logo
সুপ্রবাস

ভ্যানকুভারে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে অনবদ্য সুরাঞ্জলি

ফারজানা নাজ শম্পা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা১ ঘণ্টা আগে
Copied!
ভ্যানকুভারে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে অনবদ্য সুরাঞ্জলি

বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের দুই অবিসংবাদিত দিকপাল হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাদের সৃষ্টির আবেশ ও গানের শক্তি দেশ ও প্রবাসের সব বাঙালিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে রাগশ্রীয়তা, পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, রীতি আনুষ্ঠানিকতাসহ বিভিন্ন দিক লক্ষ্যনীয়। অন্যদিকে কবি নজরুল ইসলামের গানে প্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, ইসলামি গান (গজল), শ্যামা সংগীত ও লোকগীতি, বিদ্রোহ ইত্যাদি বিভিন্ন দিক উল্লেখযোগ্য।

তাদের অসামান্য সৃষ্টির আবহে বাংলার সংস্কৃতির পূর্ণ আলোয় কানাডার ভ্যানকুভারে গত ১৬ মে বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে ‘প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি’র উদ্যোগে সারে আর্টস সেন্টারে (Surrey Arts Centre) অনুষ্ঠিত হয়েছে এক অনবদ্য 'রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী'।

Rabindra-Nazrul 3

উদ্বোধনী পর্ব ও সুর-নৃত্যের কোলাজ

চমৎকার আলো-ছায়ার আবহে দুই কবির প্রতিকৃতিমণ্ডিত পোস্টার ও ব্যানারে শোভিত মঞ্চে সমবেত কণ্ঠে কবি নজরুলের ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল’ গানের মাধ্যমে এই উৎসবের সূচনা হয়। উদ্বোধনী পর্যায়ের কবি নজরুলের এই গানে অন্যায়, অসত্য ও কলুষতা মুছে পৃথিবীতে সত্যের আলো ছড়ানোর এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, তা পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই বিভিন্ন পরিবেশনায় মূর্ত হয়ে ওঠে। সুর ও নৃত্যের মায়াবী কোলাজ নিয়ে শুরু হয় উদ্বোধনী পর্ব। শুরুতেই সুশ্বেতার সুললিত কণ্ঠে ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’—কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানে সব জড়তা পরিহার করে প্রাণবন্ত থাকার আকুল প্রার্থনা ধ্বনিত হয়।

Rabindra-Nazrul 4

এর পরপরই প্রবাস বাংলার শিশু ও কিশোর শিল্পীরা নজরুলগীতি ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’-এর সাথে নৃত্যের মাধ্যমে বসন্তের শেষ প্রকৃতির এক অপরূপ ও চঞ্চল রূপ ফুটিয়ে তোলে। ঋতু বন্দনার গানের আবহে ঐশী ও নবমিতার অপূর্ব যৌথ নৃত্যে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ ও ‘নীল অঞ্জন ঘন কুঞ্জ ছায়ায়’ গানের সাথে বর্ষার মায়াবী রূপ এবং বিরহী হৃদয়ের ব্যাকুল প্রতীক্ষা চমৎকারভাবে প্রকাশ পায়। এই আনন্দের রেশ বজায় রেখে কিশোর নীলভ ও মোহর কবিগুরুর ‘আলো আমার আলো’ গানের মাধ্যমে মানবাত্মাকে জাগিয়ে তোলার এক পরম ঐশ্বরিক আবহ তৈরি করে।

Rabindra-Nazrul 5

একক, দ্বৈত ও ফিউশন পরিবেশনা

অনুষ্ঠানে একক ও দ্বৈত পরিবেশনায় ছিল নৃত্য আর সংগীতের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। লুবনা আলম তার অসাধারণ গায়কীতে নজরুলগীতি ‘মধুর নুপুর বাজে’ পরিবেশন করে শ্রোতাদের জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করে এক চিরন্তন সুন্দরের পানে নিয়ে যান।

