logo
মতামত

দুর্নীতিবাজকে নয়, দেশকে ভোট দিন

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা০৯ নভেম্বর ২০২৫
Copied!
দুর্নীতিবাজকে নয়, দেশকে ভোট দিন
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আমরা আর চোখ বুজে থাকতে পারি না। কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতা ও অর্থের পেছনে লুকিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দিচ্ছে। দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়—এটি আমাদের ন্যূনতম মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে ক্ষতবিক্ষত করে। যখন আদালত, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন কিংবা স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় জবাবদিহি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে সেই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা, যাদের কষ্টের অর্থে দেশের অর্থনীতি এখনো টিকে আছে।

দুর্নীতি, অনিয়ম, চাঁদাবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাব, দরদাম বা রাজনৈতিক সুবিধার নামে বিচারপ্রক্রিয়া যেন বিকৃত না হয়, সেটিই আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দাবি।

তবে শুধু অভিযোগ করলেই হবে না; দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই পরিবর্তন আনতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্ভব হবে তখনই, যখন স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা, যোগ্যতা, প্রযুক্তি ও জনসম্পৃক্ততার সমন্বয় ঘটবে।

কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

প্রথমত, সরকারি প্রকল্প, উন্নয়ন বাজেট ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। তথ্যের অভাব অনিয়মের জন্ম দেয়, স্বচ্ছতাই দুর্নীতির মৃত্যু ঘটায়।

দ্বিতীয়ত, স্বাধীন, পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ও অডিট প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাদের প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে এবং তা কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেবে।

তৃতীয়ত, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দলীয় বা পারিবারিক প্রভাব নয়, বরং দক্ষতা, নৈতিকতা ও সততার ভিত্তি স্থাপন করতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক অংশগ্রহণ ও তত্ত্বাবধান বাড়াতে হবে। জনগণ সরাসরি যুক্ত হলে অনিয়ম কমে।

পঞ্চমত, সরকারি নথি, লেনদেন ও সেবা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে প্রতিটি পদক্ষেপ ট্রেসযোগ্য হয় এবং গোপন অনিয়ম ধরা পড়ে।

এই পরিবর্তনগুলো কেবল নীতি নয়—এগুলো সততা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার পথ। আর এই সংস্কৃতি ছাড়া গণতন্ত্র টিকতে পারে না।

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভোট। আর ভোট কেবল একটি প্রতীক নয়—এটি দায়িত্ব। দল মনোনয়ন দিলেও যদি আমরা দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে ভোট দিই, তবে আমরা নিজেরাই দুর্নীতিকে বৈধতা দিই। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই: দলীয় আনুগত্যের চেয়ে দেশের প্রতি আনুগত্য বড়, নাকি নয়?

আজ বাংলাদেশের ১৮ কোটি নাগরিকের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা। রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের ঘাম ও ত্যাগ যেন দুর্নীতির পকেটে না যায়, সেটি আমাদের সবার দায়।

আমরা চাই মানবিক, সৎ ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত নেতৃত্ব। দুর্নীতিগ্রস্ত কারও দেশ পরিচালনার অধিকার নেই। ভুল করেও আমরা যেন তাকে সেই সুযোগ না দিই। ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—এক রোগ থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা যেন আরেক রোগে আক্রান্ত না হই। এবার সেই চক্র ভাঙতেই হবে।

এখনই সময়—

সততার পাশে দাঁড়ানোর,

অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার,

এবং প্রতিটি দুর্নীতিকে ঘৃণা করার।

বাংলাদেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি ১৮ কোটি মানুষের দেশ। যদি আমরা নাগরিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই, তবে এখনই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে—নিজ নিজ অবস্থান থেকে, যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে, দায়িত্বশীলভাবে।

আমাদের সংগ্রাম কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়—এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের লড়াই।
আমাদের লক্ষ্য একটাই—একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ

‘আমার ভোট, আমার দায়িত্ব—দুর্নীতির নয়, ন্যায়ের পক্ষে।’

রক্ষা করুন বাংলাদেশ।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। ইমেইল: [email protected]

আরও দেখুন

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।

১২ ঘণ্টা আগে

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

৪ দিন আগে

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই সনদ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বাংলাদেশের হারানো বিশ্বাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা দলের ছিল না; এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই আপামর জনগণের। অথচ সেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক জুলাই সনদকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’–‘না’ ভোটের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে।

৭ দিন আগে

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

মানুষের মাঝে বাঁচতে চাই

বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র ছেড়ে সরে গেছে। বড় শপিং মল, আউটলেট, নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক অঞ্চল—সবই সুবিধাজনক ও কার্যকর। কিন্তু সেখানে নেই অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়ার আনন্দ, ধীরে বসে থাকার অবকাশ, বা হঠাৎ আলাপের উষ্ণতা।

১২ দিন আগে