logo
মতামত

গল্প: ছায়ানদী

হিমু আকরাম২ ঘণ্টা আগে
Copied!
গল্প: ছায়ানদী
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

নদী যাদের নাম জানে

ভোরের আগের সময়টুকু সুন্দরবনের নদীগুলো নিজেদের নাম ভুলে যায়। তখন তারা আর পশুর মতো হিংস্র নয়, মানুষের মতো নিরীহও নয়—তারা শুধু সাক্ষী। কুয়াশা নামলে জল আর আকাশ এক হয়ে যায়, আর সেই মিলনস্থলেই জন্ম নেয় সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা।

ট্রলারটা চলছিল নদীর বুক চিরে। ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দের সঙ্গে মাঝিদের নিঃশ্বাস মিশে যাচ্ছিল। কেউ কথা বলছিল না। কথা বললে নাকি নদী রেগে যায়, এই বিশ্বাস এখানে পুরোনো।

হঠাৎ পাশের ট্রলার থেকে চিৎকার।

তারপর গুলি।

শব্দটা নদীর ওপর পড়ে ছড়িয়ে পড়ল না বরং কুয়াশার ভেতর আটকে গেল। কয়েকজন মানুষ ছায়ার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুখ দেখা গেল না, কিন্তু হাতগুলো চেনা। এই হাতগুলো বহু বছর ধরে নদীর আইন বদলে দিয়েছে।

একজন মাঝি চোখ বন্ধ করল। সে জানত, চোখ খোলা রাখলে আজীবনের বোঝা বইতে হবে।

দূরে পুলিশের ওয়্যারলেস কেঁপে উঠল—

“গোলপাতার ঘের পার হয়েছে… সন্দেহ ডাকাত কেরামতের দল… রেডি ইউনিট থ্রি।”

নদী কোনো উত্তর দিল না। সে জানে, মানুষের বিচার তার কাছে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়!


কেরামত: একজন বাবা

কেরামতের জন্ম হয়েছিল দারিদ্র্যের ভেতর, কিন্তু সে দারিদ্র্যকে কখনো ক্ষমা করেনি। প্রথম খুন করেছিল ২০ বছর বয়সে। সেদিন রাতে সে বমি করেছিল অনেক। এখন আর করে না।

জঙ্গলের গভীরে তার ঘরটা যেন মানুষের নয়—কোনো ছবি নেই, কোনো স্মৃতি নেই। এখানে সময় থেমে থাকে।

আগুনের সামনে বসে সে উরফির দিকে তাকাল।

—তোর নামে হুলিয়া হয়েছে।

—জানি।

—দুইজন পুলিশ মরছে।

—শুনিছি।

কেরামত চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমি তোকে বাঁচাতে পারি। কিন্তু তার দাম আছে।

—আমি দাম দিতে শিখেছি।

কেরামত উঠে দাঁড়াল।

—হাওরে যাবি। আমার শ্বশুরবাড়ি।

উরফি মাথা তুলল।

—সখিনার কাছে?

এই নামটা কেরামতের গলায় অন্য রকম শোনাল।

—হ্যাঁ। কিন্তু মনে রাখবি, ও কিছু জানবে না। জানলে তুইও বাঁচবি না, আমিও না। আমার মেয়ের জীবন বাঁচাতে নজরবন্দি করে রাখবি।

এই কথাটা সে বলেছিল ডাকাত কেরামত হয়ে নয়, একজন ভয় পাওয়া বাবা হয়ে।

সখিনার পৃথিবী

হাওরের বাড়িটায় কেরামত বছরে দুই বার আসে। আসে মানে রাতে আসে, ভোরে চলে যায়। সখিনা ছোটবেলা থেকেই শিখেছে, আব্বা মানে প্রশ্নহীন ভালোবাসা।

একবার সে জিজ্ঞেস করেছিল,

—আব্বু, আপনি এত দূরে থাকেন কেন?

কেরামত বলেছিল,

—দূরে থাকলে তোকে কাছ থেকে দেখা যায়।

সখিনা তখন বুঝতে পারেনি। এখনো পুরো বোঝে না।

তার পৃথিবী ছোট। হাওর, উঠোন, বৃষ্টি আর অপেক্ষা।

উরফির আগমন

সেদিন বৃষ্টি থামেনি। উঠোনে কাদা, আকাশ ভারী। সখিনা গাছের পাতা সরাচ্ছিল, এমন সময় একজন ভেজা মানুষ এসে দাঁড়াল।

কে আপনি?

লোকটা একটু থেমে বলল,

—আপনার আব্বা পাঠিয়েছেন।

এই কথাটার ভেতরেই সখিনার সব বিশ্বাস।

—নাম?

