
সহিদুল আলম স্বপন

কিছু মানুষ থাকেন, যাদের সঙ্গে কাটানো সময়ের দৈর্ঘ্য নয়, গভীরতাই হয়ে ওঠে স্মৃতির মাপকাঠি। জয়শ্রী কবির ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। আজ যখন তার প্রস্থান সংবাদ হয়ে আসে, তখন হঠাৎ করেই বহু বছর আগের একটি দিনের কথা মনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ‘কথা’ আবৃত্তি চর্চার একটি ক্লাস। যেখানে শিল্প যেন শুধু শেখার বিষয় ছিল না, বরং অনুভব করার এক নীরব সাধনা।
সময়টা নব্বই দশকের শেষের দিকে। আমি কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সদস্য। বলে রাখি আমি থিয়েটার স্কুল তথা থিয়েটারেরও একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। যা আমি বিদেশ–বিভুঁয়ে জেনেভা ইংলিশ ড্রামা সোসাইটির সাথে জাগিয়ে রেখেছিলাম অনেক দিন।
যাক সে কথা, যা বলছিলাম, তখন টিএসসি মানেই ছিল সংস্কৃতির এক উন্মুক্ত পাঠশালা। কেউ আসে নাটকের টানে, কেউ গানের, কেউ কবিতার। কথা আবৃত্তির ক্লাসগুলোও ছিল তেমনই অনানুষ্ঠানিক, কিন্তু গভীর মনোযোগে ভরা। সেই সময় আমাদের ক্লাস নিতেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আসাদ চৌধুরী, শামসুর রাহমান, কাজী আরিফ, শিমুল মোস্তফাসহ আরও প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি কথা আবৃত্তি চর্চার প্রধান, তিনি নিজেই একজন শক্তিমান আবৃত্তিশিল্পী, যার কণ্ঠে ছিল নাটকীয়তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং শব্দের প্রতি প্রবল দায়বদ্ধতা।
একদিন জানানো হলো আজকের ক্লাসটি বিশেষ। বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও ‘মিস ক্যালকাটা’ খ্যাত জয়শ্রী কবির উপস্থিত থাকবেন। শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন শিল্পী হিসেবে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। খবরটা শুনেই ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। বড় পর্দায় দেখা মানুষকে সামনে থেকে দেখার কৌতূহল যেমন ছিল, তেমনি ছিল তার কাছ থেকে কিছু শেখার নীরব প্রত্যাশা। বলাবাহুল্য ১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেত্রী ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ উপাধি লাভ করেন।
১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে চলচ্চিত্র জগতে তার পথচলা শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। জয়শ্রী কবিরের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশ। ‘সূর্য কন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে তিনি ঢাকায় আসেন এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে বাংলাদেশেই স্থায়ী হন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জয়শ্রী-বুলবুল আহমেদ জুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এই জুটির ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘মোহনা’, ‘পুরস্কার’ ও ‘রূপালি সৈকতে’–এর মতো সিনেমাগুলো আজও দর্শকদের মনে দাগ কেটে আছে।
তিনি যখন টিএসসির সেই পরিচিত ঘরটিতে প্রবেশ করলেন, তখন কোনো আলোর ঝলকানি বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। খুব সাধারণভাবে, শান্ত ভঙ্গিতে এসে বসেছিলেন। পরনে শাড়ি, চোখেমুখে গভীর প্রশান্তি। তাকে দেখেই মনে হয়েছিল এই মানুষটি আলোচনায় নয়, উপস্থিতিতেই আলাদা। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ক্লাস শুরু করলেন আবৃত্তি ও অভিনয়ের সম্পর্ক নিয়ে। তিনি বলছিলেন, “আবৃত্তি কখনোই অভিনয় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে এটা মঞ্চের অভিনয় নয়, এটা কণ্ঠের অভিনয়।”
