logo
খবর

৭ বছরে ফিরেছে ৭০ হাজার নারী কর্মী, সৌদিতে পুরুষ কর্মীর কোটা পেতে নারী কর্মীদের বলিদান

আব্দুস সবুর০৮ মার্চ ২০২৬
Copied!
৭ বছরে ফিরেছে ৭০ হাজার নারী কর্মী, সৌদিতে পুরুষ কর্মীর কোটা পেতে নারী কর্মীদের বলিদান

পটুয়াখালীর লিজা আক্তার গত বছর রমজানের ইদের আগে কাজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান। সেখানে যাওয়ার পর কাজের পরিবর্তে নানা ধরেনর নির্যাতনে শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গত ৯ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরেছেন।

তিনি বলেন, ‘‘আমি শুধু একটা ভালো জীবন ও কাজের জন্য গিয়েছিলাম সেখানে। এসবের কিছুই পাইনি বরং অমানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি।”

লিজা বলেন, আমাকে চারবার হাতবদল করেছে সৌদির দালালেরা। সব জায়গায় নির্যাতনের শিকার হয়েছি। বাঁচার আশায় পুলিশের কাছে গিয়ে শাস্তি ভোগ করেছি। অবশেষে দেশে আসার সুযোগ পেয়েছি।

শুধু তিনি এক নয়, গত ৭ বছরে হাজার হাজার নারী যৌনসহ নানা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া, গত ৮ বছরে অনেক নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে।

এদিকে সৌদি আরবে একজন নারী গৃহকর্মী (আমেল মঞ্জিল) পাঠালে, একজন পুরুষ কর্মী পাঠানোর একটি কোটা পায় রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি। এই কোটার লোভে যেকোনোভাবে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠাচ্ছে বিভিন্ন এজেন্সি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা জানান, বিদেশে সবেচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যাওয়া মানুষেরা। তাই প্রয়োজন এই খাতের বাইরে অন্য খাতে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া, দূতাবাসের পক্ষ থেকে সব সময় প্রবাসীদের খোঁজখবর এবং অভিযোগের বিষয়ে আইনি সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন। তাদের বেশির ভাগই নিপীড়নের নানা অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া, অন্তত ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারী মানবপাচারের শিকার হয়েছেন।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ৬২ হাজারের বেশি নারী কর্মী বিভিন্ন কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন। ২০২৪ সালে বিদেশে গেছেন ৬১ হাজারের বেশি নারী কর্মী। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ১০ লাখেরও বেশি নারী কর্মী বিদেশে কাজের জন্য গেছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরেছেন তার সঠিক তথ্য নেই বিএমইটির কাছে নেই।

নারীদের অধিকাংশই গেছেন সৌদি আরবে

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৯৯১ সাল থেকে নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। তবে শুরুর দিকে বছরে মাত্র কয়েক হাজার নারী বিদেশে যেতেন এবং বিভিন্ন সময়ে সরকার সেটি বন্ধও করে দেয়। তবে ২০০৪ সাল থেকে নারীরা ধারাবাহিকভাবে বিদেশে যাওয়া শুরু করেন। ২০১৩ সালে এ সংখ্যা প্রথমবারের মতো বছরে ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আর ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর জন্য চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা রাতারাতি বছরে লাখ পেরিয়ে যায়। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। তবে ২০২৩ সালে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ১০৮ জনে। ২০২৪ সালে তা আরও কমে ৬১ হাজার ১৫৮ জনে নেমে আসে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৩১৭ জন। সৌদি আরব ছাড়া নারীদের দ্বিতীয় গন্তব্য ছিল জর্ডান।

নারী কর্মীর বিনিময়ে পুরুষ কর্মী কোটার ফাঁদ

২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ বছর সৌদি আরবে পুরুষ কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল। তবে বাংলাদেশ অনুরোধ করলে গৃহকর্মী পাঠানোর শর্ত দেয় সৌদি আরব। এরপর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আহমেদ আল ফাহাইদের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসে এবং নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।