এরপর শম্পার চমৎকার কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানের সাহিত্যিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ করে। সুদীপ ও লালনার দ্বৈত কণ্ঠে ‘মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ এবং ‘আজি এ সন্ধ্যা’ গানে বসন্তের আমের মুকুলের সুবাস ও স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় ঈশ্বরের আনন্দময় উপস্থিতি ফুটে ওঠে। শুভজিৎ ও মানন্যা ‘তোমার খোলা হাওয়া’ গানের মাধ্যমে তাদের কণ্ঠমাধুর্যে সব সামাজিক বিধি-নিষেধের গণ্ডি পেরিয়ে এক অবাধ মুক্তির আলো-হাওয়ায় দর্শকদের ভাসিয়ে নিয়ে যান। ভক্তি, প্রেম ও ফিউশনের মেলবন্ধন ঘটে বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে। তানিয়া ও সৈকতের যৌথ পরিবেশনায় কবি নজরুলের ‘দাঁড়ায়ে দুয়ারে’ গানটিতে প্রেমিকের আবেগ ও শুদ্ধ মানবিক আবেদন শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। সেই রেশ ধরে ইরা তার অনবদ্য পোশাক ও সুনিপুণ নৃত্যভঙ্গিমায় ‘শ্যাম সুন্দর গিরিধারী’ গানের সাথে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তের পরম আত্মনিবেদন ফুটিয়ে তোলেন। অনন্যা শীলার কণ্ঠে ‘সখি সাজায়ে দে’ গানে চিত্রাঙ্গদার আকুল অনুরোধ যেমন দারুণভাবে প্রকাশ পায়, তেমনি হ্যাপির অনবদ্য গায়কিতে ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ গানটির মাধ্যমে দর্শকেরা কিছুক্ষণের জন্য বর্ষার রাতের গভীরতায় হারিয়ে যান।

Rabindra-Nazrul 6

দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারে কৃষ্ণের জন্য রাধার ব্যাকুলতাকে সৈকত তার মাধুর্যময় কণ্ঠ ও বাঁশির অপরূপ আবহে ফুটিয়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৈথিলী এবং ব্রজবুলি ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট ‘শাওন গগনে’ গানটি পরিবেশন করে তিনি অনুষ্ঠানকে ধ্রুপদী ধারার এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এর সাথে বৈচিত্র্য যোগ করতে মাইকেল মিত্র ও তানিয়া পরিবেশন করেন তাদের অসাধারণ কণ্ঠে চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত ফিউশন—যেখানে স্থান পায় ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী উড়ে চলে’, ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ এবং ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে’ গানগুলো এবং এর সাথে একটি চমৎকার হিন্দি কোলাজ উপস্থিত দর্শকদের মুগদ্ধ করে।

Rabindra-Nazrul 7

সমাপনী পর্ব ও কৃতজ্ঞতা

বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতার মাঝে শান্তি ও মানবতার পরম বার্তা নিয়ে সমবেত কণ্ঠে ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সুর, বাণী ও নৃত্যের এই অপূর্ব আয়োজন সমাপ্ত হয়। এই আয়োজন ভ্যানকুভারের বুকে প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয়ে এক টুকরো বিশুদ্ধ বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতিকে এনে দিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে শিল্পী, পৃষ্ঠপোষক এবং উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সৈকত ঘোষাল ও মাইকেল মিত্র। এই সুন্দর, সফল ও সুরময় আয়োজনের সংগীত পরিচালনা ও যন্ত্রসংগীতে ছিলেন কয়েকজন গুণীজন—তবলা ও কাহন পরিচালনায় শুভময় দাসগুপ্ত ও তাপস বিশ্বাস, কিবোর্ডে জগজিৎ সোহার এবং গিটারে সৈকত দাস। মূল শিল্পীদলের মধ্যে ছিলেন সুশ্বেতা ব্যানার্জি, হ্যাপি দাস, সুদীপ মুখার্জি, অনন্যা শীলা, রঞ্জনা মুখার্জি, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ ও মাইকেল মিত্র।

