logo
প্রবাসের খবর

ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি যুদ্ধ শেষ করার বদলে অচলাবস্থা আরও পাকাপোক্ত হতে পারে, বিশ্লেষকদের অভিমত

বিডিজেন ডেস্ক
বিডিজেন ডেস্ক১ ঘণ্টা আগে
Copied!
ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি যুদ্ধ শেষ করার বদলে অচলাবস্থা আরও পাকাপোক্ত হতে পারে, বিশ্লেষকদের অভিমত
লেবাননের নাবাতিয়েহ শহর থেকে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি বিমান হামলার পর দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে। ৩ জুন ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তি চলমান অচলাবস্থার অবসান ঘটানোর পরিবর্তে সেটিকে আরও স্থায়ী রূপ দিতে পারে। কারণ, এই চুক্তিতে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শর্তটি বাস্তবে পূরণ করা অসম্ভব বলে মনে করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদেরা।

চুক্তির মূল ভিত্তিতে এমন একটি সমঝোতা রয়েছে, যেটিকে খুব কম মানুষই কার্যকর মনে করছেন। হিজবুল্লাহ সরাসরি নিরস্ত্রীকরণ প্রত্যাখ্যান করেছে। আর কোনো লেবানিজ সরকারেরই তা কার্যকর করার মতো ক্ষমতা নেই।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার রাজনৈতিক সুযোগ পাবে। এর আগে ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অভিযান শুরু করে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তির কারণে লেবানন এমন এক অবস্থায় আটকে পড়েছে, যেখানে তাকে এমন কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে যা তার পক্ষে সম্ভব নয়, আবার নিজের সার্বভৌমত্বও পুরোপুরি ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

এই কাঠামোগত চুক্তিটি লেবাননের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। কারণ এটি একটি দুর্বল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বলছে। অথচ লেবাননের গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা জোর প্রয়োগের পরিবর্তে ক্ষমতা ভাগাভাগির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ লেবানিজ রাজনীতিবিদ বলেন, “এটি কোনো চুক্তি নয়, এটি চাপিয়ে দেওয়া একটি সমঝোতা।”

তিনি বলেন, লেবানিজ সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার মতো কাঠামো বা সক্ষমতা—কোনোটিই রাখে না। এমন আশা করা হলে হিজবুল্লাহর সুপ্রতিষ্ঠিত সামরিক শক্তি এবং লেবাননের স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে থাকা ভঙ্গুর সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য—দুটিকেই উপেক্ষা করা হয়।

‘লেবাননের ওপর চাপানো হয়েছে বোঝা’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটির কাঠামোর মধ্যেই ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এতে লেবাননের ওপর ব্যাপক দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো সমপর্যায়ের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

বৈরুতভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল ইয়ং বলেন, “এই চুক্তি পুরো বোঝা লেবাননের ওপর চাপিয়েছে।” তিনি যোগ করেন, এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে যা “ইসরায়েলিদের (দক্ষিণ লেবাননে) অনির্দিষ্টকাল অবস্থানের সুযোগ দেয়।”

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের লেবানিজ গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, চুক্তিটি ‘জন্মের আগেই মৃত’ এবং কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ এটি এমন একটি শর্তের ওপর নির্ভর করছে, যা বাস্তবে পূরণ করা অসম্ভব।

গেরগেস বলেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার (৫ থেকে ৬ মাইল) গভীর একটি বাফার জোন বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে সেনা প্রত্যাহারকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তিনি বলেন, চুক্তির শর্তে এই বাফার জোন দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং এর ফলে এটি কূটনৈতিক বৈধতাও পেতে পারে। তিনি এটিকে ইসরায়েলের জন্য একটি রাজনৈতিক ‘উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

লেবাননের সংঘাত বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

গেরগেস বলেন, ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংঘাতগুলোকে আলাদা করে দেখানোর ফলে লেবাননে ইসরায়েল আরও বেশি স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা

ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই কাঠামোগত চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের লেবাননের ভূখণ্ডের ওপর কোনো দাবি নেই। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে লেবানিজ সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে হিজবুল্লাহসহ অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর যাচাইকৃত নিরস্ত্রীকরণের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা বৃহত্তর শান্তির পথ খুলে দিতে পারে। তবে একই সময়ে ইসরায়েলি সেনারা তথাকথিত একটি “নিরাপত্তা অঞ্চলে” মোতায়েন রয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এই অঞ্চলটি তাদের উত্তরাঞ্চলকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