এই কথার সূত্র ধরেই জয়শ্রী কবির কথা বলতে শুরু করলেন। তার কণ্ঠ ছিল নরম, কিন্তু প্রতিটি শব্দ ছিল স্পষ্ট ও ওজনদার। তিনি বলেছিলেন, “আমি যখন সিনেমায় কাজ করেছি, তখন দেখেছি সংলাপ বলা আর সংলাপ অনুভব করা এক নয়। আবৃত্তিও ঠিক তাই।”
এক মুহূর্তেই ক্লাসটি যেন অন্য মাত্রা পেয়ে গেল।
আমাদের কয়েকজনকে কবিতা আবৃত্তি করতে বলা হলো। কেউ জীবনানন্দ, কেউ শামসুর রাহমান। আবৃত্তির পর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় কারিগরি দিকগুলো ধরিয়ে দিচ্ছিলেন উচ্চারণ, ছন্দ, শ্বাস।
আমার ভাগ্যে জুটেছিল শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ আবৃত্তি করার। আমার আবৃত্তি শেষে “স্বাধীনতা তুমি/ বাগানের ঘর, কোকিলের গান,/ বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/ যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।”
জয়শ্রী কবির যুক্ত করলেন অনুভবের জায়গাটি। তিনি একসময় আমার আবৃত্তি নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এই লাইনে তুমি চরিত্রে ঢোকোনি। তুমি শুধু পাঠক হিসেবে থেকেছ।” আমার কি যে ভালো লাগছিল আমার ভুল তিনি ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।
এই একটি মন্তব্যেই বুঝেছিলাম তিনি আবৃত্তিকে অভিনেতার চোখ দিয়েই দেখছেন।
একটি বিশেষ মুহূর্ত আজও খুব স্পষ্ট মনে আছে। একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা পড়ছিলেন বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে। পড়া শেষে জয়শ্রী কবির মৃদু হাসলেন এবং বললেন, “অভিনয় করছ ঠিকই, কিন্তু নিজের জন্য করছ। শ্রোতার জন্য নয়।”
তারপর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ করলেন, “এটাই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের জায়গা। আবৃত্তিতে অভিনয় থাকবে, কিন্তু সেটা যেন শব্দের ওপরে না উঠে যায়।”
এই কথোপকথন আমাদের সামনে যেন এক জীবন্ত পাঠ হয়ে উঠেছিল আবৃত্তি আর অভিনয়ের সীমারেখা কোথায়, আর সেই সীমা কীভাবে সম্মানের সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়।
একপর্যায়ে জয়শ্রী কবির নিজেই একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে পড়েননি, কোনো নাটকীয় ভঙ্গিও নেননি। শুধু বসে বসে, শান্ত কণ্ঠে কবিতাটি পড়েছিলেন। কিন্তু সেই আবৃত্তিতে এমন এক দৃশ্যমানতা ছিল, যা চোখ বুজলেও ছবি তৈরি করছিল। তখনই উপলব্ধি হয়েছিল এটাই আসলে অভিনয়, যেখানে বাহুল্য নেই, কিন্তু উপস্থিতি প্রবল।
তিনি আমাদের বলেছিলেন, “অভিনয় মানে অঙ্গভঙ্গি নয়। অভিনয় মানে সত্যতা। আবৃত্তিতেও তাই।”
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, “আপনি যেটা বললেন, সেটাই আসলে ‘ইনার অ্যাকশন’।”
এই শব্দদ্বয় ইনার অ্যাকশন সেদিন আমাদের কাছে নতুন ছিল। কিন্তু জয়শ্রী কবির সেটাকে সহজ করে বুঝিয়েছিলেন।
“ভেতরে কিছু না ঘটলে বাইরে কিছু দেখানো বৃথা।”
এই কথাটি আমার শিল্পচর্চার দর্শনই বদলে দিয়েছিল।

ক্লাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে তখন শিল্প মানে ছিল দায়, কেবল জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বলেছিলেন, “সেই সময় আমরা জানতাম, ভুল অভিনয় শুধু একটি চরিত্রকে নয়, একটি সময়কেও ভুলভাবে তুলে ধরে।”
এই দায়বদ্ধতার জায়গাটাই তাকে আমাদের চোখে আরও বড় করে তুলেছিল।
ক্লাসের ফাঁকে কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি তো বড় অভিনেত্রী, আবৃত্তির সঙ্গে আপনার এই গভীর সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো?”