সেই সময় বাংলাদেশ সরকার গৃহ-শ্রমিক পাঠানোর ব্যাপারে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল। এই চুক্তিতে শর্ত ছিল একজন নারী শ্রমিক পাঠানো হলে দুজন পুরুষ শ্রমিক নেওয়া হবে। বলা হচ্ছে, লিখিত হলেও এই চুক্তি এখন আর মানা হচ্ছে হচ্ছে না। বর্তমানে একজন নারী পাঠালে একজন পুরুষ কর্মীর কোটা ফাঁকা হয়।

নাম প্রকাশ না করে বায়রার একজন সদস্য বলেন, আসলে বাংলাদেশ বিভিন্ন তথ্য গোপন করে সৌদি আরবে নারীদের পাঠায়। সেখানে পাঠানোর পর আর খোঁজ–খবর নেওয়ার মতো কেউ থাকে না। আর বেশির ভাগ এজেন্সি কোটার লোভে যেকোনোভাবে নারীদের সৌদি আরব পাঠায়।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা (উপসচিব) বলেন, সৌদি আরবে নারীদের কোনো সম্মান নাই। বিভিন্ন দেশ থেকে নেওয়া কর্মীদের তারা দাস হিসেবে মনে করে। ভিসায় এমন কিছু জটিল শর্ত থাকে, যা বিভিন্ন এজেন্সি গোপন করে থাকে।

৭ বছরেই দেশে ফিরেছেন অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী

বিদেশ থেকে এ পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি নারী কর্মী দেশে ফেরত এসেছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে গত ৭ বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে করোনা মহামারি চলাকালে শুধু ২০২০ সালেই ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন নারী কর্মী। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র বন্দী বা ডিপোর্টি হিসেবে ২০১৯ সালে ৩ হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে ১ হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ৬ হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে অন্তত ১ হাজার ৮৯১ জন নারী দেশে ফিরেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১ হাজার ৩৬৫ এবং ২০১৯ সালে অন্তত ১ হাজার নারীর ফেরার তথ্য রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এই ৪ বছরে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকেই ১৫ হাজারেরও বেশি নারী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন।

শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার বেশি

দেশে ফেরা নারী কর্মীদের অধিকাংশই অভিযোগ করেছেন, সেখানে তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীদের মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেরা অন্তত ১২১ জন নারীকে তারা সেবা দিয়েছেন। এর বাইরে নানা ধরনের নিপীড়নের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন হাজারো নারী।

সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা রংপুরের এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারে অভাবের কারণে তিনি ২০১৫ সালের ২৫ জুন সৌদি আরবে যান। যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেখানে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হতো। বাইরে থেকে আসা পুরুষেরাও নির্যাতন করত। প্রতিবাদ করায় তার গায়ে আগুন দেওয়া হয়।

যশোরের এক নারী জানান, যে বাসায় তিনি কাজ করতেন, সেই বাসার গৃহকর্তা, তার ছেলে এবং ছেলের বন্ধুরা তাকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করেছে।

ঢাকার উত্তর বাড্ডার এক নারী জানিয়েছেন, যে বাসায় তিনি কাজ করতেন, ওই বাসার পুরুষেরা তাকে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করত। প্রতিবাদ করলে তার চুল টেনে টেনে তুলে ফেলা হতো।

দিলরুবা আক্তার নামে একজন গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভনে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হন। সেখানে তাকে একটি ক্লাবে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌনপেশায় যুক্ত করা হয়। ৮ মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। পরে কৌশলে সেখান থেকে বের হলেও মিথ্যা অভিযোগে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন সামলাতে না পেরে নারীরা নিয়মিত পালিয়ে দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। সৌদি দূতাবাসের বিভিন্ন চিঠিতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সৌদি আরবের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, ‘এ পর্যন্ত ৫৫ জন গৃহকর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপ, দুর্ব্যবহার বা নির্যাতনের কারণে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিদিনই তিন-চারজন গৃহকর্মী এভাবে আশ্রয় নিচ্ছে।

