেননি। আফসোস।
দেশটা যে কারও বাপের নয়, কারও মায়ের নয়, বা কোনো পরিবারের নয়—এই সত্য আমরা এখনো প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু সময়ের সঙ্গে বেমানান নয়; তা মানবিক ও নৈতিক সীমা ভয়ংকরভাবে লঙ্ঘন করেছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়ে তার মন্তব্য এমন এক মানসিকতা প্রকাশ করে, যা ইতিহাস, বাস্তবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ—তিনটির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। রাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রায় ৩০ বছর দেশ পরিচালনা করেছেন নারী নেতৃত্ব। মুক্তিযুদ্ধ, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীরা প্রমাণ করেছেন—নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গনির্ভর বিষয় নয়।
এই বাস্তবতার পরও যখন একজন রাজনৈতিক নেতা কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেন, তখন তা শুধু নারী অবমাননা নয়—এটি একটি রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা। এখানেই প্রশ্ন উঠে আসে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা কোন মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
রাজনীতি, দুর্নীতি এবং বহিরাগত চাপ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়; এটি এখন গঠনগত ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয় করেছে। এই আস্থাহীনতার সুযোগে বহিরাগত শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস। প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখার এই প্রবণতা দেশকে জনগণের রাষ্ট্র থেকে স্বার্থের সংঘর্ষস্থলে পরিণত করছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়—আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি দুর্নীতিমুক্ত, সার্বভৌম ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বন্দোবস্তেই সন্তুষ্ট থাকব? যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বারবার আস্থার সংকটে পড়ে, তবে মানুষের বিশ্বাস আর ফিরে আসবে না। তখন রাজনীতি জনগণের হাতিয়ার না হয়ে দেশি–বিদেশি স্বার্থের কৌশলগত মাঠে পরিণত হবে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
রহমান মৃধা: গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ইমেইল: [email protected]

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, গণভোট ও জুলাই সনদের ধারণা সবচেয়ে বেশি বহন করেছিলেন শেখ হাসিনা। সেই সনদ ধারণ করার রাজনৈতিক মূল্য হিসেবেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। অথচ যারা কার্যত কিছু না করে ওই সনদের উত্তরাধিকার দাবি করতে চেয়েছিলেন, তারা আজও দ্বিধা ও দ্বন্দ্বে আবদ্ধ।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই স্বৈরশাসন, ভোট জালিয়াতি, ত্রাণ ও কম্বল চুরির মতো অনৈতিকতার সংস্কৃতি বিদ্যমান। জিয়া থেকে এরশাদ পর্যন্ত শাসনামলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। একটি আঞ্চলিক প্রবাদ আছে—“সব মাছে গু খায়, ঘাউরা মাছের দোষ হয়।” কিন্তু শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু স্বৈরাচারী উপাধিই অর্জন করেননি; বিনিময়ে বাংলাদেশকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে এক ধরনের বর্জনের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।
যে সনদ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক—সুইডিশ ভাষায় যাকে বলা যায় “självklara valet”, অর্থাৎ স্বাভাবিক ও অনিবার্য—সেই সনদ নিয়েই আজ একটি বড় গোষ্ঠী সংশয় প্রকাশ করছে। যখন একটি জাতি এমন আচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ধরে নিতে হয় তার নৈতিক বোধে অবক্ষয় ঘটেছে। যে জাতি নিজের বিপদকে ঈশ্বরের পরীক্ষা বলে মেনে নেয়, কিন্তু অন্যের বিপদকে পাপের শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করে, সেখানে এই নৈতিক দ্বিচারিতা গভীরভাবে প্রোথিত।
আমি ‘নেমকহারাম’ শব্দটির অর্থ জানি। আমি নেমকহারাম দেখেছি, নেমকহারামি করতেও দেখেছি। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিবিদদের মতো পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক নেমকহারামি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। সত্য বলতে কী, অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য জুলাই সনদকে ব্যবহার করেছে। সম্ভবত এই কারণেই সমাজের একাংশ মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে এবং দুঃখের সঙ্গে বলছে, তারা আর জুলাই সনদ ধারণ করে না। আমার বিশ্বাস, এটি অভিমান থেকে বলা—মন থেকে নয়।
এবার আসা যাক অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায়ন এবং গত ১৮ মাসে তাদের ভূমিকার প্রসঙ্গে। জাতির প্রত্যাশা ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তিনি শুধু নিজেই পরাজিত হননি, আমাদেরকেও পরাজিত করেছেন। ওসমান হাদি তাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন তিনি জাতির সামনে স্পষ্ট করে বলেন—কারা তাকে সঠিক পথে দেশ পরিচালনায় বাধা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই নীরবতাই জুলাই সনদকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই দায় কি তিনি এড়াতে পারবেন?
রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি যখন বলেন, “জালিয়াতিতে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন,” তখন সেই বক্তব্য আর ব্যক্তিগত মত থাকে না—তা রাষ্ট্রের ভাষায় পরিণত হয়। বিশেষত যখন সেই ব্যক্তি মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নোবেলজয়ী ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হন, তখন তার প্রতিটি উচ্চারণ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর প্রতিধ্বনিত হয়।
বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমাদের সব জিনিস জাল। ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আমরা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই বক্তব্যের সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ নাগরিকদের ওপর—যাদের বড় একটি অংশ কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য ভিসা ও পাসপোর্টের ওপর নির্ভরশীল।
পাসপোর্ট খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সেবাখাতের মধ্যে পাসপোর্ট সেবায় মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে।
মনে পড়ে, শেখ হাসিনাকেও একসময় বলতে শুনেছি—তার বাড়ির কাজের লোক নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। সেদিনই আমি ধরে নিয়েছিলাম, তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি সেই বাস্তবতা আজও মেনে নিতে পারেননি। আফসোস।
দেশটা যে কারও বাপের নয়, কারও মায়ের নয়, বা কোনো পরিবারের নয়—এই সত্য আমরা এখনো প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু সময়ের সঙ্গে বেমানান নয়; তা মানবিক ও নৈতিক সীমা ভয়ংকরভাবে লঙ্ঘন করেছে। নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়ে তার মন্তব্য এমন এক মানসিকতা প্রকাশ করে, যা ইতিহাস, বাস্তবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ—তিনটির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। রাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রায় ৩০ বছর দেশ পরিচালনা করেছেন নারী নেতৃত্ব। মুক্তিযুদ্ধ, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারীরা প্রমাণ করেছেন—নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গনির্ভর বিষয় নয়।
এই বাস্তবতার পরও যখন একজন রাজনৈতিক নেতা কর্মজীবী নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলেন, তখন তা শুধু নারী অবমাননা নয়—এটি একটি রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা। এখানেই প্রশ্ন উঠে আসে, রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা কোন মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
রাজনীতি, দুর্নীতি এবং বহিরাগত চাপ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়; এটি এখন গঠনগত ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয় করেছে। এই আস্থাহীনতার সুযোগে বহিরাগত শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস। প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখার এই প্রবণতা দেশকে জনগণের রাষ্ট্র থেকে স্বার্থের সংঘর্ষস্থলে পরিণত করছে।
এখানেই মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়—আমরা কি সত্যিকার অর্থে একটি দুর্নীতিমুক্ত, সার্বভৌম ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন বন্দোবস্তেই সন্তুষ্ট থাকব? যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বারবার আস্থার সংকটে পড়ে, তবে মানুষের বিশ্বাস আর ফিরে আসবে না। তখন রাজনীতি জনগণের হাতিয়ার না হয়ে দেশি–বিদেশি স্বার্থের কৌশলগত মাঠে পরিণত হবে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
রহমান মৃধা: গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
ইমেইল: [email protected]
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।
বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।
আজ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার অভিবাসন নীতিতে কঠোর পরিবর্তন এনেছে। অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। মেক্সিকো সীমান্তে ব্যয়বহুল প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হলো—এই ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী; ইউরোপীয় বসতিস্থাপনকারীরাও একসময় অভিবাসী ছিল।
প্রযুক্তি, রাজনীতি ও সমাজের সন্ধিক্ষণে—বাংলাদেশ কি প্রস্তুত এআই যুগের জন্য?