তিনি একটু হেসে বলেছিলেন, “আমি আগে শ্রোতা। ভালো করে শুনতে না পারলে ভালো করে বলাও যায় না।”
এই উত্তরটাও যেন একটি ক্লাস ছিল।
কথা প্রসঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে চলচ্চিত্র তখন শুধুই বিনোদন নয়, বরং একটি দায়বদ্ধ শিল্প হয়ে উঠেছিল। কীভাবে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের সৌন্দর্যের চেয়েও দায়িত্বকে বড় করে দেখতে শিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “নারীর মুখ মানেই শুধু সাজ নয়, সেখানে সময়ের গল্পও থাকে।”
এই কথাগুলো আমাদের মতো তরুণদের ভেতরে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।
সেদিনের ক্লাস শেষে কেউ ছবি তুলতে এগিয়ে আসেনি। কেউ অটোগ্রাফ চায়নি। সবাই যেন অদ্ভুত এক নীরব শ্রদ্ধায় তাকে ঘিরে ছিল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “চর্চা চালিয়ে যেও। শিল্প কখনো তাড়াহুড়া পছন্দ করে না।”
তারপর তিনি চলে গিয়েছিলেন। খুব সাধারণভাবে। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার পরও টিএসসি চত্বর যেন অনেকক্ষণ নীরব ছিল।
আজ অনেক বছর পর যখন এই কথাগুলো লিখছি, বুঝতে পারছি জয়শ্রী কবিরকে আমি শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে দেখিনি। আমি তাকে দেখেছি একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন শিল্পদর্শী হিসেবে। আর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেই যৌথ ক্লাস ছিল আবৃত্তি ও অভিনয়ের সম্পর্ক বোঝার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
আজ জয়শ্রী কবির নেই। কিন্তু টিএসসির সেই ঘর, সেই ক্লাস, সেই কথাগুলো আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে। তিনি আমার কাছে শুধু স্মৃতির মানুষ নন তিনি আমার শিল্পচর্চার মানসপটে একটি নীরব আলো।
তাকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]

কিছু মানুষ থাকেন, যাদের সঙ্গে কাটানো সময়ের দৈর্ঘ্য নয়, গভীরতাই হয়ে ওঠে স্মৃতির মাপকাঠি। জয়শ্রী কবির ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। আজ যখন তার প্রস্থান সংবাদ হয়ে আসে, তখন হঠাৎ করেই বহু বছর আগের একটি দিনের কথা মনে পড়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ‘কথা’ আবৃত্তি চর্চার একটি ক্লাস। যেখানে শিল্প যেন শুধু শেখার বিষয় ছিল না, বরং অনুভব করার এক নীরব সাধনা।
সময়টা নব্বই দশকের শেষের দিকে। আমি কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্রের সদস্য। বলে রাখি আমি থিয়েটার স্কুল তথা থিয়েটারেরও একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। যা আমি বিদেশ–বিভুঁয়ে জেনেভা ইংলিশ ড্রামা সোসাইটির সাথে জাগিয়ে রেখেছিলাম অনেক দিন।
যাক সে কথা, যা বলছিলাম, তখন টিএসসি মানেই ছিল সংস্কৃতির এক উন্মুক্ত পাঠশালা। কেউ আসে নাটকের টানে, কেউ গানের, কেউ কবিতার। কথা আবৃত্তির ক্লাসগুলোও ছিল তেমনই অনানুষ্ঠানিক, কিন্তু গভীর মনোযোগে ভরা। সেই সময় আমাদের ক্লাস নিতেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আসাদ চৌধুরী, শামসুর রাহমান, কাজী আরিফ, শিমুল মোস্তফাসহ আরও প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি কথা আবৃত্তি চর্চার প্রধান, তিনি নিজেই একজন শক্তিমান আবৃত্তিশিল্পী, যার কণ্ঠে ছিল নাটকীয়তার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং শব্দের প্রতি প্রবল দায়বদ্ধতা।
একদিন জানানো হলো আজকের ক্লাসটি বিশেষ। বাংলা চলচ্চিত্রের এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও ‘মিস ক্যালকাটা’ খ্যাত জয়শ্রী কবির উপস্থিত থাকবেন। শুধু একজন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন শিল্পী হিসেবে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। খবরটা শুনেই ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। বড় পর্দায় দেখা মানুষকে সামনে থেকে দেখার কৌতূহল যেমন ছিল, তেমনি ছিল তার কাছ থেকে কিছু শেখার নীরব প্রত্যাশা। বলাবাহুল্য ১৯৫২ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই অভিনেত্রী ১৯৬৮ সালে ‘মিস ক্যালকাটা’ উপাধি লাভ করেন।
