বিডিজেন ডেস্ক
গত অর্থবছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। এক পর্যায়ে তা ২০ বিলিয়ন বা দুই হাজার কোটি ডলারে নেমে আসে। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে গিয়ে বিভিন্ন সংস্থার ঋণ ও বকেয়া পরিশোধ বন্ধ করে দেয় বিগত সরকার। এরমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা তাদের বকেয়া পরিশোধের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিতে শুরু করে।
প্রতিবেদন ডয়েচে ভেলের।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ ও দেনা শোধের ব্যবস্থা করেছেন তারা। আর এটি করা হয়েছে রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ না করে।
তিনি বলেন, ‘রিজার্ভে হাত না দিয়ে আমরা ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করেছি।’ গভর্নর জানান, পরিশোধ করা ঋণের বেশির ভাগই বিদ্যুৎ খাতের। এ ছাড়া. কৃষিসহ অন্য খাতের দেনাও রয়েছে।
তবে রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ শোধ কীভাবে করা হয়েছে তা পরিষ্কার নয় অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাতের কাছে। তিনি বলেন, ‘রিজার্ভে হাত না দিয়ে পরিশোধ করার বিষয়টি আমি ভালো বুঝি না দুইটি কারণে। কারণ হচ্ছে, আমার কাছে কি রিজার্ভের বাইরে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আছে? ঋণ তো টাকায় পরিশোধ করা হয় না। এটা তো ডলারেই পরিশোধ করতে হয়। সেই ডলারটা কোথা থেকে আসছে? আপনার রিজার্ভ বেড়ে এমন একটা অবস্থায় গেছে, যদি তাই হয়, তাহলেও তো সেটাও রিজার্ভ। রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ পরিশোধ করলাম-এর অর্থ এই যে, আমি প্রচুর রপ্তানি করলাম বা প্রচুর প্রবাসী আয় এসেছে। কিন্তু রিজার্ভের উৎসও তো এগুলোই। এটা একটু দুর্বোধ্য মনে হয় আমার কাছে।’
রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ পরিশোধ যেভাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের ওপর কোন চাপ না ফেলেই বিদেশি দেনা পরিশোধ করা হচ্ছে। আর তা সম্ভব হয়েছে “ইন্টার-ব্যাংক মার্কেট” বা ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে লেনদেনের যে বাজার রয়েছে সেখান থেকে ডলারের সংস্থান করার মাধ্যমে।’
ড. মনসুর বলেন, ‘ইন্টার-ব্যাংকে সবাই (ব্যাংকগুলো) সবার ডলার কেনাবেচা করে। কারণ সবার কাছে রেমিট্যান্স আসছে প্রতিদিন। ব্যাংকগুলো কী করে? ব্যাংকগুলো সেখান থেকে একটা অংশ দিয়ে তাদের এলসি (আমদানির ঋণপত্র) খোলে গ্রাহকদের জন্য। বাকি টাকাটা তারা রেখে দেয় অথবা বিক্রি করে বা অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে। আমরা যেটা করেছি তাদের বলেছি যাদের উদ্বৃত্ত আছে তারা এখান থেকে নিয়ে ওকে দিয়ে দাও। সে এটা শোধ করে দিচ্ছে।’
এর পেছনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসীরা বৈধপথে বিপুল অর্থ পাঠাচ্ছেন। গত জুলাইতে যেখানে প্রবাসী আয় ১৯১ কোটি ডলারে নেমে এসেছিল সেখানে সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৪০ কোটি ডলার। অন্যদিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় আছে।
গত সেপ্টেম্বরে ৩৮৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে যা জুলাইতে ছিল ৩৮২ কোটি ডলার। এর ফলে বাজারে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে, যা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য। এমন প্রেক্ষিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তঃব্যাংক লেনদেনের বাজারকে সচল করার উদ্যোগ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের ভূমিকা হলো আমরা ইন্টার-ব্যাংক মার্কেটকে সচল করেছি। এই মার্কেট বড় মার্কেট। এই মার্কেটে বছরে ৮০ বিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়। কাজেই এই মার্কেটকে অবজ্ঞা করে কেন আমি রিজার্ভ থেকে দিতে যাব।’
তারল্য সংকট ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর সবল ব্যাংকগুলোর আস্থা না থাকার কারণে বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ভাটা পড়েছিল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের কাছে কোনো ডলার নাই। অথচ সরকারের সব সংস্থা সোনালী ব্যাংকে গিয়ে এলসি (আমদানির ঋণপত্র) খুলছে। সোনালী ব্যাংককে কেউ টাকা দিতে চায় না। আমরা তখন ব্যাংকগুলোকে বললাম তোমাদের উদ্বৃত্ত ডলার সোনালী ব্যাংক কিনে নেবে বাজার দরে। এতটুকুই আমাদের ভূমিকা। ফ্যাসিলিটেটিং (অনুকূল ব্যবস্থা তৈরি) করা। ব্যাংক যেন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করে।’
