logo
মতামত

এসসিও সম্মেলন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া

সহিদুল আলম  স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
Copied!
এসসিও সম্মেলন: যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া
চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে কথা বলছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (বাঁয়ে), ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (মাঝে) এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং (ডানে)। ছবি: রয়টার্স

২০২৫ সালের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) সম্মেলন ভারতের জন্য ছিল এক অনন্য কূটনৈতিক মঞ্চ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘ ৭ বছরের পর চীন সফর, সেখানে সি চিন পিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উপস্থিতি—এসব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন এক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার পর ভারতের এই ঝুঁকে পড়া কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা? নাকি এটি কেবল ভারতের বহুস্তরীয় কূটনৈতিক কৌশলেরই যৌক্তিক বহিঃপ্রকাশ?

ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রেক্ষাপট

১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ক্রমশ উষ্ণ হয়েছে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি—সবখানেই সহযোগিতা বেড়েছে। কোয়াড (Quad) গঠনে ভারতের ভূমিকা ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে ভারতের অবস্থান বহু দিনের। কিন্তু আমেরিকার সাম্প্রতিক শুল্কনীতি, বিশেষ করে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ, দিল্লিকে গভীরভাবে হতাশ করেছে।

ভারতের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র কেবল সহযোগী নয়, বরং প্রায়শই চাপ প্রয়োগকারী শক্তি হিসেবেও সামনে এসেছে। বাণিজ্য ঘাটতি, প্রতিরক্ষা ক্রয়, এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের চাপ প্রায়শই একতরফা মনে হয়েছে। ফলে ভারত কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।

চীনের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন নতুন বাস্তবতা

ভারত–চীন সম্পর্ক গত দশকে বরাবরই সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে উত্তপ্ত ছিল। গালওয়ান সংঘর্ষ দুই দেশের আস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। তবুও, বাস্তবতা হলো—চীন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার। প্রযুক্তি, উৎপাদন, অবকাঠামো—সবখানেই চীনের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এসসিওতে ভারতের সক্রিয় উপস্থিতি কেবল প্রতীকী নয়, বরং কৌশলগত। সীমান্তে শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও দিল্লি বুঝতে পারছে, চীনকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক সমীকরণ সাজানো সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারত কূটনৈতিক মঞ্চে নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাইছে।

এসসিওর ভূরাজনীতি ভারতের অবস্থান

এসসিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে পাকিস্তানও সদস্য। ফলে ভারতের উপস্থিতি অনেক সময়ে ‘বেমানান’ মনে হলেও বাস্তবে এটি ভারতের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ভারসাম্য। ভারত এখানে দুই দিক থেকে ভূমিকা রাখছে।

এক. চীন–রাশিয়া–পাকিস্তান জোটের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিহত করা।

দুই. আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান জোরালো করা।

তিন. কখনো কখনো ভারত যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর না করায় বিতর্ক তৈরি হলেও এটি ভারতের স্বাধীন অবস্থানেরই প্রমাণ।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া

ওয়াশিংটন থেকে স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া এসেছে—ভারত, চীন, রাশিয়াকে ‘bad actors’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তবে একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী যে, দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠিত হতে পারে। এর মানে হলো, ওয়াশিংটন দিল্লির এই কূটনৈতিক খেলা বুঝছে, কিন্তু তাতে অস্বস্তিও প্রকাশ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারতকে চীনের প্রতিরোধে কৌশলগত সহযোগী হিসেবে রাখতে। কিন্তু ভারত যদি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের শিবিরে বাধা পড়ে যায়, তবে তার স্বার্থসিদ্ধি সীমিত হয়ে যাবে। এই কারণেই দিল্লি বহুমাত্রিক কূটনীতিকে বেছে নিচ্ছে।

বিশ্বাসঘাতকতার যুক্তি

অনেকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতকে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক সুযোগ দিয়েছে, তখন চীনের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া আসলেই বিশ্বাসঘাতকতা। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চোখে ‘পিঠে ছুরি মারা’র মতো। বিশেষ করে কোয়াড ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পদক্ষেপ অনেককে হতাশ করেছে।

এ ছাড়া, সীমান্ত সংঘর্ষে চীনের বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান ভারত নিয়েছিল, সেটি হঠাৎ পরিবর্তিত হওয়া অনেকের চোখে অসঙ্গতিপূর্ণ।

কৌশলগত বাস্তবতার যুক্তি

অন্যদিকে বাস্তবতাকে বিবেচনা করলে ভারতের এই পদক্ষেপ অনেকটাই যৌক্তিক। বহু ধ্রুববিশ্বে একক মিত্রের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে বৈচিত্র্যময় বাজার ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
নিরাপত্তার স্বার্থে পাকিস্তান–চীন অক্ষকে প্রতিহত করতে ভারতের ভেতরে থেকেই প্রভাব বিস্তার জরুরি। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি ত্যাগ না করে, চীনের দিকেও সাময়িক ঝুঁকে ভারসাম্য রক্ষা করাই ভারতের মূল কৌশল।

‘বিশ্বাসঘাতকতা’ শব্দটি অনেকটা আবেগপ্রবণ। বাস্তবতায় ভারত তার সার্বভৌম স্বার্থ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। ওয়াশিংটনকে এটি তিক্ত লাগলেও দিল্লির কাছে এটি কূটনৈতিক স্বনির্ভরতারই বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং, ভারতের এই ঝুঁকে পড়াকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা ঠিক নয়; বরং এটি কৌশলগত বাস্তবতায় চালিত একটি অপরিহার্য বহুমাত্রিক পদক্ষেপ, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতকেই শক্তিশালী করে তুলবে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং কলামিস্ট ও কবি। email: shahidul.alam@bluewin

আরও দেখুন

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।

১ দিন আগে

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

৫ দিন আগে

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।

৮ দিন আগে

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

১৩ দিন আগে