১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে চলচ্চিত্র জগতে তার পথচলা শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘অসাধারণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। জয়শ্রী কবিরের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশ। ‘সূর্য কন্যা’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে তিনি ঢাকায় আসেন এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কবিরকে বিয়ে করে বাংলাদেশেই স্থায়ী হন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জয়শ্রী-বুলবুল আহমেদ জুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এই জুটির ‘সীমানা পেরিয়ে’, ‘মোহনা’, ‘পুরস্কার’ ও ‘রূপালি সৈকতে’–এর মতো সিনেমাগুলো আজও দর্শকদের মনে দাগ কেটে আছে।
তিনি যখন টিএসসির সেই পরিচিত ঘরটিতে প্রবেশ করলেন, তখন কোনো আলোর ঝলকানি বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। খুব সাধারণভাবে, শান্ত ভঙ্গিতে এসে বসেছিলেন। পরনে শাড়ি, চোখেমুখে গভীর প্রশান্তি। তাকে দেখেই মনে হয়েছিল এই মানুষটি আলোচনায় নয়, উপস্থিতিতেই আলাদা। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ক্লাস শুরু করলেন আবৃত্তি ও অভিনয়ের সম্পর্ক নিয়ে। তিনি বলছিলেন, “আবৃত্তি কখনোই অভিনয় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তবে এটা মঞ্চের অভিনয় নয়, এটা কণ্ঠের অভিনয়।”
এই কথার সূত্র ধরেই জয়শ্রী কবির কথা বলতে শুরু করলেন। তার কণ্ঠ ছিল নরম, কিন্তু প্রতিটি শব্দ ছিল স্পষ্ট ও ওজনদার। তিনি বলেছিলেন, “আমি যখন সিনেমায় কাজ করেছি, তখন দেখেছি সংলাপ বলা আর সংলাপ অনুভব করা এক নয়। আবৃত্তিও ঠিক তাই।”
এক মুহূর্তেই ক্লাসটি যেন অন্য মাত্রা পেয়ে গেল।
আমাদের কয়েকজনকে কবিতা আবৃত্তি করতে বলা হলো। কেউ জীবনানন্দ, কেউ শামসুর রাহমান। আবৃত্তির পর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় কারিগরি দিকগুলো ধরিয়ে দিচ্ছিলেন উচ্চারণ, ছন্দ, শ্বাস।
আমার ভাগ্যে জুটেছিল শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ আবৃত্তি করার। আমার আবৃত্তি শেষে “স্বাধীনতা তুমি/ বাগানের ঘর, কোকিলের গান,/ বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/ যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।”
জয়শ্রী কবির যুক্ত করলেন অনুভবের জায়গাটি। তিনি একসময় আমার আবৃত্তি নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “এই লাইনে তুমি চরিত্রে ঢোকোনি। তুমি শুধু পাঠক হিসেবে থেকেছ।” আমার কি যে ভালো লাগছিল আমার ভুল তিনি ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।
এই একটি মন্তব্যেই বুঝেছিলাম তিনি আবৃত্তিকে অভিনেতার চোখ দিয়েই দেখছেন।
একটি বিশেষ মুহূর্ত আজও খুব স্পষ্ট মনে আছে। একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা পড়ছিলেন বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে। পড়া শেষে জয়শ্রী কবির মৃদু হাসলেন এবং বললেন, “অভিনয় করছ ঠিকই, কিন্তু নিজের জন্য করছ। শ্রোতার জন্য নয়।”
তারপর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ করলেন, “এটাই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণের জায়গা। আবৃত্তিতে অভিনয় থাকবে, কিন্তু সেটা যেন শব্দের ওপরে না উঠে যায়।”
এই কথোপকথন আমাদের সামনে যেন এক জীবন্ত পাঠ হয়ে উঠেছিল আবৃত্তি আর অভিনয়ের সীমারেখা কোথায়, আর সেই সীমা কীভাবে সম্মানের সঙ্গে অতিক্রম করতে হয়।
একপর্যায়ে জয়শ্রী কবির নিজেই একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে পড়েননি, কোনো নাটকীয় ভঙ্গিও নেননি। শুধু বসে বসে, শান্ত কণ্ঠে কবিতাটি পড়েছিলেন। কিন্তু সেই আবৃত্তিতে এমন এক দৃশ্যমানতা ছিল, যা চোখ বুজলেও ছবি তৈরি করছিল। তখনই উপলব্ধি হয়েছিল এটাই আসলে অভিনয়, যেখানে বাহুল্য নেই, কিন্তু উপস্থিতি প্রবল।
তিনি আমাদের বলেছিলেন, “অভিনয় মানে অঙ্গভঙ্গি নয়। অভিনয় মানে সত্যতা। আবৃত্তিতেও তাই।”
ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, “আপনি যেটা বললেন, সেটাই আসলে ‘ইনার অ্যাকশন’।”
এই শব্দদ্বয় ইনার অ্যাকশন সেদিন আমাদের কাছে নতুন ছিল। কিন্তু জয়শ্রী কবির সেটাকে সহজ করে বুঝিয়েছিলেন।
“ভেতরে কিছু না ঘটলে বাইরে কিছু দেখানো বৃথা।”
এই কথাটি আমার শিল্পচর্চার দর্শনই বদলে দিয়েছিল।

ক্লাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে তখন শিল্প মানে ছিল দায়, কেবল জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বলেছিলেন, “সেই সময় আমরা জানতাম, ভুল অভিনয় শুধু একটি চরিত্রকে নয়, একটি সময়কেও ভুলভাবে তুলে ধরে।”
এই দায়বদ্ধতার জায়গাটাই তাকে আমাদের চোখে আরও বড় করে তুলেছিল।
ক্লাসের ফাঁকে কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনি তো বড় অভিনেত্রী, আবৃত্তির সঙ্গে আপনার এই গভীর সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো?”
