logo
মতামত

বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

সৈয়দ ইজাজ আহসান১৪ ঘণ্টা আগে
Copied!
বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্ব আজ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর পেছনের কারণ সবারই কমবেশি জানা—ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে ইরানের অনুমতি সাপেক্ষে সীমিত পরিসরে তেল পরিবহন চললেও এর প্রভাব ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ইউএস ডলার ছাড়িয়েছে। এমনকি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে। তেলের দামের সঙ্গে অন্য পণ্যের মূল্য সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর সেই ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হয়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতেই জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। জ্বালানি ছাড়া আধুনিক বিশ্ব একদিনও চলতে পারে না।

যদিও বিকল্প জ্বালানি নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে এখনো তা জীবাশ্ম জ্বালানির কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও এটি স্থায়ী সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

এবার বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা কতটা গভীর। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন—সবই জ্বালানিনির্ভর। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। আমরা যেন ‘সমস্যা হলে দেখা যাবে’—এই মানসিকতায় চলছি। কিন্তু সমস্যা যখন আসে, তখন তা সামাল দেওয়ার মতো অবস্থা থাকে না।

বর্তমান সংকটে স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত ও দোকানপাটের সময় কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনমুখী খাতে সময় কমালে উৎপাদন হ্রাস পাবে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়।

সমাধান কী? বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস হিসেবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ ও কয়লার কথা বলা হলেও এগুলো এখনো খনিজ তেলের কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা গৃহস্থালি, শিল্প ও পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এর মজুদ দ্রুত কমে আসছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।

ধারণা করা হয়, বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে। কিন্তু অনুসন্ধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে আরও সক্রিয় ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে।

অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানি—যেমন সৌর, বায়ু ও বায়োগ্যাস—খাতে গবেষণা ও বিনিয়োগ এখনো অপর্যাপ্ত। অথচ উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, যেগুলোর জন্য বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে এই অসামঞ্জস্য ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের শিখিয়েছে—জ্বালানির সংকট অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলে। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তবে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অনুমান করা কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে প্রধানত দুটি খাতের ওপর নির্ভরশীল—গার্মেন্টস শিল্প ও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হলে কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে আবাসন, পর্যটন ও বিমান পরিবহন খাতে মন্দার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

এই বাস্তবতায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রথমত, দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিকল্প জ্বালানির উন্নয়নে গবেষণা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি সাশ্রয়ে একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি—সংকটকালেই নয়, সব সময়ই সাশ্রয়ী হতে হবে।

বাংলাদেশে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরমাণু শক্তি কেন্দ্র, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল মেধাবী গবেষক রয়েছেন। তাদের সম্পৃক্ত করে জ্বালানি সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।

বর্তমান বিশ্বে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা। এই দুই ক্ষেত্রে সফলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মরুপ্রধান দেশ হয়েও সৌদি আরব ও ওমান যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও এই সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না।

খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি সত্ত্বেও ভোজ্য তেল ও গমের মতো পণ্যে আমদানিনির্ভরতা রয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পেরেছে তার জ্বালানি সম্পদ ও কৃষি উৎপাদনের ওপর ভর করে।

বর্তমান সরকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যা জনকল্যাণে সহায়ক। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া সরাসরি আর্থিক সহায়তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি, খাদ্য ও কর্মসংস্থান খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

সময়ের দাবি—পরিকল্পিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

ড. ইজাজ আহসান: ইমেইল: [email protected]

ফেসবুক: Syed Ahsan

আরও দেখুন

বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আমাদের স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা কতটা গভীর। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প, কৃষি ও পরিবহন—সবই জ্বালানিনির্ভর। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়।

১৪ ঘণ্টা আগে

কবিতা: রোদেলা বৈশাখের ডাক

কবিতা: রোদেলা বৈশাখের ডাক

খর রোদে পথ ক্লান্ত হলেও প্রাণে লাগে গান,/ ঘামের ভেতর লুকিয়ে থাকে জীবনেরই টান।/ পুরোনো সব ঝরে পড়ে শুকনো পাতার মতো,/ নতুন স্বপ্ন ডালে ডালে কাঁপে অচেনা নতো।

১২ দিন আগে

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা

নতুন বছর যুদ্ধহীন হোক, মানবতার জয় হোক, পৃথিবীর সব ভালো মানুষগুলো খুব ভালো থাকুন।

১৩ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির শেষ কোথায়?

মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির শেষ কোথায়?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের কৌশলগত অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। দ্রুত সমাপ্তির পরিকল্পনায় শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত রূপ নিয়েছে।

২২ দিন আগে