বাংলা সংস্কৃতির এই অপূর্ব মিলনমেলার সার্বিক সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা। আয়োজনে অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোর শিল্পীরা হলো: শুভজিৎ দাস, শুদ্ধ কম দাস, মানন্যা চক্রবর্তী, মোহর। শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও আলোকসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন আশিক বারী এবং সার্বিক মঞ্চসজ্জায় শামীম হারুন। হাউস কিপিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন মিশেল মিত্র। ভলান্টিয়ার্স (স্বেচ্ছাসেবক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাহমিদুল বারী, ডমিনিক প্রান্ত ও উইলিয়াম ব্যানার্জি।

Rabindra-Nazrul 2

এই অনুষ্ঠানে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় বিষ্ণু গোপাল চ্যাটার্জি, সারে সিটি কালচারাল অনুদান, লাইক জাইসি/মাহিন সরকার পরিবার, জহির উদ্দিন, তারিক মালিক, আজাদ শেখ ও রবীন মহলকে। অনুষ্ঠানের প্রতিটি সুন্দর মুহূর্ত আলোকচিত্রে বন্দি করে রাখেন অভিষেক কর্মকার ও ডেরেক বাড়ৈ। এ ছাড়া, বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় বাংলাদেশ কমিউনিটির উপস্থিত শ্রোতা-দর্শক এবং সারে আর্টস সেন্টার স্টুডিও থিয়েটারের কর্মীদের প্রতি।

উল্লেখ্য, আয়োজক প্রবাস বাংলার বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের সদস্যরা হলেন অনন্যা শীলা শামসউদ্দিন, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ, মিকণ দাস, শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা, মাইকেল মিত্র ও শামীম হারুন।

Rabindra-Nazrul 8

প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি ২০০৪ সাল থেকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং বাংলা সংস্কৃতির সুসমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে লালন করে বিভিন্ন আয়োজন করে আসছে। সংগঠনটি কবিপক্ষ, বাংলা নববর্ষ, মঞ্চনাটক ও সংগীতসন্ধ্যার মতো নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে কানাডার প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বল ধারাকে সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে। এই আয়োজনের শুরুতেই নজরুল ও কবিগুরুর জীবনদর্শন নির্ভর একটি তথ্যবহুল আলোচনা উপস্থাপন করেন বিপুল কামাল।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় আমাকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন মাইকেল মিত্র। তার প্রতি এবং কানাডার জীবনে বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রবাস বাংলার সংশ্লিষ্ট নিবেদিতপ্রাণ সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

আরও দেখুন

কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহতদের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছায় রক্তদান

কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহতদের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছায় রক্তদান

কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ড্রোন হামলায় আহতদের চিকিৎসার জন্য সেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্থানীয় নাগরিক ও অন্য দেশের নাগরিকদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিরা সেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসেন।

১ ঘণ্টা আগে

ভ্যানকুভারে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে অনবদ্য সুরাঞ্জলি

ভ্যানকুভারে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে অনবদ্য সুরাঞ্জলি

অনুষ্ঠানে একক ও দ্বৈত পরিবেশনায় ছিল নৃত্য আর সংগীতের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। লুবনা আলম তার অসাধারণ গায়কীতে নজরুলগীতি ‘মধুর নুপুর বাজে’ পরিবেশন করে শ্রোতাদের জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করে এক চিরন্তন সুন্দরের পানে নিয়ে যান।

১ ঘণ্টা আগে

টরন্টোয় বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল

টরন্টোয় বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যালে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল

এবারের আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ও তাদের পরিবারগুলোর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে এবং অটিজম ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত সকল নিবেদিত প্রাণ মানুষদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এ ছাড়াও, নতুন কিছু সংযোজন অনুষ্ঠাটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।

২ ঘণ্টা আগে

কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলায় আহত বাংলাদেশিদের খোঁজ নিলেন রাষ্ট্রদূত

কুয়েতে ইরানি ড্রোন হামলায় আহত বাংলাদেশিদের খোঁজ নিলেন রাষ্ট্রদূত

গতকাল বুধবার (৩ জুন) ভোরে কুয়েত বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক আহত হন। তাদের মধ্যে ২ জন গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতাল দুটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

২ দিন আগে