তিনি একটু হেসে বলেছিলেন, “আমি আগে শ্রোতা। ভালো করে শুনতে না পারলে ভালো করে বলাও যায় না।”
এই উত্তরটাও যেন একটি ক্লাস ছিল।
কথা প্রসঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে চলচ্চিত্র তখন শুধুই বিনোদন নয়, বরং একটি দায়বদ্ধ শিল্প হয়ে উঠেছিল। কীভাবে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের সৌন্দর্যের চেয়েও দায়িত্বকে বড় করে দেখতে শিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “নারীর মুখ মানেই শুধু সাজ নয়, সেখানে সময়ের গল্পও থাকে।”
এই কথাগুলো আমাদের মতো তরুণদের ভেতরে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।
সেদিনের ক্লাস শেষে কেউ ছবি তুলতে এগিয়ে আসেনি। কেউ অটোগ্রাফ চায়নি। সবাই যেন অদ্ভুত এক নীরব শ্রদ্ধায় তাকে ঘিরে ছিল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “চর্চা চালিয়ে যেও। শিল্প কখনো তাড়াহুড়া পছন্দ করে না।”
তারপর তিনি চলে গিয়েছিলেন। খুব সাধারণভাবে। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার পরও টিএসসি চত্বর যেন অনেকক্ষণ নীরব ছিল।
আজ অনেক বছর পর যখন এই কথাগুলো লিখছি, বুঝতে পারছি জয়শ্রী কবিরকে আমি শুধু একজন অভিনেত্রী হিসেবে দেখিনি। আমি তাকে দেখেছি একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন শিল্পদর্শী হিসেবে। আর ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেই যৌথ ক্লাস ছিল আবৃত্তি ও অভিনয়ের সম্পর্ক বোঝার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
আজ জয়শ্রী কবির নেই। কিন্তু টিএসসির সেই ঘর, সেই ক্লাস, সেই কথাগুলো আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে। তিনি আমার কাছে শুধু স্মৃতির মানুষ নন তিনি আমার শিল্পচর্চার মানসপটে একটি নীরব আলো।
তাকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
লেখক সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: [email protected]
ক্লাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথাও বলেছিলেন। কীভাবে তখন শিল্প মানে ছিল দায়, কেবল জনপ্রিয়তা নয়। তিনি বলেছিলেন, “সেই সময় আমরা জানতাম, ভুল অভিনয় শুধু একটি চরিত্রকে নয়, একটি সময়কেও ভুলভাবে তুলে ধরে।”
দিনগুলো ধীরে এগোল। উরফি মাছ ধরতে যায়। সখিনা রান্না করে। রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়। একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল—আপনি কি কাউকে মেরেছেন? উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—হ্যাঁ। —তাহলে আপনি খারাপ মানুষ। —হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না। এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল।
আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গণতন্ত্রের উত্তরণ মানে কেবল নির্বাচন বা ক্ষমতার রদবদল নয়। এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং নাগরিকের জানার অধিকার। গণমাধ্যম যদি এই দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রও খোঁড়া হয়ে পড়ে।

দিনগুলো ধীরে এগোল। উরফি মাছ ধরতে যায়। সখিনা রান্না করে। রাতে আকাশের ছাদের নিচে বসে তারা নীরবতা ভাগ করে নেয়। একদিন সখিনা জিজ্ঞেস করল—আপনি কি কাউকে মেরেছেন? উরফি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—হ্যাঁ। —তাহলে আপনি খারাপ মানুষ। —হয়তো। কিন্তু আমি আর খারাপ থাকতে চাই না। এই কথাটার ভেতরেই ভালোবাসা ঢুকে পড়ল।
২ ঘণ্টা আগে