আরেক চিঠিতে রাষ্ট্রদূত লেখেন, ‘গৃহকর্মীদের মধ্যে ৫৬ জনকে দূতাবাসের সহায়তায় এবং ৫৫ জনকে রিয়াদের দুটি কোম্পানির সহায়তায় দেশে পাঠানো হয়েছে। যারা আসছেন, তাদের অনেকেরই শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নেই। সৌদি গৃহকর্তাদের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।’ ওই চিঠিতে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ বেশ কটি বিকল্প প্রস্তাব দেন তিনি।

২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেরত আসা নারী কর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন না। এ ছাড়া অন্তত ২৩ জনকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না।

মৃত নারী কর্মীদের দাম নেই

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ বছরে ৭৯৯ জন নারী কর্মীর মরদেহ বাক্সবন্দী হয়ে দেশে ফিরেছে। এদের অধিকাংশের মৃত্যু সনদে উল্লেখ আছে আত্মহত্যা। পরিবারগুলো বলছে, প্রতিটি মৃত্যুতেই কোনো না কোনো কিন্তু আছে।

যেমন ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মোসাম্মৎ বেগম। সেখান থেকে তিনি কীভাবে মিসরে গিয়ে মারা গেলেন সেই রহস্যের সমাধান হয়নি। মিসরের রাজধানী কায়রোতে নিয়োজিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ২৯ মে একটি ৫ তলা ভবন থেকে পড়ে মোসাম্মৎ বেগম নামে এক নারী গৃহকর্মী মৃত্যুবরণ করেন। মোসাম্মৎ বেগমের স্বামী আব্দুল আজিজ বলেন, বেশ কিছুদিন আগে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পারেন, মোসাম্মৎ বেগম নামে এক নারী মিসরে মারা গেছেন। কিন্তু, তার স্ত্রী সৌদি আরবে থাকায় তিনি বিষয়টিতে গুরুত্ব দেননি। পরে মিসর থেকে যখন তাকে ফোন করা হয়, তখন বুঝতে পারেন তার স্ত্রী মিসরে মারা গেছেন।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে সৌদি আরবে যান আবিরুন বেগম। পরে গৃহকর্তার বাসায় মারা যান তিনি। মৃত্যুর ৫১ দিন পর তার পরিবার এ খবর জানতে পারে। সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে আনা আবিরুনের মরদেহের সনদে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয় হত্যা। আবিরুনের পরিবারের সদস্যরা জানান, তার নিয়োগকর্তা আবিরুনের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তাকে মেরে ফেলেছে। এমনকি দুই বছরে তাকে কোনো বেতনও দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি।

একইভাবে সৌদি আরবে নির্যাতনে মৃত নাজমার মরদেহ দেশে আসে মৃত্যুর ৫৩ দিন পরে। গত বছরের ২৪ অক্টোবর তার মরদেহ দেশে আসে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান নাজমা। হাসপাতালে ক্লিনারের চাকরি দেওয়ার কথা বলে তাকে পাঠানো হলেও তাকে কাজ দেওয়া হয় বাসাবাড়িতে। সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতন করা হতো। অমানসিক নির্যাতনে নাজমার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার স্বজনেরা।

নারী অভিবাসনের ভিন্ন খাত খোঁজা, আইনী সহায়তা ও নিপীড়নকারীদের বিচারের দাবি

বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি নারী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেব যান। আর এই কাজে গিয়েই নির্যাতনের শিকার হন। এটা প্রায় বিগত ২০ বছরের ইতিহাস। তবে নারীদের সম্মানজনক অভিবাসনের জন্য গৃহকর্মীর বাইরে বিভিন্ন খাত খুঁজে সেসব কাজে পাঠালে নির্যাতন হওয়ার সম্ভবনা থাকবে না। এ ছাড়া নির্যাতিতদের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা এবং নিপীড়কদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, “বিদেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশের নারীদের সঙ্গে কথা বলে নিপীড়নকে মোটা দাগে তিন ধরনে ভাগ করা যায়। প্রথমটি কাজ ও বেতন সংক্রান্ত। নারীদের একটা বড় অংশ অভিযোগ করেন, তিনি ওই দেশের খাবার, পরিবেশ, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে সংকটের মধ্যে থাকেন। বেতন ঠিকমতো পান না। একাধিক বাসায় কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ওই নারী শ্রমিক যখন মানিয়ে চলতে পারেন না, ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না, তখন নিয়োগকর্তা তাকে শারীরিক নির্যাতন করেন। তৃতীয়ত, যে চিত্রটা আসে সেটা হলো যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই নিপীড়ন-নির্যাতন এতটাই বীভৎস, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে নারীরা বিদেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসেন, তাদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকে না।”

