
সৈয়দ ইজাজ আহসান

পবিত্র ঈদুল আজহা সম্প্রতি পালিত হলো। দীর্ঘ ছুটির এই উৎসব মোটের ওপর বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঈদুল আজহার সঙ্গে প্রতি বছর একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে চলে আসে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর বাসিন্দাদের জন্য। আর তা হলো কোরবানির পশু থেকে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য।
প্রতি ঈদুল আজহায় দেশে লাখ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে নিকটস্থ ময়লার ভাগাড় বা ডাস্টবিনে ফেলা হয়। ডাস্টবিন উপচে পড়ে সেই আবর্জনা আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে এবং দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সিটি করপোরেশনগুলো সাধারণত আগেভাগেই ঘোষণা দেয় যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তারা কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করবে। শতভাগ না হলেও মোটামুটি সফলভাবেই তারা এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে তাদের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। এবার প্রধানমন্ত্রী নিজেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন, যা নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু ঈদের সময়ই কি বর্জ্য সমস্যা দেখা দেয়? বাস্তবতা হলো, সারা বছরই দেশের নানা প্রান্তে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকা একটি পরিচিত দৃশ্য। বিদেশে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। উন্নত দেশগুলোর শহরগুলো সাধারণত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন; কোথাও আবর্জনার স্তূপ বা দুর্গন্ধের চিহ্ন দেখা যায় না। যদিও নেপাল, ভারত কিংবা আফ্রিকার কিছু দেশে আমাদের মতো পরিস্থিতি বিরল নয়, তবুও উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
এখানে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জনসচেতনতা এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষেই বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই একদিকে যেমন মানুষকে সচেতন করতে হয়, অন্যদিকে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে রাস্তায় সামান্য ময়লা ফেললেও বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। বিশ্বের আরও অনেক দেশেই এ ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এ বিষয়ে কার্যকর প্রয়োগ খুবই সীমিত।
ফলে যে যেখানে পারে, ময়লা-আবর্জনা ফেলে চলে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, বহুতল ভবনের ওপর থেকে সরাসরি রাস্তার ওপর আবর্জনা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কখনো কখনো তা পথচারীদের গায়েও পড়ে। যেন রাস্তা সবার হলেও তার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব কারও নয়। অথচ এত বিপুল জনসংখ্যার দেশে নাগরিক সচেতনতা ছাড়া পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা অসম্ভব।
তবে বর্জ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। বর্জ্য শুধু সমস্যা নয়; এটি একটি মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদও হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তুলেছে।
ইউরোপের দেশ জার্মানি পুনর্ব্যবহার ও উৎপাদক-দায়বদ্ধতা নীতির মাধ্যমে তাদের বর্জ্যের ৬৫ শতাংশেরও বেশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। এটি বিশ্বে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুইডেন তাদের মোট বর্জ্যের ১ শতাংশেরও কম ভূমি ভরাটে ব্যবহার করে। জাপানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এমন বর্জ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং এর একটি বড় অংশ থেকে শক্তি উৎপাদন করা হয়। একই সঙ্গে দেশটি বর্জ্য হ্রাস ও পুনর্ব্যবহারের বিভিন্ন কৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করছে। ফলে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন দেশ।
ফ্রান্সও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেখানে সুপার মার্কেটগুলোকে অবিক্রীত খাদ্যসামগ্রী দুঃস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। এর ফলে একদিকে যেমন খাদ্যের অপচয় কমে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যবর্জ্য সৃষ্টিও রোধ করা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। খাদ্যবর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে মাইক্রোচিপযুক্ত ওজনযন্ত্র বসানো থাকে। কেউ বর্জ্য ফেললে তা সঙ্গে সঙ্গে ওজন করে এবং উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি আদায় করা হয়। ফলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের অপচয় কমাতে উৎসাহিত হয়।
বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের একটি বড় অংশের বর্জ্য ভূমি ভরাটে ব্যবহৃত হয়। আবার বিপুল পরিমাণ বর্জ্য আদৌ সংগ্রহ করা হয় না; সেগুলো রাস্তা, নালা-নর্দমা, খোলা জায়গা কিংবা জলাশয়ে পড়ে থাকে। শিল্পবর্জ্যের সমস্যাও ভয়াবহ। বহু নদী শিল্পবর্জ্যের কারণে দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এসব বর্জ্য প্রতিনিয়ত পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যেখানে বর্জ্য ফেলা হয়, সেই ভূমি এবং আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়।
কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে এই বর্জ্যই হতে পারে মূল্যবান সম্পদ। খাদ্যবর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। একই সঙ্গে বায়োগ্যাস উৎপাদনেরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন করছে। সিঙ্গাপুরসহ বহু উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এ বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশ বহুমুখী লাভবান হবে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার শিল্প শ্রমঘন হওয়ায় এতে দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি উৎপাদনের নতুন উৎস তৈরি হবে। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে এবং এ খাতে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এ বিষয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বড় বড় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকেও এসব গবেষণার অর্থায়ন করা সম্ভব।
শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। ফলে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তা দেশের মোট বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তাই ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কীভাবে এই বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় এবং পরিবেশ দূষণ কমানো যায়—সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমরাও একদিন দূষণমুক্ত ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব—এমন প্রত্যাশাই করি।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক বাহরাইনপ্রবাসী। ইমেইল: [email protected], ফেসবুক: Syed Ahsan

পবিত্র ঈদুল আজহা সম্প্রতি পালিত হলো। দীর্ঘ ছুটির এই উৎসব মোটের ওপর বড় কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঈদুল আজহার সঙ্গে প্রতি বছর একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে চলে আসে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর বাসিন্দাদের জন্য। আর তা হলো কোরবানির পশু থেকে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য।
প্রতি ঈদুল আজহায় দেশে লাখ লাখ পশু কোরবানি করা হয়। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে নিকটস্থ ময়লার ভাগাড় বা ডাস্টবিনে ফেলা হয়। ডাস্টবিন উপচে পড়ে সেই আবর্জনা আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে এবং দুর্গন্ধে পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সিটি করপোরেশনগুলো সাধারণত আগেভাগেই ঘোষণা দেয় যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তারা কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করবে। শতভাগ না হলেও মোটামুটি সফলভাবেই তারা এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে তাদের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবি রাখে। এবার প্রধানমন্ত্রী নিজেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন, যা নিঃসন্দেহে এ উদ্যোগকে আরও গতিশীল করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু ঈদের সময়ই কি বর্জ্য সমস্যা দেখা দেয়? বাস্তবতা হলো, সারা বছরই দেশের নানা প্রান্তে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকা একটি পরিচিত দৃশ্য। বিদেশে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। উন্নত দেশগুলোর শহরগুলো সাধারণত অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন; কোথাও আবর্জনার স্তূপ বা দুর্গন্ধের চিহ্ন দেখা যায় না। যদিও নেপাল, ভারত কিংবা আফ্রিকার কিছু দেশে আমাদের মতো পরিস্থিতি বিরল নয়, তবুও উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
এখানে দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জনসচেতনতা এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া কোনো কর্তৃপক্ষের পক্ষেই বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই একদিকে যেমন মানুষকে সচেতন করতে হয়, অন্যদিকে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়। উদাহরণ হিসেবে সিঙ্গাপুরের কথা বলা যায়। সেখানে রাস্তায় সামান্য ময়লা ফেললেও বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। বিশ্বের আরও অনেক দেশেই এ ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এ বিষয়ে কার্যকর প্রয়োগ খুবই সীমিত।
ফলে যে যেখানে পারে, ময়লা-আবর্জনা ফেলে চলে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, বহুতল ভবনের ওপর থেকে সরাসরি রাস্তার ওপর আবর্জনা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কখনো কখনো তা পথচারীদের গায়েও পড়ে। যেন রাস্তা সবার হলেও তার পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব কারও নয়। অথচ এত বিপুল জনসংখ্যার দেশে নাগরিক সচেতনতা ছাড়া পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা অসম্ভব।