—উরফি।

সে লক্ষ করল লোকটার চোখে ঘুম আছে, কিন্তু মিথ্যে নেই।

ভালোবাসা যেভাবে আসে

দিনগুলো ধীরে এগোল।

উরফি মাছ ধরতে যায়।

সখিনা রান্না করে।

রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়।

একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল,

—আপনি কি কাউকে মেরেছেন?

উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—হ্যাঁ।

—তাহলে আপনি খারাপ মানুষ।

—হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না।

এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল। কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

পিতৃত্বের ভয়

জঙ্গলে কেরামত অস্থির হয়ে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে আরও কাছে ঠেলে দিয়েছে আগুনের। উরফি যদি সব সত্য বলে দেয় সখিনার কাছে, কেরামত হারিয়ে ফেলবে তার মেয়েকে। এত বছর দূরে রেখেও যে মেয়ের জন্য গোপনে কাঁদে কেরামত!

মকসুদ বলল, হাওরে পাঠাই?

কেরামত চোখ বন্ধ করল।

—হ্যাঁ। উরফিরে কুমিরের পেটে দিয়া দে।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে প্রথম বুঝল, ক্ষমতা দিয়ে সব রক্ষা করা যায় না। যেমন উরফির জন্য তার মায়া!

পত্রিকার দেয়াল

হাটে গিয়ে পত্রিকার দেয়ালে সখিনার চোখ আটকে গেল। ‘জোড়া খুনের আসামি উরফি’

তার হাত কাঁপছিল। বৃষ্টি ভিজে সে বাড়ি ফিরল।

—তুমি কে?

—আমি এমন একজন, যে তোমার জন্য বদলাতে চেয়েছিল।

—আমার আব্বা কী করে?

উরফি চুপ করে রইল।

এই চুপটাই ছিল সখিনার কাছে সবচেয়ে জোরালো চিৎকার!

সত্যের ভার

সখিনা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। ঘরের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ যেন প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে একটি করে প্রশ্ন ফেলছিল।

উরফি উঠোনে বসে ছিল, মাথা নিচু করে।

—তুমি যদি আগে বলতে…

সখিনা বলল, গলায় অভিযোগ নয়, ক্লান্তি।

—আগে বললে তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে?

উরফি জিজ্ঞেস করল।

—না।

—তাহলে?

এই ‘তাহলে’-র কোনো উত্তর নেই। কিছু সত্য শুধু সময় চায়, ক্ষমা চায় না।

সখিনা জানত তার আব্বা তাকে আগলে রাখতে গিয়ে একটা দুনিয়া তৈরি করেছে, যার ভেতরে ঢুকলেই রক্ত লেগে যায়। সে এখন সেই দুনিয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

পালানো

তারা পালাল ভোরের আগে। হাওর তখনো ঘুমাচ্ছে।

নৌকাটা ধীরে নদীতে নামল। চারপাশে কুয়াশা, যেন নদী নিজেই তাদের ঢেকে দিচ্ছে।

—আমরা কি পারব?

সখিনা ফিসফিস করে বলল।

—পারব না জানি বলেই যাচ্ছি।

উরফি বলল।

পেছনে পড়ে থাকল বাড়ি, উঠোন, শৈশব।

সামনে শুধু জল।

অনুসরণ

মকসুদের ট্রলার দ্রুত ছোটে। ইঞ্জিনের শব্দে নদীর বুক ফেটে যাচ্ছে। মকসুদ উরফি মুখোমুখি।

—কেরামতের সালাম নিস।

সে হাসল।

এই অনুসরণে ব্যক্তিগত কিছু নেই। এখানে শুধু আদেশ আর আনুগত্য। কেরামত জঙ্গলে বসে ছিল। দূরে গুলির শব্দ শোনার আগেই সে বুঝে গিয়েছিল, সে তার মেয়েকে শেষবারের মতো ছুঁয়েছে বহু বছর আগে।

নদীর মাঝখানে

নদীর মাঝখানে সংঘর্ষটা খুব দ্রুত হলো।

উরফির শরীরে গুলি লাগল। রক্ত জলে মিশে গেল।

সখিনা চিৎকার করতে চেয়েও পারল না। গলা আটকে গেল।

মকসুদ ট্রলার ঘুরিয়ে নিল।

—শেষ করবি নাকি?