ব্যাংকগুলোকে সচল রাখা এবং প্রবাসী আয় ও রপ্তানির ধারা বজায় থাকার মাধ্যমে এই বাজার আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন গভর্নর। এতে সামনের দিনেও রিজার্ভে হাত না দিয়েই বিদেশি ঋণ ও দেনা শোধ করা যাবে বলে আশাবাদী।
তিনি বলেন, ‘আমার তো রেমিট্যান্স আসছে। গত বছর এসেছে ২৪ বিলিয়ন ডলার। এই বছর এখনকার ধারাবাহিকতায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। রপ্তানি আছে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। সব মিলিয়ে মোট ৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো আসে। সেখান থেকে আমরা সব দেনা শোধ করে দেব। এখান থেকেই আমি দুই বিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করেছি।’
বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতি
বিদেশি দেনা শোধে আপাতত স্বস্তির আভাস মিললেও বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো নানা ধরনের বাধা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, ‘আমরা সাধারণত জানি অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাত কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। এর মধ্যে তো বহু শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে সেটা তো বলাই হচ্ছে, সরকারি তথ্যও সেটা বলছে। সেবা খাতের অবস্থাও তো খুব একটা উন্নতি হয়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার তো সেই ৭ শতাংশ জায়গায় নেই। এখন তিন থেকে সাড়ে চার পর্যন্ত। এইটা ঠিক যে, জিডিপি কমে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই সেটা থাকার কথাও না। বিশেষ করে শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে। আগের তুলনায় আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। এটার প্রভাব পড়ছে অনেক কিছুর ওপর। অতীতকালেও যেভাবে বলা হতো বাড়ছে, সবই ভালো এখনও সেই প্রবণতাটা রয়েই গেছে। বাস্তব সত্যটা একটু লুকানোর চেষ্টা করা। এটা না করলেও হয়। এটা করার দরকার প্রয়োজন পড়ে না, দরকার নেই।’
গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ শত্ংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি ঠিকমতো না চললে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেমে আসতে পারে। আর খুব ভালো করলে হবে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হবে। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার বন্যা কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিকেও সীমিত করে দেবে।
বাংলাদেশে শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বকারী পোশাক শিল্প। এর মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান রাতারাতি বিরাট কোনো পরিবর্তন হবে এমনটা তারাও আশা করেন না।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের গত দুই তিন বছর আমরা ঠিকমতো এলসি খুলতে যেমন পরিনি, তেমনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এই সব সমস্যার সমাধান যে গত তিন মাসে হয়ে গেছে, এমনটি নয়। তবে সরকারের উদ্যোগের মধ্যে আমরা এক ধরনের ইতিবাচক অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে নিশ্চই ভালো কিছু হবে।’
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন ‘গত ১৫ বছরে অর্থনীতি লুণ্ঠিত হয়েছে’, যার দায় এর সরকারের ঘাড়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার ১০০ বিলিয়ন বিদেশি ঋণ রেখে গেছে, যে ঋণগুলোতে প্রচুর লুটপাট হয়েছে, পাচার হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সময় লাগবে। জনগণকে একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধি কম বলে মনে হলেও এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে নিশ্চয় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
এখনো ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও ব্যাংকিংসহ অর্থনৈতিক বিভিন্ন খাতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের জের হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটা চ্যালেঞ্জ আছে। কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা সরকার করছে। কৃষিখাতে একটা পরিবর্তন দরকার। উদ্যোগ দরকার। দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগগুলোও ভালো।’
মূল্যস্ফীতির চাপ
অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ জন্য সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বজায় রাখলেও তার প্রতিফলন এখনো বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘এখন প্রধান সমস্যা মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সেটা এখনো কমানো যায়নি। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ এটা কমে আসবে।’
সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বা বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতি সুদহার তিন দফা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবশেষ সুদ হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ড. গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমলেও সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা না কমলে এই জায়গাটাতে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। আবার বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি ও কারসাজি বন্ধ না হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এটিকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করেন। ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কাছে মনে হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাটা প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সরকার আসার পরই বন্যা এবং অতিবৃষ্টি দুটোই হলো। সেই কারণে সবজি বাজারে একটা প্রভাব পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। আরেকটা বিষয় হলো, মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যস্ফীতি সেটাও আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। এডিবি বাস্তবায়নে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। খরচটা কম রাখার চেষ্টা করছি।’
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
গত অর্থবছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। এক পর্যায়ে তা ২০ বিলিয়ন বা দুই হাজার কোটি ডলারে নেমে আসে। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে গিয়ে বিভিন্ন সংস্থার ঋণ ও বকেয়া পরিশোধ বন্ধ করে দেয় বিগত সরকার। এরমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা তাদের বকেয়া পরিশোধের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিতে শুরু করে।
প্রতিবেদন ডয়েচে ভেলের।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ ও দেনা শোধের ব্যবস্থা করেছেন তারা। আর এটি করা হয়েছে রিজার্ভ থেকে ডলার খরচ না করে।
তিনি বলেন, ‘রিজার্ভে হাত না দিয়ে আমরা ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করেছি।’ গভর্নর জানান, পরিশোধ করা ঋণের বেশির ভাগই বিদ্যুৎ খাতের। এ ছাড়া. কৃষিসহ অন্য খাতের দেনাও রয়েছে।
তবে রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ শোধ কীভাবে করা হয়েছে তা পরিষ্কার নয় অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাতের কাছে। তিনি বলেন, ‘রিজার্ভে হাত না দিয়ে পরিশোধ করার বিষয়টি আমি ভালো বুঝি না দুইটি কারণে। কারণ হচ্ছে, আমার কাছে কি রিজার্ভের বাইরে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আছে? ঋণ তো টাকায় পরিশোধ করা হয় না। এটা তো ডলারেই পরিশোধ করতে হয়। সেই ডলারটা কোথা থেকে আসছে? আপনার রিজার্ভ বেড়ে এমন একটা অবস্থায় গেছে, যদি তাই হয়, তাহলেও তো সেটাও রিজার্ভ। রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ পরিশোধ করলাম-এর অর্থ এই যে, আমি প্রচুর রপ্তানি করলাম বা প্রচুর প্রবাসী আয় এসেছে। কিন্তু রিজার্ভের উৎসও তো এগুলোই। এটা একটু দুর্বোধ্য মনে হয় আমার কাছে।’
রিজার্ভে হাত না দিয়ে ঋণ পরিশোধ যেভাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের ওপর কোন চাপ না ফেলেই বিদেশি দেনা পরিশোধ করা হচ্ছে। আর তা সম্ভব হয়েছে “ইন্টার-ব্যাংক মার্কেট” বা ব্যাংকগুলোর নিজেদের মধ্যে লেনদেনের যে বাজার রয়েছে সেখান থেকে ডলারের সংস্থান করার মাধ্যমে।’
ড. মনসুর বলেন, ‘ইন্টার-ব্যাংকে সবাই (ব্যাংকগুলো) সবার ডলার কেনাবেচা করে। কারণ সবার কাছে রেমিট্যান্স আসছে প্রতিদিন। ব্যাংকগুলো কী করে? ব্যাংকগুলো সেখান থেকে একটা অংশ দিয়ে তাদের এলসি (আমদানির ঋণপত্র) খোলে গ্রাহকদের জন্য। বাকি টাকাটা তারা রেখে দেয় অথবা বিক্রি করে বা অন্য ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে। আমরা যেটা করেছি তাদের বলেছি যাদের উদ্বৃত্ত আছে তারা এখান থেকে নিয়ে ওকে দিয়ে দাও। সে এটা শোধ করে দিচ্ছে।’