শরিফুল হাসান বলেন, “অধিকাংশ সময় ট্রাভেল পাস দিয়ে একজন নারীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ট্রাভেল পাস দেওয়ার আগে দূতাবাসকে ওই নারীর কথা শুনতে এবং লিখিত অভিযোগ নিতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাগুলো তদন্তের অনুরোধ করতে হবে যাতে নিপীড়নকারীরা শাস্তির আওতায় আসে।’

তিনি আরও বলেন, “প্রায় ৮০০ নারীর মরদেহ এসেছে গত ৮ বছরে। বলা হয় এদের অনেকে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব নারী বিদেশে কাজের জন্য যান তারা দেশে মানসিক ও শারীরিকভাবে এতটাই ঝড়-ঝাপটা সহ্য করেন যে তাদের আত্মহত্যা করার কথা নয়। ফলে তারা এমন কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছেন যে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা মরদেহে শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন দেখেছেন।”

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আমাদের দেশের বেশির ভাগ নারীদের পাঠানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যান সৌদি আরবে এবং বেশি নির্যাতনের শিকার হন সেখানে। কারণ সৌদি আরবের সমাজ এখনো পুরুষ শাসিত। সেখানে নারীদের সেভাবে গুরুত্ব ও সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয় না। এমনকি নারীকর্মীদের প্রায় দাসের মতো করে দেখা হয়। আর বিদেশ থেকে যাওয়া নারীরা যেহেতু তাদের বাসার ভেতরে থাকেন তাই নির্যাতন করলেও কিছু হবে না হিসেবে তারা ধরে নেয়।

তিনি আরও বলেন, নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে নয়, ড্রাইভিং, গার্মেন্টসসহ অন্য কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশ পাঠালে এমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাই বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে নারীদের ক্ষেত্রে নতুন খাত খুঁজতে হবে। এ ছাড়া, নারীদের যেকোনো অবস্থায় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনি পরামর্শ দেওয়ার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এসব করা গেলে প্রবাসে নারীরা আরো বেশি সুরক্ষিত ও নিরাপদ থাকবে।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য না পাওয়া গেলেও গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর বলেন, আমরা নতুন এসেছি কিছুদিন সময় দিলে আশা করি সব সমস্যার সমাধান হবে। এ ছাড়া ১৮০ দিনের মধ্যে প্রবাসীদের ব্যাপারে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সব কিছু বাস্তবায়ন করা হবে।

আরও দেখুন

খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা জোরদারে পিকেএসএফ ও সিআইএমএমওয়াইটির আলোচনা

খাদ্য নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা জোরদারে পিকেএসএফ ও সিআইএমএমওয়াইটির আলোচনা

সিআইএমএমওয়াইটির উপস্থাপনায় জানানো হয়, গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সিআইএমএমওয়াইটি বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিশেষ করে গম ও ভুট্টা উৎপাদন বৃদ্ধিতে।

৩ দিন আগে

লেবাননে নিহত ২ প্রবাসীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

লেবাননে নিহত ২ প্রবাসীর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে নিহতদের মরদেহ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

৪ দিন আগে

লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত ২ প্রবাসীর মরদেহ সাতক্ষীরায় পৌঁছেছে

লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত ২ প্রবাসীর মরদেহ সাতক্ষীরায় পৌঁছেছে

গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলার জিবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম নিহত হন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে তাদের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়।

৪ দিন আগে

সৌদি আরবে উটের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ২ বাংলাদেশি নিহত

সৌদি আরবে উটের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে ২ বাংলাদেশি নিহত

রোববার রাতে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় রিয়াদের একটি সড়কে উটের সঙ্গে তাদের মোটর সাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

৮ দিন আগে