কেউ জিজ্ঞেস করল।

মকসুদ তাকাল সখিনার দিকে। হঠাৎ তার মনে হলো, এই চোখ সে আগেও দেখেছে। ভয় নয়, প্রশ্ন।

সে ট্রলার ঘুরিয়ে নিল।

মরা মানুষ আর ঝামেলা বাড়ায় না।

নদী কাউকে জানাল না—উরফি বেঁচে আছে না মরে গেছে।

কেরামতের শাস্তি

পরদিন সকালে কেরামত খবর পেল, উরফি নিখোঁজ, সখিনার কোনো খোঁজ নেই। সে চিৎকার করল না।

অস্ত্র তুলল না। সে শুধু বসে রইল। প্রথমবার তার মনে হলো, সে হেরেছে। পুলিশের কাছে নয়, নিজের মেয়ের কাছে।

কয়েক মাস পর এক ভোরে সুন্দরবনের ভেতর থেকে তার লাশ উদ্ধার হলো।

গুলির চিহ্ন নেই।

খবরের কাগজে লেখা হলো—

‘ডাকাত কেরামতের মৃত্যু: রহস্যজনক’

কেউ জানল না, সে নিজেই নদীতে নেমেছিল কি না।

নিখোঁজ জীবন

উরফি বেঁচে ছিল।

কিন্তু সে আর আগের উরফি নয়।

শরীরে গুলির দাগ, মনে অনন্ত ক্ষত।

একটা শহরে তারা আশ্রয় নিল। যেখানে কেউ তাদের নাম জানে না। সখিনা কোনোদিন আর তার আব্বার কথা তুলল না। উরফিও ক্ষমা চাইল না। নীরবতা তাদের সংসারের নিয়ম হয়ে গেল।

সন্তানের জন্ম

ছেলেটার জন্মের রাতে উরফি প্রথম কাঁদল।

এই কান্না অপরাধের জন্য নয়, ভয়ের জন্য।

—আমার পাপ কি ও বইবে?

সে ভাবল।

সখিনা শুধু বলেছিল,

—ও যেন সত্য নিয়ে বড় হয়।

এই কথাটাই ছিল উরফির যাবজ্জীবন শাস্তি।

নদীর ধারে

বহু বছর পর।

একটি ছোট শহর। পরিচিত নয় এমন নদী।

উরফি দাঁড়িয়ে থাকে প্রায়ই। কথা বলে না।

ছেলেটা একদিন জিজ্ঞেস করল,

—আব্বু, তুমি এত চুপ কেন?

উরফি বলল,

—কারণ আমি এক জীবনে অনেক কথা বলেছি। এখন আর কথা খুঁজে পাই না!

ছায়ানদী

তখন সন্ধ্যা নামে। ছেলেটা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

আব্বু, নদীতে ছায়া পড়ে কেন?

উরফি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল,

—কারণ আলো সব সময় সাহসী হয় না। কিছু আলো ছায়া হয়ে বাঁচে।

সখিনা দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল। তার মনে হলো এই নীরবতাই তাদের শাস্তি।

এই বেঁচে থাকাই বিচার।

নদী বইতে থাকে।

ছায়া নিয়ে।

অপরাধ নিয়ে।

কোনো রায় ছাড়াই!

হিমু আকরাম: হাইপয়েন্ট স্ট্রিট, নর্থ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র। চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক।

ইমেইল: <[email protected]>,

ফেসবুক: https://www.facebook.com /share/17C40AeSaH/

আরও দেখুন

আমার দেখা জয়শ্রী কবির, আবৃত্তি, অভিনয় ও শিল্পবোধের এক জীবন্ত পাঠ

আমার দেখা জয়শ্রী কবির, আবৃত্তি, অভিনয় ও শিল্পবোধের এক জীবন্ত পাঠ

ক্লাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে তখন শিল্প মানে ছিল দায়, কেবল জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বলেছিলেন, “সেই সময় আমরা জানতাম, ভুল অভিনয় শুধু একটি চরিত্রকে নয়, একটি সময়কেও ভুলভাবে তুলে ধরে।”

১ ঘণ্টা আগে

গল্প: ছায়ানদী

গল্প: ছায়ানদী

দিনগুলো ধীরে এগোল। উরফি মাছ ধরতে যায়। সখিনা রান্না করে। রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়। একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল—আপনি কি কাউকে মেরেছেন? উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—হ্যাঁ। —তাহলে আপনি খারাপ মানুষ। —হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না। এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল।

২ ঘণ্টা আগে

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বাংলাদেশিদের ভবিষ্যৎ: কল্যাণমূলক সুবিধা বিতর্কে ভিসা সংকট

আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

২ দিন আগে

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

স্বাধীনতার স্বাদ, নিয়ন্ত্রণের শিকল: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম

গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

৩ দিন আগে