তবে বর্জ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। বর্জ্য শুধু সমস্যা নয়; এটি একটি মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদও হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তুলেছে।
ইউরোপের দেশ জার্মানি পুনর্ব্যবহার ও উৎপাদক-দায়বদ্ধতা নীতির মাধ্যমে তাদের বর্জ্যের ৬৫ শতাংশেরও বেশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। এটি বিশ্বে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুইডেন তাদের মোট বর্জ্যের ১ শতাংশেরও কম ভূমি ভরাটে ব্যবহার করে। জাপানে পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এমন বর্জ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং এর একটি বড় অংশ থেকে শক্তি উৎপাদন করা হয়। একই সঙ্গে দেশটি বর্জ্য হ্রাস ও পুনর্ব্যবহারের বিভিন্ন কৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করছে। ফলে জাপান আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন দেশ।
ফ্রান্সও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেখানে সুপার মার্কেটগুলোকে অবিক্রীত খাদ্যসামগ্রী দুঃস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করতে হয়। এর ফলে একদিকে যেমন খাদ্যের অপচয় কমে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যবর্জ্য সৃষ্টিও রোধ করা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় খাদ্যবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। খাদ্যবর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থানে মাইক্রোচিপযুক্ত ওজনযন্ত্র বসানো থাকে। কেউ বর্জ্য ফেললে তা সঙ্গে সঙ্গে ওজন করে এবং উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি আদায় করা হয়। ফলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই খাদ্যের অপচয় কমাতে উৎসাহিত হয়।
বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দেশের একটি বড় অংশের বর্জ্য ভূমি ভরাটে ব্যবহৃত হয়। আবার বিপুল পরিমাণ বর্জ্য আদৌ সংগ্রহ করা হয় না; সেগুলো রাস্তা, নালা-নর্দমা, খোলা জায়গা কিংবা জলাশয়ে পড়ে থাকে। শিল্পবর্জ্যের সমস্যাও ভয়াবহ। বহু নদী শিল্পবর্জ্যের কারণে দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। এসব বর্জ্য প্রতিনিয়ত পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যেখানে বর্জ্য ফেলা হয়, সেই ভূমি এবং আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়।
কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে এই বর্জ্যই হতে পারে মূল্যবান সম্পদ। খাদ্যবর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। একই সঙ্গে বায়োগ্যাস উৎপাদনেরও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন করছে। সিঙ্গাপুরসহ বহু উন্নত দেশ ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে এ বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা গেলে দেশ বহুমুখী লাভবান হবে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার শিল্প শ্রমঘন হওয়ায় এতে দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি উৎপাদনের নতুন উৎস তৈরি হবে। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। অথচ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে এবং এ খাতে বিনিয়োগ ও গবেষণা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এ বিষয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের বড় বড় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকেও এসব গবেষণার অর্থায়ন করা সম্ভব।
শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। ফলে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তা দেশের মোট বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তাই ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কীভাবে এই বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় এবং পরিবেশ দূষণ কমানো যায়—সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো আমরাও একদিন দূষণমুক্ত ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হব—এমন প্রত্যাশাই করি।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক বাহরাইনপ্রবাসী। ইমেইল: [email protected], ফেসবুক: Syed Ahsan
পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি নাগরিক সচেতনতা। আমরা যদি বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখি, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হতে পারে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব।
ফরাসি সমাজে অধিকাংশ পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। তবুও মাত্র চার দিনের নোটিশে তারা যেভাবে আমার জন্য একটি বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, তা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
অমৃতের সন্ধানে সিম সিম সিনেমা বলে কালো দরজা খুলে গেলে আমরা পর্দায় যা দেখি …।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো বর্বরতাই চিরস্থায়ী হতে পারেনি। তাই প্রশ্ন হলো আমরা কোন পাশে গিয়ে দাঁড়াব? উত্তরাধিকারের পক্ষে, নাকি ক্রমবিবর্তনের পক্ষে?