logo
মতামত

ভেনেজুয়েলা: সংকটের বাইরে একটি কৌশলগত বাস্তবতা

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা০৫ জানুয়ারি ২০২৬
Copied!
ভেনেজুয়েলা: সংকটের বাইরে একটি কৌশলগত বাস্তবতা
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ভেনেজুয়েলা শুধু একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্র নয়; নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বিপুল তেল ও খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। আন্দিজ পর্বতমালা, ক্যারিবীয় সাগর ও বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট ভেনেজুয়েলাকে যেমন অনন্য করেছে, তেমনি এর প্রাকৃতিক সম্পদ একে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অপরিহার্য করে তুলেছে।

তবে গত এক দশকে দেশটি গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। দুর্নীতি, অস্থিরতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে দেশটির সার্বভৌমত্ব অনেকের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

কিন্তু ভেনেজুয়েলাকে শুধু সংকটের চোখে দেখলে বাস্তবতা ধরা পড়ে না। চীন দেশটিকে জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং বিপুল বিনিয়োগ ও তেল আমদানির মাধ্যমে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে ভেনেজুয়েলার দিকে নতুন করে তাকাচ্ছে। এই বহুমাত্রিক আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বৈশ্বিক তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদি তেল অবকাঠামো আধুনিকীকরণ ও উৎপাদন বাড়ানো যায়, তবে ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন ভূমিকা রাখতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রুশ জ্বালানির বিকল্প খোঁজার প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজকের বিশ্বে একটি স্পষ্ট প্রবণতা হলো—ছোট রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তির স্বার্থসংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। সামরিক চাপের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ ক্রমেই কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ভেনেজুয়েলা এই বাস্তবতার প্রতীক। তবু দেশটিকে কেবল ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

এই আলোচনা আমাদের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। দীর্ঘদিন গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল থাকলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ‘আকর্ষণীয়’ ছিল মূলত তার কৌশলগত অবস্থান, সস্তা শ্রম ও উন্নয়নের বয়ানের কারণে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি দেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রায়ই নির্ধারিত হয় সে দেশ তার জনগণের জন্য কী করছে তার চেয়ে বেশি—সে বিশ্বব্যবস্থাকে কী সরবরাহ করতে পারছে তার ভিত্তিতে।

কিন্তু এই ধরনের আকর্ষণ টেকসই নয়। যে রাষ্ট্র কেবল সম্পদ বা কৌশলগত সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সে শেষ পর্যন্ত একটি ‘বিষয়’-এ পরিণত হয়, পূর্ণাঙ্গ সত্তা হয়ে উঠতে পারে না। টেকসই গুরুত্ব আসে তখনই, যখন প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতা যুক্ত হয়।

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বন্ধুত্ব নয়, স্বার্থই স্থায়ী। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বদলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কৌশল গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি। তবেই একটি দেশ শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিতে নয়, নিজের নাগরিকদের কাছেও সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

*লেখক গবেষক ও সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

আরও দেখুন

নির্বাচন ভাবনা: জনরায়ের বার্তা ও আগামীর রাজনৈতিক সমীকরণ

নির্বাচন ভাবনা: জনরায়ের বার্তা ও আগামীর রাজনৈতিক সমীকরণ

এই নির্বাচন কেবল আসনসংখ্যার হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত। তরুণ প্রজন্ম, ডিজিটাল রাজনীতি এবং সুশাসনের প্রশ্ন এখন নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দু। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই এটি আত্মসমালোচনা ও নীতিগত পুনর্গঠনের সময়।

৬ দিন আগে

ভালোবাসা যার আর কোনো নাম নেই

ভালোবাসা যার আর কোনো নাম নেই

আমি রোগীকে বলতে গেলাম। দেখি বউটা কাঁদছে। মেরি ওর নাম। রোগী বলছে, মেরি কেন যে এতটা ঝামেলা করে। ডাক্তার আমাদের চলে যেতে দাও। আমি বললাম, আরেকজন ডাক্তার আছেন যার ওপেনিয়ন নিতে হবে। তিনি তোমাদের চলে যেতে বললে আমি ডিসচার্জ করে দেব, সমস‍্যা নেই।

৭ দিন আগে

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

নীরব শক্তি থেকে নির্বাচনী ময়দানের আলোচিত এক নাম সিমি কিবরিয়া

তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত নিরলস প্রচারণা চালিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক নেতার সহধর্মিণীর এমন সক্রিয় ও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকার নজির খুব কমই দেখা যায়। তিনি শুধু মঞ্চে ভাষণ দেননি; তিনি মানুষের পাশে বসেছেন, তাদের কথা শুনেছেন।

১১ দিন আগে

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

একটি বাংলাদেশ আমি—জাগ্রত জনতার

স্বাধীনতার পর আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম এক ন্যায়ভিত্তিক সমাজের—যেখানে উর্বর মাটি, কর্মশক্তি ও মানবিক মর্যাদা মিলেমিশে উন্নতির পথ দেখাবে। ‘সোনার বাংলা’ নামে পরিচিত এই দেশে প্রত্যেক শিশুর চোখে থাকবে আলো, প্রত্যেক হৃদয়ে থাকবে সম্ভাবনা।

১৫ দিন আগে