এর পেছনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসীরা বৈধপথে বিপুল অর্থ পাঠাচ্ছেন। গত জুলাইতে যেখানে প্রবাসী আয় ১৯১ কোটি ডলারে নেমে এসেছিল সেখানে সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৪০ কোটি ডলার। অন্যদিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পরও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় আছে।
গত সেপ্টেম্বরে ৩৮৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে যা জুলাইতে ছিল ৩৮২ কোটি ডলার। এর ফলে বাজারে ডলারের প্রবাহ বেড়েছে, যা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য। এমন প্রেক্ষিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তঃব্যাংক লেনদেনের বাজারকে সচল করার উদ্যোগ নেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের ভূমিকা হলো আমরা ইন্টার-ব্যাংক মার্কেটকে সচল করেছি। এই মার্কেট বড় মার্কেট। এই মার্কেটে বছরে ৮০ বিলিয়ন ডলার লেনদেন হয়। কাজেই এই মার্কেটকে অবজ্ঞা করে কেন আমি রিজার্ভ থেকে দিতে যাব।’
তারল্য সংকট ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর সবল ব্যাংকগুলোর আস্থা না থাকার কারণে বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ভাটা পড়েছিল। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের কাছে কোনো ডলার নাই। অথচ সরকারের সব সংস্থা সোনালী ব্যাংকে গিয়ে এলসি (আমদানির ঋণপত্র) খুলছে। সোনালী ব্যাংককে কেউ টাকা দিতে চায় না। আমরা তখন ব্যাংকগুলোকে বললাম তোমাদের উদ্বৃত্ত ডলার সোনালী ব্যাংক কিনে নেবে বাজার দরে। এতটুকুই আমাদের ভূমিকা। ফ্যাসিলিটেটিং (অনুকূল ব্যবস্থা তৈরি) করা। ব্যাংক যেন ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করে।’
ব্যাংকগুলোকে সচল রাখা এবং প্রবাসী আয় ও রপ্তানির ধারা বজায় থাকার মাধ্যমে এই বাজার আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন গভর্নর। এতে সামনের দিনেও রিজার্ভে হাত না দিয়েই বিদেশি ঋণ ও দেনা শোধ করা যাবে বলে আশাবাদী।
তিনি বলেন, ‘আমার তো রেমিট্যান্স আসছে। গত বছর এসেছে ২৪ বিলিয়ন ডলার। এই বছর এখনকার ধারাবাহিকতায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। রপ্তানি আছে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। সব মিলিয়ে মোট ৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো আসে। সেখান থেকে আমরা সব দেনা শোধ করে দেব। এখান থেকেই আমি দুই বিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করেছি।’
বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির শ্লথ গতি
বিদেশি দেনা শোধে আপাতত স্বস্তির আভাস মিললেও বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো নানা ধরনের বাধা রয়েছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, ‘আমরা সাধারণত জানি অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাত কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। এর মধ্যে তো বহু শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে সেটা তো বলাই হচ্ছে, সরকারি তথ্যও সেটা বলছে। সেবা খাতের অবস্থাও তো খুব একটা উন্নতি হয়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার তো সেই ৭ শতাংশ জায়গায় নেই। এখন তিন থেকে সাড়ে চার পর্যন্ত। এইটা ঠিক যে, জিডিপি কমে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থেই সেটা থাকার কথাও না। বিশেষ করে শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে। আগের তুলনায় আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। এটার প্রভাব পড়ছে অনেক কিছুর ওপর। অতীতকালেও যেভাবে বলা হতো বাড়ছে, সবই ভালো এখনও সেই প্রবণতাটা রয়েই গেছে। বাস্তব সত্যটা একটু লুকানোর চেষ্টা করা। এটা না করলেও হয়। এটা করার দরকার প্রয়োজন পড়ে না, দরকার নেই।’
গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ৪ শত্ংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি ঠিকমতো না চললে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেমে আসতে পারে। আর খুব ভালো করলে হবে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলছে, অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হবে। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার বন্যা কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধিকেও সীমিত করে দেবে।