“আমরা এই অঞ্চলটি (নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরের ভূখণ্ড) ধরে রাখব, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ এবং অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো নিরস্ত্র হয় এবং যতক্ষণ না লেবানন থেকে ইসরায়েলের জন্য আর কোনো হুমকি সৃষ্টি না হয়, শনিবার নেতানিয়াহু বলেন।

তিনজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার ক্ষেত্রে লেবাননের সক্ষমতার ওপর ইসরায়েলের খুব বেশি আস্থা নেই। তবে তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে লেবাননের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এগোনোর জন্য এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় লেবাননে প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিহত এবং ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই চুক্তিকে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এর ফলে লেবাননের জনগণ পুরোপুরি মুক্ত ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

সংসদের স্পিকার নাবিহ বেরি বলেন, এটি “লেবাননের অধিকার রক্ষা করে এমন কোনো চুক্তি নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া শর্তের চুক্তি।” তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়ন করা হবে না।

হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাসেম এই চুক্তিকে ‘অকার্যকর’ এবং ‘আত্মসমর্পণ’ বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলকে লেবানন ছাড়তে বাধ্য না করা পর্যন্ত তার গোষ্ঠী লড়াই চালিয়ে যাবে। হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ লেবাননে ‘অভ্যন্তরীণ সংঘাতের’ আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

জোরপূর্বক হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার যেকোনো প্রচেষ্টা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ইয়ং বলেন, এই চুক্তি “আমাদের কোথাও নিয়ে যাবে না, বরং গৃহযুদ্ধ এবং সম্ভবত শিয়া (মুসলিম) সম্প্রদায়ের বিদ্রোহের দিকে নিয়ে যেতে পারে।”

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

আঞ্চলিক বিশ্লেষক এবং ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, হিজবুল্লাহকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া ‘এমন একটি বিষয়, যা কখনোই ঘটবে না’। তার মতে, এই চুক্তি কার্যত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে বৈধতা দিয়েছে।

তিনি বলেন, “কিছুই ঘটবে না। ইসরায়েল প্রত্যাহার করবে না, আর হিজবুল্লাহও ভেঙে পড়বে না।”

সিট্রিনোভিচ বলেন, হিজবুল্লাহ সশস্ত্র থাকা অবস্থায় এবং উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকলে কোনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেনা প্রত্যাহার করার সুযোগ পাবেন না।

তার মতে, আরও সীমিত একটি চুক্তি—যেখানে হিজবুল্লাহকে লিতানি নদীর দক্ষিণ এলাকা থেকে সরানো, লেবানিজ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিস্তৃত করার বিষয় থাকত—সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।

হিজবুল্লাহপন্থি বিশ্লেষক মোহাম্মদ ওবেইদও বলেন, চুক্তিটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। তিনি যোগ করেন, এর ধারাগুলো ‘বিস্ফোরকের মতো’, যা লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধ্বংস করতে পারে। কারণ এগুলো হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।

আরও দেখুন

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি ৬-৩ ভোটে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। নিম্ন আদালতের ওই সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি স্থগিত করা হয়েছিল।

৩৫ মিনিট আগে

ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি যুদ্ধ শেষ করার বদলে অচলাবস্থা আরও পাকাপোক্ত হতে পারে, বিশ্লেষকদের অভিমত

ইসরায়েল-লেবানন চুক্তি যুদ্ধ শেষ করার বদলে অচলাবস্থা আরও পাকাপোক্ত হতে পারে, বিশ্লেষকদের অভিমত

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের লেবানিজ গবেষক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, চুক্তিটি ‘জন্মের আগেই মৃত’ এবং কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ এটি এমন একটি শর্তের ওপর নির্ভর করছে, যা বাস্তবে পূরণ করা অসম্ভব।

১ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদায় থাকা অভিবাসীদের জন্য নতুন বিপদ

যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদায় থাকা অভিবাসীদের জন্য নতুন বিপদ

মোলেন বলেন, “হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পূরণ করে স্থায়ী মর্যাদার আওতায় এখানে থাকার চেষ্টা করুন, নয়তো আমরা আপনাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে সহায়তা করব।”

২ দিন আগে

সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের আবেদন করতে উৎসাহ দিচ্ছে স্পেনের এনজিওগুলো

সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীদের আবেদন করতে উৎসাহ দিচ্ছে স্পেনের এনজিওগুলো

সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে এনজিওগুলো এখনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া অভিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শ দেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করেছে। স্পেনে প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন এবং বৈধ বসবাসের অনুমতি পেতে অনেক ক্ষেত্রেই এক বছরেরও বেশি সময় লাগে।

২ দিন আগে