logo
মতামত

ফ্রান্সের পথে পথে: বইয়ের আলো, স্বপ্নের ডাক

শাহাবুদ্দিন শুভ
শাহাবুদ্দিন শুভ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Copied!
ফ্রান্সের পথে পথে: বইয়ের আলো, স্বপ্নের ডাক

ইউরোপের অনেক কিছুই বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয়। কিন্তু ফ্রান্সের রাস্তায় বই রেখে যাওয়ার এই অভ্যাস আমার মনে অন্যরকম আলো জ্বালায়। নেই কোনো তালা, নেই ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা—আছে কেবল বিশ্বাস। মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো সেতু গড়ে উঠেছে মানুষ আর জ্ঞানের ভাণ্ডারের মাঝে। এই দৃশ্য দেখে বারবার মনে হয়েছে—যদি এমন সহজলভ্য পাঠাভ্যাস আমাদের দেশেও থাকত!

আমার শৈশবও বইয়ের গন্ধে ভরা ছিল, যদিও সেখানে ছিল না এমন স্বাধীনতা। গ্রাম্যজীবনে পত্রিকার আভাস পেতাম নুরুজ চাচার বাড়িতে। বিকেল গড়িয়ে তবে পৌঁছাত সেই খবরের কাগজ। তবুও আমার চোখ ছুটত শব্দের জগতে। ক্লাস ফোরে থাকতেই প্রতিদিন বিকেলের নেশা হয়ে উঠল পত্রিকা পড়া। পরের বছর, ক্লাস ফাইভে উঠেই, সেই নেশা আরও গভীর হলো।

বাজারের লুৎফর চাচার দোকান ছিল যেন আমার ছোট্ট পাঠাগার। সেখানে রাখা থাকত নানা গ্রাম থেকে আসা পত্রিকা। আমি বসে যেতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যেন সময় থমকে গেছে কেবল আমার জন্য। পরে গোপলার বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনে প্রতিষ্ঠিত হলো।

গোপলা বাজার গণকেন্দ্র পাঠাগার

আমি তখন এর প্রথম দিকের সদস্যদের একজন। এক সপ্তাহের জন্য বই হাতে পেতাম, আর সেই বই আমার পৃথিবী হয়ে উঠত। এত পড়ে ফেলতাম যে, পাঠকের তালিকায় আমার নাম উঠে আসত সবার ওপরে। বাবার চোখে এটি ছিল বেহুদা আসক্তি—কিন্তু আমার কাছে এটি ছিল এক অন্তহীন অভিযাত্রা।

Book France  2

কলেজে গিয়ে বইয়ের টান আরও বাড়ল। সুজন লাইব্রেরি থেকে টাকা দিয়ে বই ভাড়া নিতাম। শর্ত ছিল—একটি দাগও যেন না পড়ে। সেই যত্নে পড়তে পড়তে বই আমার কাছে হয়ে উঠল সাথী, পথপ্রদর্শক, শিক্ষক। কবিতা লেখা শুরু করলাম, ১৯৯৭ সালেই বাংলাদেশ বেতার সিলেটে প্রচার হলো আমার প্রথম কবিতা। ভাবলে অবাক লাগে—সবই বই পড়ার অভ্যাসের ফল।

এখন ফ্রান্সে এসে দেখি, বই এখানে জীবনেরই অংশ। মেট্রোতে কিংবা দূরপাল্লার ট্রেনে মানুষজনের হাতে বই—অসংখ্য গল্প, জ্ঞানের খণ্ড, বা কোনো দার্শনিক চিন্তার ভ্রমণসঙ্গী। কোলাহলময় পরিবেশে তারা ডুবে থাকে অন্য জগতে। শিশুরা শিখে যায়, শিক্ষা মানে কেবল পাঠ্যবই নয়। রাস্তার পাশে রাখা বই, লাইব্রেরির সহজ প্রবেশাধিকার, কিংবা স্কুলে পাঠচর্চার সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে সমাজে জ্ঞানের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে।

আমাদের দেশে এখনো সেই স্বপ্ন দূরবর্তী। তবু আমি বিশ্বাস করি—স্কুল, কলেজ কিংবা বাজারকেন্দ্রিক ছোট ছোট পাঠাগার গড়ে তুলতে পারলে আমরাও পরিবর্তনের পথ ধরতে পারব। কল্পনা করি, হয়তো কোনো একদিন বাংলাদেশের কোনো শিশু রাস্তায় দাঁড়িয়ে হঠাৎই একটি বই হাতে তুলে নেবে—কোনো প্রশ্ন ছাড়াই, কেবল পাঠের টানে।

এই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না জানি না। তবে আমি জানি, স্বপ্ন না দেখলে কোনো বড় পরিবর্তন আসে না। বড় কিছুর শুরু সবসময়ই হয়—একটি স্বপ্ন দিয়ে।

*শাহাবুদ্দিন শুভ: ফ্রান্সপ্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক। ইমেইল: <[email protected]>

আরও দেখুন

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডেগ বাণিজ্য এবং ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার

ডিসি সারওয়ার আলমের মতো অফিসার কম, তবে শূন্য নয়। তিনি নিজেই একটা ব্র্যান্ড। সুতরাং তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তিনি এক সময় ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে বহু অসাধু ব্যবসায়ীকে জেলে পুরেছেন।

০৪ জুলাই ২০২৬

কিংবদন্তির জন্ম

কিংবদন্তির জন্ম

পেলে জানে হাজার মাইল দূরে তার বাবা অন্যের টেলিভিশনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের খেলা দেখছেন। অথবা রেডিওতে ধারাবিবরণী শুনছেন। পেলের মনে আছে আট বছর আগে কীভাবে তার বাবা কেঁদেছিলেন। সে তার বাবাকে এবারও কাঁদাতে চায়, তবে এবার যেন সেই অশ্রু হয় আনন্দের। গর্বের। স্বপ্ন পূরণের।

০৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

বাংলাদেশ থেকে জেদ্দা: ২৮ বছরের এক প্রবাসযাত্রায় মানুষের পাশে থাকার গল্প

প্রবাসজীবনের প্রথম দিকের সংগ্রাম তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব, যা পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

০২ জুলাই ২০২৬

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

চলে গেছেন খামেনি, ইরান থামেনি: নতুন বাস্তবতা ও শান্তি চুক্তির পূর্বাপর

ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকটই একটি চুক্তির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে শেষ হয়নি। বর্তমান সমঝোতাও তার ব্যতিক্রম হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আগের অবস্থায় আর ফিরবে না।

০২ জুলাই ২০২৬