logo
মতামত

স্বৈরাচার, সংকট বা চাঁদাবাজি নয়—দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা০৮ নভেম্বর ২০২৫
Copied!
স্বৈরাচার, সংকট বা চাঁদাবাজি নয়—দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল দেশকে অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের পথে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, দমননীতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের ভিত্তি আজ নড়বড়ে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ ধীরে ধীরে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে, সংবাদমাধ্যম শৃঙ্খলিত হয়, আর জনগণের কণ্ঠরোধ করা হয় নির্মমভাবে। এই শাসন শুধু বর্তমান প্রজন্মের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করেছে।

মানুষের মধ্যে ক্ষমতার লালসা প্রাচীন প্রবণতা হলেও, তা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিণত হয়, তখন সমাজে ন্যায়বোধ, নৈতিকতা ও স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনার শাসনকাল এই বাস্তবতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখে তিনি জনগণের অধিকারকে প্রায় ১৬ বছর ধরে অবমাননা করেছেন।

গুম, খুন, ভুয়া মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের নীতি রাষ্ট্রযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। হাসিনা পরিবারের ক্ষমতালিপ্সা দেশকে স্বৈরতন্ত্রের অন্ধগলিতে নিয়ে যায়। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই শাসনব্যবস্থা জাতির চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। অবশেষে যখন জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনার পতন ঘটে—এটি এমন এক মুহূর্ত যা জাতির আত্মমর্যাদার পুনর্জন্মের প্রতীক।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঐতিহাসিক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তিস্তা চুক্তির অনিশ্চয়তা, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যু, এবং ভারতের বাণিজ্যিক একচেটিয়াত্ব—সবই জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

জনগণ এখন বুঝেছে—এই সম্পর্ক পারস্পরিক নয়, বরং একতরফা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রতিবেশীর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের নীতি আর টেকসই নয়। প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যা সাহসী, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ও কূটনৈতিক দক্ষতায় দেশকে আত্মনির্ভর পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।

শেখ হাসিনার আমলে রাজনীতি পরিণত হয়েছিল ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে। সংবিধান বিকৃত করে, নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে, প্রশাসনকে দলীয়করণের মাধ্যমে তিনি একদলীয় স্বৈরাচার কায়েম করেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিচার বিভাগ—সবকিছু ব্যবহৃত হয়েছিল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার অস্ত্র হিসেবে। ফলে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে, নির্বাচন পরিণত হয় পূর্বনির্ধারিত নাটকে।

দুর্নীতি ও কালো টাকার দাপটে অর্থনীতি দমবন্ধ হয়ে পড়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়; ভিন্নমত মানে নিপীড়ন, গুম বা কারাবাস। বিচার বিভাগ ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হয়। এ কেবল রাজনৈতিক নয়, এক গভীর নৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটও বটে।

তবে আশার আলো জ্বলছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। পরিবর্তনের শক্তি, উদ্ভাবনের ক্ষমতা ও ন্যায়ের অঙ্গীকার তাদের হাতেই। এই শক্তিকে সংগঠিত করতেই গড়ে উঠছে ফিউচার ফাউন্ডেশন অফ বাংলাদেশ—একটি আন্দোলন, একটি স্বপ্ন এবং একটি দায়িত্ববোধ। এই ফাউন্ডেশন তরুণদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ইতিহাসের সত্য শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে, নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে এবং সমাজে ন্যায় ও মানবিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।

আজ দেশের নেতৃত্বে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ দমনমূলক শাসনের অবসানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে তার নেতৃত্বে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের নৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এই সরকারের লক্ষ্য—সুষ্ঠু নির্বাচন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার।

বাংলাদেশ আজ এক নতুন সূচনার দোরগোড়ায়। দমন ও বিভাজনের অন্ধ অধ্যায় পেরিয়ে জাতি আজ নতুন আলো দেখছে। কিন্তু এই আলোর পথ সহজ নয়। পরিবর্তনের যাত্রা টেকসই করতে হলে আত্মসমালোচনার সাহস থাকতে হবে—কে কোথায় ভুল করেছে, কেন ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।

দেশের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ তরুণ, কিন্তু বেকারত্বও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই তরুণ শক্তি যদি সঠিক পথে সংগঠিত না হয়, তবে তা দুর্নীতি ও দলীয় স্বার্থের বলি হতে পারে। সামাজিক বিভাজন, প্রতিবেশী প্রভাব ও বিভ্রান্তিকর ডিজিটাল প্রচারণার ভিড়ে তরুণ সমাজ আজ এক জটিল দ্বন্দ্বে।

তবু আশা হারানোর সময় নয়। ঐক্যবদ্ধ জাতি ও সৎ নেতৃত্বের হাতে সংকট কখনো অজেয় নয়। বাংলাদেশ প্রমাণ করবে—সংকট পরাজয়ের নয়, এটি নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

মানি লন্ডারিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

মানি লন্ডারিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কূটনৈতিক মিশনগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এগুলোকে আর্থিক গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে হবে।

২ দিন আগে

ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি: মাটির দেহ পায় না মাটির স্পর্শ

ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি: মাটির দেহ পায় না মাটির স্পর্শ

এই মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আমাদের সমাজের, আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কেন একটি তরুণকে জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে বিদেশ যেতে হয়? কেন সে বিশ্বাস করে যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বিদেশে যাওয়া তার জন্য একমাত্র পথ?

২ দিন আগে

ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?

ঈদের সড়কযাত্রা: আনন্দ না মৃত্যু ফাঁদ?

দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা মানুষের মনে এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের জন্ম দিচ্ছে—যা শুধু আজ নয়, আগামী দিনগুলোতেও আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।

৬ দিন আগে

কবিতা: তোমার ফিরে আসা

কবিতা: তোমার ফিরে আসা

এইভাবেই তুমি কি/ আমার কষ্ট কিংবা সুখের/ অংশীদার হয়ে থাকবে?/ আর কিছুই চাই না তার চেয়ে বেশি।

৭ দিন আগে