বাংলাদেশে শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিত্বকারী পোশাক শিল্প। এর মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান রাতারাতি বিরাট কোনো পরিবর্তন হবে এমনটা তারাও আশা করেন না।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের গত দুই তিন বছর আমরা ঠিকমতো এলসি খুলতে যেমন পরিনি, তেমনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এই সব সমস্যার সমাধান যে গত তিন মাসে হয়ে গেছে, এমনটি নয়। তবে সরকারের উদ্যোগের মধ্যে আমরা এক ধরনের ইতিবাচক অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে নিশ্চই ভালো কিছু হবে।’
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ মনে করেন ‘গত ১৫ বছরে অর্থনীতি লুণ্ঠিত হয়েছে’, যার দায় এর সরকারের ঘাড়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘আগের সরকার ১০০ বিলিয়ন বিদেশি ঋণ রেখে গেছে, যে ঋণগুলোতে প্রচুর লুটপাট হয়েছে, পাচার হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সময় লাগবে। জনগণকে একটু ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সাময়িকভাবে প্রবৃদ্ধি কম বলে মনে হলেও এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে নিশ্চয় পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
এখনো ঘুরে দাঁড়াতে না পারলেও ব্যাংকিংসহ অর্থনৈতিক বিভিন্ন খাতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তাকে ইতিবাচক বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘আগের সরকারের জের হিসেবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটা চ্যালেঞ্জ আছে। কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা সরকার করছে। কৃষিখাতে একটা পরিবর্তন দরকার। উদ্যোগ দরকার। দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগগুলোও ভালো।’
মূল্যস্ফীতির চাপ
অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ জন্য সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বজায় রাখলেও তার প্রতিফলন এখনো বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘এখন প্রধান সমস্যা মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছিল। সেটা এখনো কমানো যায়নি। আশা করছি, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ এটা কমে আসবে।’
সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বা বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতি সুদহার তিন দফা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সবশেষ সুদ হার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
ড. গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমলেও সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা না কমলে এই জায়গাটাতে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। আবার বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি ও কারসাজি বন্ধ না হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এটিকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করেন। ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কাছে মনে হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাটা প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সরকার আসার পরই বন্যা এবং অতিবৃষ্টি দুটোই হলো। সেই কারণে সবজি বাজারে একটা প্রভাব পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। আরেকটা বিষয় হলো, মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যস্ফীতি সেটাও আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। এডিবি বাস্তবায়নে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। খরচটা কম রাখার চেষ্টা করছি।’
সূত্র: ডয়েচে ভেলে
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় একটি চলন্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় নারী, শিশুসহ অটোরিকশার যাত্রী ৬ জন দগ্ধ হয়েছে। বুধবার (২ এপ্রিল) বিকেলে চৌমুহনী পৌরসভার কন্ট্রাক্টর মসজিদ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো. আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর বাসায় হামলা ও ভাঙচুরে ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের বাসাতেও হামলা হয়েছে।
সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপিকে টার্গেট করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশ ইসলামি উগ্রপন্থীদের উত্থান নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার (১ এপ্রিল) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।